–দিন না ঘা কয়েক লাগিয়ে
এই ফাঁকে একজন একটা ছাতাও তুলেছিল–আর একটু হলেই ধপাস করে আমার পিঠে বসিয়ে দিত। কিন্তু হাবুল সেনই রক্ষা করলে। বললে, না, মশয় না। ভদ্রলোকের পোলা, জুতা চুরি করব ক্যান? আমার বন্ধু কিনা, তাই মস্করা করতে আছিলাম। পায়ে ফোস্কা পড়ছে বইলা থইল্যায় কইর্যা–
লোকে সে-যাত্ৰা ছেড়ে দিল বটে, কিন্তু এতক্ষণে পুলিশের টনক নড়ল। একটু দূরেই তেলেভাজার দোকানে বসে যে-ভোজপুরীটা আরামে ফুলুরি খাচ্ছিল, সে এতক্ষণে ধীরে-সুস্থে উঠে দাঁড়াল। তারপরেই হাঁক দিয়ে বললে, আরে কৌন রে?
এর পরেই হয়তো লালবাজারে গিয়ে হাজতে রাত্রিবাস করতে হবে। সুতরাং আর আমি দাঁড়ালুম না। হতভম্ব হাবুল সেনকে ধাঁ করে একটা ধাক্কা দিয়ে সাঁ করে ঢুকে গেলুম পাশের গলিতে। তারপর সেখান থেকে একেবারে লম্বা!
কিন্তু হাবুল সেন ব্যাপারটাকে চারিদিকে রটিয়ে দিলে। আর রটাল বিলক্ষণ রং ফলিয়ে।
বিকেলে দেখি, ক্যাবলা, গদাই আর পঞ্চা এসে হাজির।
পঞ্চা বললে, আহা–চুক-চুক!
গদাই বললে, হাসপাতাল থেকে ছাড়ান পেলি কবে?
ক্যাবলা করুণ স্বরে জিজ্ঞেস করলে, পিঠের চামড়া বুঝি একপর্দা তুলে নিয়েছে?
হতভম্ব হয়ে বললুম, মানে?
পঞ্চা বললে, কেন লুকোচ্ছিস ভাই? আমরা তো তোর বন্ধু! না-হয় জুতো চুরি করতে গিয়ে দু’ঘা খেয়েইছিস, তাই বলে কি আমরা সেবন্ধুত্ব ভুলতে পারি?
ক্যাবলা বললে, যাই বলিস ভাই, কাজটা কিন্তু ভালো হয়নি। না-হয় চাঁদা করে একজোড়া জুতো তোকে কিনেই দিতুম! তাই বলে তুই ট্রাম থেকে অন্য লোকের জুতো সরাবি?
উঃ, কী শয়তান হাবুল সেন। বানিয়ে বানিয়ে এইসব বলে বেরিয়েছে? একবার কাছে যদি পাই
দড়াম করে ওদের নাকের ডগাতেই আমি দরজাটা বন্ধ করে দিলুম।
এই জুতো! এই জুতোই আমার সর্বনাশ করবে!
রাত্রে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়লুম। সমস্ত মেজাজ খিচড়ে গেছে–জীবনটাকে একেবারে অভিশপ্ত বলে বোধ হচ্ছে।
ঘরের একপাশে জুতো-জোড়া আমার দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে। যেন হাসছে আমার দুর্গতি দেখে। দোকানদারের কথাগুলো কানে বাজতে লাগল–আমি যদ্দিন টিকব, জুতোও তদ্দিন টিকবে! এখন দেখছি–জুতোই আমাকে আর টিকতে দেবে না।
বারো টাকা বারো আনার মায়ায় এতদিন অন্ধ হয়ে ছিলুম। কিন্তু আর নয়। হয় জুতো থাকবে নইলে আমি থাকব। এই পৃথিবীতে আমি আর জুতো–দুজনের জায়গা হতে পারে না। আজ জুতোর বিসর্জন!
শুধু বিসর্জন নয়! তার আগে প্রতিহিংসা নিতে হবে–নির্মম প্রতিশোধ!
কী করা যায়?
