আমি নিঃশ্বাস ছেড়ে বাঁচলুম।
তারপর ক’দিন আর কোনওদিকে তাকাবার সময় ছিল না। সামনে ম্যাট্রিক পরীক্ষা আর সেইসঙ্গে অঙ্কের করাল বিভীষিকা! দশমিক আর ভগ্নাংশ–ফ্যাক্টার আর ফরমুলা– প্রব্লেম আর একস্ট্রা–তার ভেতরে জুতো—’রামা হো’–সব বেমালুম তলিয়ে গেল।
অঙ্কের পরীক্ষার দিন তিনশো তেত্রিশ কোটি দেবতাকে ছশো ছত্রিশটা পাঁঠা মানত করে বেরুচ্ছি–এমন সময় পাশের বাড়ির পিসিমা এসে হাজির। হাতে মস্ত একটা জামবাটি।
পিসিমা ভারি ভালো লোক। বড্ড স্নেহ করেন আমাকে–যখন-তখন ব্রাহ্মণ-ভোজন করান, আর দেব-দ্বিজে পিসিমার বেজায় ভক্তি–প্রায়ই কালীঘাটের প্যাঁড়া এনে খাওয়ান আমাকে। প্রসাদে অরুচি আমার নেই–পেলেই পত্রপাঠ সেবা করে ফেলি।
পরীক্ষা দিতে যাচ্ছিস? নে, ঢক করে এই চন্নামৃতটুকু খেয়ে ফ্যাল। একেবারে জাগ্রত দেবতার চন্নামৃত-খেলেই পাশ হয়ে যাবি।
-কীসের চন্নামৃত পিসিমা? কেমন একটা বদখত গন্ধ!
পিসিমা শিউরে বললেন, অমন বলতে নেই রে, পাপ হয়। ওটা বাবার গায়ের গন্ধ।
বাবা। কোন্ বাবা।
জুতিয়া বাবা!
জুতিয়া বাবা!–পরীক্ষার কথা ভুলে গিয়ে অবাক হয়ে বললুম : বিস্তর দেবতার নাম শুনেছি, কিন্তু জুতিয়া বাবার নাম তো শুনিনি কোনওদিন?
পিসিমা ফিসফিস করে বললেন, সে এক আশ্চর্য ব্যাপার! ওদিকের গলিতে হনুমানজীর একটা আখড়া আছে জানিস তো? কদিন আগে সেখানে রামলীলে হচ্ছিল। রাম বনবাসে গেছেন–ভরত নন্দীগ্রামে তাঁর জুতো পূজা করছেন বসে বসে। যেমনি জুতো পূজার গান শুরু হয়েছে অমনি এক অলৌকিক ব্যাপার।–পিসিমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল : সঙ্গে সঙ্গে আকাশ থেকে ধপধপ করে দুখানা জুতো পড়ল। সে কী জুতো। তার একখানার ওজনই হবে তিন সের! অমন পেল্লায় জুতো রামচন্দ্র ছাড়া কার হবে। ভক্তের ডাকে তিনি জুতো-জোড়া স্বর্গ থেকে ফেলে দিলেন।
আমি চমকে উঠলুম, বললুম, কিন্তু
পিসিমা রেগে বললেন, কিন্তু আবার কী? তোরা সব নাস্তিক হয়েছিস কিন্তু দেবতারা এখনও আছেন। আমি কত কষ্ট করে–দুটাকা প্রণামী দিয়ে তোর জন্যে বাবার জুতো-ধোয়া জল–
হায় জুতিয়া বাবা। এখন চরণামৃতটা কী করে বমি করি!
