এই কি তার চেনা দেশ? দেড় বছর আগেকার দেশ? এখানকার মানুষগুলো কেমন করে কথা বলে! দু-পয়সা দামের জিনিস বারো পয়সা। তার দিকে ফিরেও কেউ তাকায় না। সকলের চোখ মাটির দিকে আর হলদে রঙের কুর্তিপরা সাদা-কালো মিলিটারিদের দিকে। সে যেন এখানে অনাবশ্যক, যেন বিদেশে এসে পড়েছে কোথাও।
চেহারা বদলেছে পৃথিবীর, চেহারা বদলেছে মঙ্গলবাড়ির। এখানেও মাঠের মধ্যে নতুন মিলিটারি উপনিবেশ। বিকৃত কণ্ঠের গান ছড়িয়ে পড়ছে বাতাসে। দৈত্যের মতো বড়ো বড়ো চোখের আগুন ছড়িয়ে পেট্রোলের গন্ধে চারদিক ভরিয়ে দিয়ে ছুটছে মোটর, যেন ঝড় বয়ে যাচ্ছে। ওই গ্রামে, ওই তেঁতুল গাছের ছায়ার নীচে বদন চৌকিদারের ঘরটা এখনও কি টিকে আছে? মল্লী কি বেঁচে আছে এখনও?
একটা অনিশ্চিত সন্দেহে বাঞ্ছার হাত-পা কাঁপতে লাগল, বুকের ভেতরটা শুকিয়ে আসতে লাগল। যদি মল্লী মরে গিয়ে থাকে? যদি পথে-ঘাটে ছড়ানো অসংখ্য নরমুন্ড আর শুকনো পাঁজরের মধ্যে মিলিয়ে থাকে সেও? এই দেড় বছরের মধ্যে যে বাংলাদেশে মন্বন্তর বয়ে গেছে সে-খবর জানতে পেরেছে বাঞ্ছা। কে আছে আর কে যে নেই আজ তা অনুমান করাও শক্ত।
বাঞ্ছা অন্ধকারময় মঙ্গলবাড়ির দিকে তাকিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। কী করবে সে, যাবে ওখানে? এতক্ষণে নিস্তারণের কথার অর্থটা তার কাছে যেন স্পষ্ট হয়ে উঠল। এমনভাবে না পালিয়ে জেলে থাকলেই ভালো করতিস বাঞ্ছা।
কিন্তু কতদিন মল্লীকে দেখেনি সে। তার মল্লী–সপ্তদশী সুন্দরী মল্লী। হালকা, চটুল। বুকের মধ্যে আঁকড়ে ধরলে সাপের মতো পিছলে যায়। মল্লীকে বিয়ে করে নেশা ধরে গিয়েছিল তার, বাইরে বেরোনোর বদ অভ্যাসগুলো একরকম ভুলেই গিয়েছিল। প্রদীপের আলোয় নির্জন ঘরে মল্লীর সেই চোখ, সেই খিলখিল করে হাসি!
বাঞ্ছার রক্ত চঞ্চল হয়ে উঠল। না না, মরতেই পারে না মল্লী। এমন সুন্দর! এমন অপরূপ! আত্মবিস্মৃতের মতো সে এগিয়ে চলল।
বদনের ঘর তেঁতুল গাছের ছায়ায় ঠিক আছে। কোথাও এতটুকু রূপান্তর নেই তার। বরং বাড়িটার শ্রী ফিরেছে আগেকার চাইতে। বাইরে নতুন দাওয়া, তাতে শালের খুঁটি, কয়েকটা ছোটো-বড়ো কাঠ আর বেতের বসবার আসন। বোঝা যাচ্ছে আগের চাইতে সামাজিক হয়েছে বদন।
কী বলে ডাক দেবে ভাবতে ভাবতে সামনের দরজাটা খুলে গেল আর সামনে এসে দাঁড়াল একটি মেয়ে। হাতে তার প্রদীপ। মুহূর্তে বাঞ্ছা বিমূঢ় আর আচ্ছন্ন হয়ে গেল। সুন্দরী তরুণী মেয়ে। রঙিন শাড়িপরা—মুখে প্রসাধনের চিহ্ন, যেন রূপকথার রাজকন্যার মতো
সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। বাঞ্ছা কী বলবে ভেবে পেল না, শুধু গলা দিয়ে একটা অব্যক্ত অস্ফুট শব্দ বেরিয়ে এল।
মেয়েটি চমকে গেল। হাতের প্রদীপটা তুলে ধরে বললে, কে?
