বলুক।
দুষ্টুমি করতে নেই দাদাবাবু, ঠাণ্ডা হয়ে বোসো। দশ মিনিট। আজ ঠিক দশ মিনিট বাদেই তোমায় ছেড়ে দেব।
তারপরেই মাথা একবার ডাইনে, একবার বাঁয়ে। একবার এখানে খ্যাঁচ, আর একবার সেখানে খুচ। মানে ঠিক সেই একটি ঘণ্টা। একদিন প্রতিজ্ঞা করলুম, সামনের রবিবারে ভগবানদাকে আমি ফাঁকি দেবই, যেমন করে হোক।
বাড়ি থেকে পালানোর চেষ্টা বৃথা, কারণ খিড়কির দিকে মা-ঠাকুরমার নজর। সদর দরজার সামনে পাহারাওলার মতো বড়দা হাজির। বৈঠকখানা দিয়েও বেরুনো যায়, কিন্তু সেখানে বাবা কাগজ পড়ছেন। অতএব তিনটে রাস্তাই বন্ধ।
কিন্তু ভগবান স্বয়ং পথ দেখিয়ে দিলেন।
আমাদের পশ্চিমের ঢাকা বারান্দায় কতগুলো পুরনো ফার্নিচার আর প্যাকিং বাক্সের স্তূপ পাহাড়ের মতো জড়ো হয়ে ছিল কতকাল ধরে। কেউ সেখানে যেত না–ওর ভেতরে কী আছে আর কী যে নেই, তাও বোধহয় কারও জানা ছিল না। কিন্তু যে রবিবারে ভগবানদা আসবে, তার আগের দিন আমি আবিষ্কার করলুম ওর ভেতরে পালিয়ে থাকবার চমৎকার জায়গা আছে একটা।
আমার একটা মার্বেল গড়িয়ে গিয়েছিল ওদিকে। তার সন্ধানে দু-তিনটে কাঠের বাক্স টেনে সরাতেই দেখি একটা মস্ত তক্তপোশ রয়েছে ওখানে। ভাঙাচুরো জিনিসপত্রগুলো তারই ওপরে ডাঁই করা। তক্তপোশটার তলায় যে-কেউ দিব্যি লম্বা হয়ে ঘুমিয়ে থাকতে পারে, বাইরে কাঠের বাক্সগুলোর আড়াল থাকলে দেখতে পাওয়া তো দূরের কথা, কেউ সন্দেহও করতে পারবে না ওখানে মানুষ আছে। হাত দিয়ে দেখলুম, ধুলো-ময়লাও বিশেষ নেই।
ভগবানদা সাধারণত আসত বেলা আটটা নাগাদ। আমাদের জলখাবারের পাট মিটে যেত সাড়ে সাতটার মধ্যেই। সেদিনও সকালের বরাদ্দ রুটি আর সুজি গিলে নিয়ে আমি ফাঁক খুঁজতে লাগলুম। তারপর যেই দেখলুম পশ্চিমের বারান্দার দিকে কেউ নেই, তৎক্ষণাৎ বাক্স সরিয়ে
আঃ কী আরাম। মনে হচ্ছে যেন কোন পাতালপুরীতে চিতপাত হয়ে শুয়ে আছি। আবছা অন্ধকারে নানা রকম পুরনো জিনিসের গন্ধ-যেন আমার চারদিকে যখের ধন লুকনো রয়েছে, হাত বাড়ালেই আমি খুঁজে পাব। অল্প-অল্প গরম লাগছিল–তা সত্ত্বেও ওইভাবে লুকিয়ে থাকতে বেশ একটা রোমাঞ্চ বোধ হচ্ছিল আমার। মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর কেউ কোনওদিন আর আমাকে খুঁজে পাবে না।
তারপর ভগবানদার গলা শোনা গেল বাড়ির বাইরে। আমি কান খাড়া করলুম। তারও খানিক পরে যা শুরু হল সেইটেই আসল মজার।
আমার নাম ধরে কিছুক্ষণ ডাকাডাকি। গেল কোথায়?
এই তো এখানেই ছিল।
না-বাইরে তো বেরোয়নি।
তা হলে ছেলে কি হাওয়ায় মিলিয়ে গেল?