চুল কাটার ভয়ে
সেলুনে চুল কাটতে গিয়েছিলুম। অল্পবয়সী পরামাণিক ছেলেটি একবার আমার দিকে তাকিয়ে, মুচকে হেসে আর-একজন খরিদ্দারকে বললে, আপনি একটু বসুন, দাদা! আমি এঁরটা পাঁচ মিনিটেই সেরে দিচ্ছি।
তার মানেটা বুঝতে পারছ? আমার তো মাথাভর্তি মস্ত টাক; অল্প দু-চারগাছা চুল যা আছে তা ছাঁটাই করতে কী-ই বা আর সময় লাগবে? কাজেই অন্য খরিদ্দার এসময়টুকু নিশ্চিন্ত হয়ে বসতে পারে।
সেলুনওলা আজকে আমার টাকের দিকে তাকিয়ে যাই বলুক, ছেলেবেলা আমার মাথার চেহারাই ছিল অন্য রকম। রাশি রাশি ঝাঁকড়াঝাঁকড়া কোঁকড়া চুল, ছাঁটবার পনেরো দিন যেতে না যেতে ধামার মতো ফুলে উঠত। সে-চুল এত ঘন যে আমাদের ভগবান-দা বলত : ছোট দাদাবাবুর চুল কাটতে আমার কাঁচি ভেঙে যায়।
ছেলেবেলায় এই ভগবানদা ছিল আমাদের বিভীষিকা।
সে যে কতদিন থেকে আমাদের বাড়িতে কামাচ্ছে আমরা কেউ জানি না। বয়সে বাবার চাইতেও ঢের বড়, রোগা লম্বা মানুষটা, মাথার চুল সব প্রায় শাদা হয়ে এসেছে, চোখে নিকেলের ফ্রেমের চশমা। বাবা তাকে দাদা বলতেন, আমরাও বলতুম। আর ভগবানদার নাতি ভোলা ছিল আমাদের বন্ধু, স্কুলে একই ক্লাসে পড়ত আমাদের সঙ্গে।
ভোলা আমাদের বন্ধু হলে কী হয়, তার ঠাকুর্দাকে আমি আদৌ পছন্দ করতুম না। সবাই বলত, ভগবানদা খুব ভালো লোক, কিন্তু আমার কখনও সেকথা মনে হত না। ছেলেবেলায় চুল ছাঁটবার কথা মনে হলেই আমার গায়ে জ্বর আসত। আর বাড়িতে নিয়ম ছিল, প্রত্যেক মাসে অন্তত দুবার অর্থাৎ একটা করে রবিবার বাদ দিয়ে চুল আমাদের ছাঁটতেই হবে–বাবা কিংবা বড়দা দাঁড়িয়ে থেকে তার তত্ত্বাবধান করবেন।
রবিবারের ছুটির সকালে সে যে কী অসহ্য যন্ত্রণা, তা বলে বোঝাবার নয়। বাড়ির সামনেই মাঠ ছিল, দেখতুম সেখানে ছেলেদের দঙ্গল জমেছে, খেলা চলছে, হইহই চিৎকার উঠছে। তার ভেতরে ভগবানদার কাঁচির সামনে সেই-যে ঘাড় পেতে দিয়ে বসে আছি, আছিই। খুচখাচ-কুচ-কাটাস চলছেই, মাথা এদিক-ওদিক ঘোরাতে ঘোরাতে প্রাণ বেরিয়ে গেল, ভগবানদার আর কিছুতেই পছন্দ হয় না।
আঃ–এত নড়া-চড়া করো কেন? চুপ করে বোসো–নইলে চুল খারাপ হয়ে যাবে। এই একটু–আর একটু–এই হয়ে গেল।
এই হয়ে গেল মানে আরও ঝাড়া পনেরো মিনিট।
চুল কাটা শেষ হল তো ঠাকুরমার পাল্লায়। তখন ইঁদারার সামনে বসে স্নান করা, সাবান ঘষা–আরও প্রায় একটি ঘণ্টা। তার মানে, রবিবারের সকালটা একেবারেই বরবাদ।
ভগবানদার জ্বালায় এইভাবে জেরবার হতে হতে শেষ পর্যন্ত আমার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। এক রবিবার না হয় চুল কাটা বাদই রইল, না হয় চুল আধ ইঞ্চি বেশি বেড়েই গেল–এমন কোন্ মহাভারতটা অশুদ্ধ হয় তাতে? আমার যদি অসুবিধে না হয়, ঘাড় কুটকুট না করে, তোমাদের কী? কিন্তু কথাটা না বলা যায় বাবাকে, না বোঝানো যায় দাদাকে। আর ভগবানদা তো কাঁচি হাতে তৈরি হয়ে বসেই রয়েছে, চুলের ঝুঁটি একবার পাকড়ে ধরতে পারলেই হল।
ছিঃ দাদাবাবু, চুল কাটব না বলতে হয়? মাথার চুল বড় থাকলে লোকে যে পাগল বলবে।