আ—আমি। বাঞ্ছার স্বর জড়িয়ে আসতে লাগল।
আমি কে? মেয়েটির গলার সুর কঠিন।
আমি, আমি বাঞ্ছা। আমাকে চিনতে পারছিস না মল্লী?
অ্যাঃ!
মল্লী পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল, তার হাত কাঁপতে লাগল, কাঁপতে লাগল তার হাতের প্রদীপের শিখাটা। যেন মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গেছে দুজনে। বিমূঢ় বিহ্বল বাঞ্ছা ভাবতে লাগল–মল্লী কি জানতে পেরেছিল আজ সে আসবে। তারই জন্যে প্রতীক্ষা করছিল এমনভাবে, তাকে বুকের ভিতরে টেনে নেবে বলে? কিন্তু মল্লীর চোখ-মুখ দেখে তা তো মনে হওয়ার উপায় নেই।
আর মল্লীর যেন বাকরোধ হয়ে গেছে। স্বামীকে দেখছে না—দেখছে একটা প্রেতমূর্তি। মুখের ওপর ভয় আর সংকোচের ছায়া নিবিড় হয়ে নেমে এল তার।
মল্লীর ঠোঁটই আগে নড়ে উঠল।
ভিতরে এসো।
ঘরে ঢুকে মল্লীও দরজা বন্ধ করে দিলে। কিন্তু বাঞ্ছার আর বাকস্ফুর্তি নেই। এ কার ঘর! খাটের ওপরে পুরু করে বিছানা পাতা, তাতে ধবধবে চাদর। একটা ছোটো টেবিলে এক টিন সিগারেট, দেশলাই। পেটমোটা রুপোর সিল-করা বোতল, গেলাস। বাঞ্ছা স্বপ্ন দেখছে না কি?
এ ঘর তোমার?
হ্যাঁ আমার।
কিন্তু এসব পেলে কোথায়? কী এ-সমস্ত?
সেকথার কোনো জবাব দিলে না মল্লী। বললে, পরশু রাতে তুমি পালিয়েছ শহরের জেল থেকে?
হুঁ।
এখানে খবর এসেছে। দাদার মতিগতি খারাপ, তোমাকে দেখলেই ধরিয়ে দেবে। এখনি পালাও।
ধরিয়ে দেবে! পালাব? কেন?
কেন? মল্লী হাসল, হাসিটা কান্না না একটা বীভৎস মুখভঙ্গি! বুঝতে পারছ না এখনও? দেখে আসনি মিলিটারিদের আস্তানা? ঘরের চেহারা দেখছ না? বুঝতে পার না এত বড়ো আকালে আমরা বেঁচে আছি কী করে—রাজার হালে আছি?
রূপকথার গল্পে ডাইনির চুলের ছোঁয়ায় পাথর হয়ে গিয়েছিল রাজপুত্র। বাঞ্ছার গায়েও যেন সেই ডাইনির সাপের মতো চুলের ছোবল লেগেছে এসে। পায়ের থেকে মাথা পর্যন্ত যেন হিম হয়ে আসছে তার—যেন জমে যাচ্ছে। শুধু বিহ্বল দৃষ্টিতে সে দেখছে কী চমৎকার সাজানো ঘরখানা। রাজবাড়ির মতো বিছানা, রাজকন্যার মতো সেজেছে মল্লী। তার গায়ের থেকে আসছে পাউডারের গন্ধ। টেবিলে দেশলাই, সিগারেট, মদের বোতল, গ্লাস। যুদ্ধার্থী বীরের জন্য প্রেমমাল্য নিয়ে প্রতীক্ষা করছে বীরভোগ্যা সুন্দরী নারী।
বাইরে নাগরা জুতোর শব্দ। মল্লীর মুখ পাংশু হয়ে গেল।
হাঁক দিলে বদন চৌকিদার, মল্লী!
পান্ডুর মুখে মল্লী জবাব দিলে, উ?
ঘরে লোক আছে?
হুঁ। এক মুহূর্ত বাঞ্ছার বলির পশুর মতো চেহারাটার দিকে তাকাল সে। তারপর জবাব দিলে, সায়েব এসেছে।