ভাবতেই দেখি, সামনে টেবিলের উপর কী একটা চকচক করছে। একটা ছোট কাঁচি। ওই কাঁচি দিয়ে মেজদা রোজ তরিবত করে গোঁফ ছাঁটে।
ইউরেকা! ওই কাঁচি দিয়ে জুতোটাকে আমি টুকরো-টুকরো করে কাটব! তারপর
একলাফে কাঁচিটাকে অধিকার করলুম। তারপর জুতোর চামড়ায় বসিয়ে চাপ দিতেই পট!
না, জুতো কাটল না। সম্রাট ব্র্যাণ্ড জুতোর কালান্তক চামড়ায় একটু আঁচড় লাগল না পর্যন্ত। মাঝখান থেকে কাঁচিটারই বারোটা বেজে গেল।
সর্বনাশ–সেরেছে!
কাল সকালে মেজদা গোঁফ ছাঁটতে এসে কাঁচির অবস্থা দেখে! আমারই কান ছেঁটে দেবে! এমনিতেই আমার কান দুটো একটু লম্বা–ও-দুটোর ওপর মেজদার লোভ আছে অনেকদিন থেকে। এবার আমি গেছি!
সামনে জুতো-জোড়া আমাকে যেন সমানে মুখ ভ্যাংচাচ্ছে। আমার মনে হল, ওরা যেন স্পষ্ট বলতে চাইছে, এখুনি হয়েছে কী! তোমার নাক কানের দফা নিকেশ করে তবে তোমায় ছাড়ব!
উঃ-কী ভয়ঙ্কর চক্রান্ত!
হাত-পা ছেড়ে দিয়ে বিছানায় এসে শুয়ে পড়লুম।
সাত দিন পরে ম্যাট্রিক পরীক্ষা আরম্ভ। অঙ্কটাকে কায়দা করে উঠতে পারিনি বলে পর পর দু’বার ম্যাট্রিকে ডিগবাজি খেয়েছি। এবার যদিবা আশা ছিল–ওই জুতোই আমাকে আর পাশ করতে দেবে না।
কিন্তু জ্বালার ওপর আর-এক জ্বালা!– পাড়ায় কোথায় কদিন থেকে উৎপাত শুরু হয়েছে। সন্ধে হলেই ‘রামা হো–রামা হো’। কানের পোকা একেবারে বার করে দেবার জো করেছে। আর উৎপাতটা যেন আমার উপরেই বেশি–এ-ঘরের জানলাটা খুলেই আওয়াজ যেন কানের পর্দা ফাটিয়ে দিতে থাকে।
একে জুতোর জ্বালায় মরছি–তার ওপরে আবার ‘রামা হো’। আমার মধ্যে যেন অ্যাটম বোমা ফেটে গেল গোটাকতক। যা হবার হোক। এসপার কিংবা ওসপার!
খাট থেকে নেমে জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়ালুম। তারপর ওই জুতো-জোড়া তুলে নিয়ে একটার পর একটা নির্ঘাত ছুঁড়ে দিলুম এই ‘রামা হো’ লক্ষ্য করে!
সঙ্গে সঙ্গে আকাশ-ফাটানো চিৎকার উঠল। আমি আর স্পিকটি নট! জানালা বন্ধ করে একলাফে খাটে চড়ে বসলুম, তারপর সোজা একদম লেপের তলায়।
আঃ, কী আরাম! এতদিন পরে শান্তিতে ঘুমুতে পারব!
দিন-দুই পরে বড়দার নজর পড়ল।
-হ্যাঁরে প্যালা, তোর সে-জগঝম্প জুতোটা গেল কোথায়?
আমার বুক কেঁপে উঠল। রামা হো-রা খুঁজে খুঁজে এসে হাজির হয়নি তো? তা হলেই গেছি।
ঘাড় চুলকে তো-তো করে বললুম, বিয়ের নেমন্তন্ন খেতে গিয়ে চুরি হয়ে গেছে।
–চুরি হয়ে গেছে! সেই জুতো!-বড়দা এমন করে তাকাল যেন ভূত দেখেছে : এমন গাড়ল চোরও আছে নাকি?
আমি ফোঁস করে বললুম, কেন, জুতোটা বুঝি খারাপ ছিল? ক্রেপ সোল–ক্রোম লেদার
বড়দা বললে, ক্রোম লেদার নয়, তোর লেদার, মানে তোর মতো গোরুর লেদার! কিন্তু বলিহারি চোরের আক্কেল! দুনিয়ায় আর চুরি করার জিনিস পেলে না!
