আচ্ছা।
পায়ের নাগরা জুতো মচমচিয়ে বদন বেরিয়ে গেল।
আজ আর মল্লীর পরিচয় বাঞ্ছার স্ত্রী হিসেবে নয়। মিলিটারিদের গণিকা সে-বদনের উপজীবিকা, স্বাচ্ছন্দ্য, সচ্ছলতা। এত বড়ো পৃথিবী— মুক্ত পৃথিবী—তারায় ভরা আকাশ, নিঃসীম দিগদিগন্ত, কিন্তু বাঞ্ছার স্থান কোথায়? আশ্রয় কোথায়? চারদিক থেকে কঠিন ফাঁসির দড়ি তার গলায় আটকে পড়বার জন্য এগিয়ে আসছে। চারদিকের পৃথিবী সংকীর্ণ হয়ে আসছে, জেলখানার ষাঁড়ের কুঁজতোলা পাঁচিলের চাইতেও আরও—আরও—আরও সংকীর্ণ।
অন্ধকারের মধ্যে মাঠ ভেঙে ছুটেছে বাঞ্ছা। কে যেন তাকে পেছনে পেছনে তাড়া করে আসছে। পুলিশ নয়, চৌকিদার নয়। তারায় ভরা আকাশ, সীমাহীন পৃথিবী, অসীম মুক্তিই আজ তাকে গ্রাস করতে চায়—হত্যা করতে চায়।
থানায় গিয়ে ধরা দেবে সে। বলবে দয়া করো, দয়া করো আমাকে। জেলে পাঠিয়ে দাও। পাঁচ বছর নয়, দশ বছর নয়—যাবজ্জীবন। দ্বীপান্তর। কালাপানির ওপারে যেখানে সমুদ্র, যেখানে এত বড়ড়া পৃথিবীটা কারও শক্ত হাতের মুঠির মতো ছোটো হয়ে গেছে।
চরণামৃত
ক্রেপ সোল–ক্রোম লেদার–সম্রাট অ্যান্ড কোম্পানির ডি-লুক্স দোকানদার আরও কী কী বলেছিল আমার মনে নেই। বাক্সে প্যাক করে দেবার আগে সে জুতোজোড়াকে পরম আদরে বারকয়েক থাবড়াল। তারপর বললে, যাও বেটা যাও, বেশ ভালো করে বড়বাবুর চরণ সেবা কোরো!
বড়বাবু! আমি পটলডাঙার প্যালারাম-পালাজ্বরে ভূগি আর বাসক পাতার রস খাই–আমাকে বড়বাবু বলা! ভাবলুম, মুখে যদি গোঁফ থাকত, তাহলে এই ফাঁকে তাতে বেশ করে তা দিয়ে নিতুম!
গম্ভীর হয়ে স্টাইলের মাথায় বললুম, জুতো টিকবে তো?
টিকবে মানে? আপনি যতদিন টিকবেন, তার চাইতে বেশি টেকসই হবে এ-জুতো। না, আপনার আয়ুক্ষয় কামনা করছি না স্যার। বলছিলুম, এ-জুতো পরা মানেই আপনার লাইফ ইনসিয়োর, মানে, ঠ্যাং ইনসিয়োর হয়ে গেল!
অগত্যা পকেট থেকে করকরে নগদ বারো টাকা বারো আনা বের করে দিলুম।
বেরোবার সময় দোকানদার বললে, হাঁটবেন আর আমার কথা মনে রাখবেন। দেখবেন, কী একখানা জুতো আপনাকে দিলুম।
একখানা জুতোই বটে!
পায়ে দেবার সঙ্গে সঙ্গেই পায়াভারি। সে কী ওজন! এক-এক পাটি বোধহয় দু-সেরের কম নয়। হাত-দশেক হাঁটতে-হাঁটতেই কোমর টন-টন করতে লাগল।
দোকানদারকে ভোলবার জো আর রাখল না। টোপা কুলের মতো এক-একটা ফোস্কা পড়ল পায়ে। তারপর, সেগুলো যখন গলে গেল, তখন ব্যাণ্ডেজ বেঁধে সাত দিন শুয়ে থাকতে হল বিছানায়।
সেই অবস্থাতেই বড়দা আমার মাথায় গোটা-দুই চাঁটি মেরে দিয়ে দাঁত দিয়ে খিঁচিয়ে বললে, যেমন তোর মগজ নিরেট, তেমনি জুতোও কিনেছিস নিরেট! ফেলে দে রাস্তায় কুকুরে-টুকুরে খেয়ে নিক।
আমার ছোট বোন ঝন্টি বললে, ও-জুতো খেতে গেলে কুকুরও হার্টফেল করবে।
বড়দা ঘর থেকে বেরিয়ে গেছে দেখে আমি ধাঁ করে ঝণ্টির বিনুনিটায় টান দিলুম। বললুম, পরিস তত আধ-ছটাক লেডিজ শু–এসব সম্রাট ব্র্যান্ড জুতোর কদর বুঝবি কোত্থেকে!