খোঁজ–খোঁজ। আমার নাম ধরে ডাকাডাকি। মেজদা বললে, নিশ্চয় কোন্ ফাঁকে বাচ্চুদের বাড়ি পালিয়েছে। আমি ধরে আনছি।
কান ছিঁড়ে ফেলে দেব।–বড়দা লাফাতে লাগল।
আর এই সব হইচই হট্টগোলে আমার দারুণ হাসি পেতে লাগল। লুকিয়ে লুকিয়ে খিকখিক করে হাসতে-হাসতে পেটে ব্যথা ধরে গেল, তারপর কখন এক ফাঁকে
অনেকগুলো খরখরে পা যেন ছুরির ফলার মতো আমার নাক-মুখের ওপর দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। কী বিশ্রী গন্ধ সেই সঙ্গে। আমি ধড়মড় করে উঠে বসলুম।
আরশোলা দলে দলে আরশোলা। আমার নাক-মুখ কানের ওপর দিয়ে তারা মার্চ করে বেড়াচ্ছে।
আমি তক্তপোশের তলায় ঘুমিয়ে পড়েছিলুম। কতক্ষণ ঘুমিয়েছি জানি না। এদিকে আমার সর্বাঙ্গে আরশোলা, ওদিকে ঠাকুরমা চিৎকার করে কাঁদছেন : নিশ্চয় ছেলেধরায় নিয়ে গেছে, নইলে নদীতে গিয়ে পড়েছে। তা না হলে
তখন আর ভগবানদার ভয় নয়, আরশোলার হাত থেকে বাঁচবার জন্যেই এক লাফে আমি ছিটকে পড়লুম বাইরে। কাঠের বাক্সের স্তূপে যেন সাইক্লোন ঘটে গেল।
এই যে আমি–এই যে—
দুহাতে গায়ের আরশোলা ঝাড়তে ঝাড়তে আমি লাফাতে লাগলুম : এই যে–এই যে ওরে সর্বনেশে ছেলে! কোথায় ছিলি?–কাঁদতেকাঁদতে ঠাকুরমা ছুটে এলেন আমার দিকে। বাবা এলেন, মা এলেন, বড়দা-মেজদা-বোনেরা সবাই দৌড়ে এল।
কোথায় ছিল, কোথায় ছিল?
কিন্তু সেটা গল্প নয়। আসল ব্যাপার হল, ভগবানদাকে আসতে হল পরের দিন, মানে সোমবারেই।
আর এবার তার কাঁচির সামনে ইচ্ছে করেই আমি ঘাড় পেতে ছিলুম– মানে, না দিয়ে উপায় ছিল না। আরশোলারা বাগে পেয়ে এমন ভাবে আমার চুল কেটে নিয়েছিল যে সে-যাত্রা সোজা কদম ছাঁট দিয়েই স্কুলে যেতে হল আমাকে।
ছাত্র চরিতামৃত
আমি ভয়ে-ভয়ে বললাম, না বাবা, ও আমি পারব না।
ক্যাবলা সান্ত্বনা দিলে : কোনও ভয় নেই প্যালা, কুছ পরোয়া নেই। দেখবি একেবারে হীরের টুকরো ছেলে। ভাজা মাছটি অবধি উলটে খেতে জানে না।
আমার হৃদয়ে তখন আশার সঞ্চার হচ্ছে আস্তে-আস্তে। বললাম বটে!
নয়তো কী? উৎসাহে দপদপ করে উঠল ক্যাবলার চোখ। বললে, সাত চড়ে মুখে রা-টি নেই। আর বিদ্যে! সে আর কী বলব?
–তবু কিছু বল, শুনে আশ্বাস পাই আমি।
–বিদ্যেতে একেবারে সরস্বতীকে বেটে খেয়েছে। …হাত-পা নেড়ে ক্যাবলা বলে চলল–এমন মাথাওয়ালা ছেলে ভূ-ভারতে আর দুটি খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিছুই করতে হবে না তোকে, শুধু দুবেলা দুঘণ্টা করে সামনে বসে থাকলেই চলবে। তারপর মাসান্তে দশটি তঙ্কা দিব্যি ট্যাঁকে খুঁজে, হাসতে-হাসতে চলে আসবি। এমন সুযোগ ছাড়িসনে প্যালা–চান্স জীবনে দুবার আসে না।
আমি সাগ্রহে বললাম, তা হলে লেগে যাই?