ঝন্টি ভ্যা-ভ্যাঁ করে কাঁদতে কাঁদতে মার কাছে নালিশ করতে গেল। কিন্তু মুখে যাই বলি, ও-জুতো পায়ে দিয়ে আমার হৃৎকম্প হতে লাগল। অথচ নিজে পছন্দ করে কিনেছি, পায়ে না দিলেও বাড়িতে মান রাখা শক্ত। যা থাকে কপালে বলে আমি আবার জুতোর তোয়াজ করতে লেগে গেলুম।
চেষ্টা করলে নাকি ভগবানকে সুদ্ধ বশ করা যায়, কিন্তু এ-জুতো বোধহয় ভগবানের ওপরেও এক কাঠি! আজ এক বছর ধরে রয়ে-সয়ে পরবার চেষ্টা করছি, কিন্তু পায়ে দিলেই সেই দোকানদারকে মনে করিয়ে দেয়। বলতে গেলে জুতোজোড়া আমাকে জুতোতে থাকে। অনেক দাগা পাওয়ার পরে আজকাল একটা রেশনের থলে হাতে বেরোই–তাতে থাকে একজোড়া চটি। যখন দেখি জুতোর পাল্লায় পড়ে প্রাণ যাবার জো হয়েছে, তখন নিরিবিলি জায়গা দেখে ওটাকে পুরে ফেলি থলের মধ্যে। তারপর পায়ে চটি গলিয়ে গজেন্দ্র-গমনে হাঁটতে থাকি।
কেউ জিজ্ঞেস করলে বলি, মার্কেট থেকে ভালো আলফ্যানসো আম কিনে নিয়ে যাচ্ছি।
ঈশ্বরের দয়ায় কলকাতায় ওই এক সুবিধে। আম, আপেল, আঙুর, বেদানা–নেহাত পক্ষে সিঙাপুরী কলা বারো মাসই কিনতে পাওয়া যায়। বেশ ছিলুম, কিন্তু হাবুল সেন বাগড়া দিলে।
তিন পুরুষ কলকাতায় আছে, কিন্তু মাতৃভাষা ছাড়া কথাই বলবে না হাবুল। আমাকে দেখেই একগাল হেসে বললে, কি রে, থইল্যার মধ্যে লইয়া যাস কী?
নাক উঁচু করে বললুম, পেশোয়ারী মেওয়া।
-পেশোয়ারী মেওয়া? কত কইর্যা আনছস?
নাকটা আরো উঁচু করে বললুম, কুড়ি টাকা সের।
কুড়ি টাকা সেরের মেওয়া? হাবুল একটা হাঁ করল : আইজকাল তো তুই সোনা খাইতে আছস? দেখি দেখি, কেমন তোর মেওয়া–
বলেই, আর আমাকে সামলাবার সময় দিলে না। খপ করে হাত পুরে দিলে থলের মধ্যে।
–আরে আরে, এই নি তোর মেওয়া? কার জুতো চুরি কইর্যা পলাইতে আছস–ক দেখি?
ব্যাপারটা সব মিলে এমন বিতিকিচ্ছি হয়ে দাঁড়াল যে কী বলব! দেখতে-দেখতে রাস্তায় জড়ো হয়ে গেল লোক।
কী মশাই, জুতা চুরি করে পালাচ্ছে নাকি?
–আজকাল চারিদিকে জুতো-চোরের মরশুম। ট্রাম থেকে পর্যন্ত সরাচ্ছে মশাই। সেদিন দুপুরবেলা শ্যামবাজার যেতে যেতে যেই চোখে একটু ঢুলুনি এসেছে, অমনি আর কথা নেই–আমার নতুন জুতো-জোড়া একেবরে ভোঁ-ভাঁ।
