বাঞ্ছা বললে, তাই ভাবছি। এখন যাচ্ছি বউয়ের কাছে—শ্বশুরবাড়িতে। রাতারাতি ওকে তুলে নিয়ে অসমের দিকে চলে যাব। ওদিকে তো শুনেছি যুদ্ধ হচ্ছে, ঢের কুলি খাটছে, তাদের সঙ্গেই…
কুঞ্চিত মুখে নিস্তারণ চুপ করে রইল খানিকক্ষণ। থেকে থেকে হাপরের আগুনের এক একটা লাল আভা তার মুখের ওপর এসে পড়তে লাগল।
জেলেই বোধ হয় ভালো ছিলি বাঞ্ছা!
কেন? বাঞ্ছা বিস্মিত দৃষ্টিতে নিস্তারণের রহস্যমন্ডিত মুখের দিকে তাকাল।
না, সে থাক।
বাঞ্ছা উদবেগ বোধ করতে লাগল। নিস্তারণের কথার মধ্যে কেমন একটা সুর আছে, নিহিত আছে এমন একটা ইঙ্গিত যাতে সমস্ত মন সংশয়ে আচ্ছন্ন করে তোলে। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে নিস্তারণের মুখের দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে বললে, নিস্তার দা।
কী বলছিলি?
শেখ বাড়ির আমবাগানে অত মড়ার হাড় কেন?
নিস্তারণ মুখের পাশে গাঁজার ধোঁয়ার কুন্ডলী রচনা করতে লাগল–মানুষ মরেছে।
অত মানুষ! কী হয়ে মরল?
কী হবে আবার, মরতে হয় তাই মরেছে। সে যাক। তুই রাত্তিরটা এখানেই থাকবি না। চলে যাবি বউয়ের কাছে?
চলেই যাই। বাঞ্ছার মুখে একসঙ্গে উৎকণ্ঠা আর অস্বস্তি প্রকাশ পাচ্ছে। আমার যেন কীরকম লাগছে নিস্তার দা। এই দেড় বছরে দেশটা এত বেশি বদলে গেল নাকি?
সবই তো বদলায়। পৃথিবী যে বদলাল তাতে আর আশ্চর্য কী।
আবার খানিকটা নীরবতা। হাপরের হাওয়ায় আগুন চমকে উঠছে। নিস্তারণের মুখের ওপর খেলা করে যাচ্ছে হিংস্র একটা আরক্ত আভা।
নিস্তারণ বললে, থাক, ওসব কথা থাক। যাবি তো সরকারি কাপড়চোপড় বদলে যা। একটা ছেঁড়া ধুতি দিয়ে দিই বরং। ও-বেশে রাস্তায় বেরুলে তো রক্ষা থাকবে না।
রাত বাড়ছে। অন্ধকার মেঠোপথ দিয়ে এগিয়ে চলল বাঞ্ছা। তারায়-ভরা মুক্ত আকাশের আশীর্বাদ, তমসাবিকীর্ণ বিস্তীর্ণ পৃথিবীর আহ্বান। রাত্রির পাখি ডাকছে, শিরশির করে বয়ে যাচ্ছে হাওয়া। কারণে অকারণে কুকুর ডেকে উঠছে, দূরদূরান্ত থেকে তার উত্তর আসছে।
মুক্তি। পায়ে বেড়ি নেই, আঁটোসাঁটো জাঙিয়া নেই। ষাঁড়ের কুঁজের মতো ঢেউ-খেলানো প্রাচীরের আড়ালে অবরুদ্ধ জগৎ। সেলের ভিতর থেকে খুনি আসামিট থেকে থেকে পাগলের মতো চিৎকার করে ওঠে। পাথর ভাঙতে ভাঙতে শিস দিয়ে একটা অশ্লীল গান গেয়ে ওঠে একজন। হঠাৎ আসে ভোজপুরি ওয়ার্ডারটা। যমদূতের মতো চেহারা, সিদ্ধির নেশায় দুটো টকটকে রাঙা চোখ। বাপবাপান্ত ছাড়া আর কোনো সম্ভাষণই জানে না সে।
অ্যাও শালা-ক্যা হোতা হ্যায়?
ক্যা হোতা হ্যায় জমাদারজি?
আর জমাদারজি। লাথিটা ঠিক জুতমাফিক এসে পড়েছে। পাথরের ওপর পড়েছে মুখটা, ঠোঁটটা ঘেঁচে গেছে খানিক। দাঁতের গোড়া দিয়ে রক্ত পড়ছে।
তবু সে-অবস্থায়ও হাসতে হয়।
সমস্ত মুখটা রক্তে রাঙা হয়ে গেছে। দুই কষে রক্ত, তবু একটা বিগলিত চরিতার্থ হাসি। যেন জমাদার লাথি মারেনি, পিঠে হাত বুলিয়ে আদর করে দিয়েছে মাত্র।
কসুর মাপ করো জমাদারজি।
সরকার সেলাম…
নকিবের হুঙ্কার। এ প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত—আর্যাবর্ত-দাক্ষিণাত্য নিনাদিত রাজকীয় ঘোষণা। যে যে-অবস্থায় আছ উঠে দাঁড়াও, সেলাম ঠোকো।
বীভৎস জীবন। নরক। অমানুষিক দুঃস্বপ্ন। তারায় ভরা আকাশের নীচে আর মেঠো আলোর পথ দিয়ে চলতে চলতে সেটাকে অবিশ্বাস্য আর অসম্ভব ঘটনা বলে মনে হয়।
মাঝে মাঝে ঘুমিয়ে আছে গ্রামগুলো। নীড় স্বপ্ন দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে গড়া মানুষের ঘর। এখানে দুঃখ নিজের, ব্যথাও নিজের। প্রতি মুহূর্তে দুঃসহ অপমানের পীড়ন নেই। বাঞ্ছা অন্ধকারের মধ্য দিয়ে ক্লান্ত পায়ে হাঁটতে লাগল। অত্যন্ত খিদে পেয়েছে—মাথা ঘুরছে। ইচ্ছে করছে প্রতি মুহূর্তে পথের ওপর লুটিয়ে পড়তে, বুকের মধ্যে খানিকটা অবাধ বাতাস টেনে নিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়তে।
কিন্তু না, থামলে চলবে না। এখনও সামনে অনেক পথ বাকি—অনেক গ্রাম, অনেক মাঠ, দু-খানা হাটখোলা। একদিন এক রাত্রির রাস্তা। আর নিস্তারণ লোক ভালো, আসবার সময় আট গন্ডা পয়সা দিয়ে দিয়েছে সঙ্গে; ওই দিয়েই যা হয় খাওয়া-দাওয়ার বন্দোবস্ত করতে হবে।
বাঞ্ছা জোর করে শক্তি সংহত করে নিলে শরীরে, দৃঢ় আর দ্রুতপায়ে চলতে শুরু করে দিলে। মাঠের হাওয়ায় পাঁজরের টনটনে ব্যথাটা জুড়িয়ে আসছে, পায়ের তলায় কাঁটার তীক্ষ্ণখোঁচাগুলো তেমন করে আর বিঁধছে না। কিন্তু গ্রামগুলো এমন ঘুমন্ত কেন! একটা গানের কলি, জারি গানের একটি সুরও কোনোখান থেকে ভেসে আসছে না কেন! শুধু শেয়াল-কুকুর ছাড়া দেশে আর মানুষ নেই নাকি! দূরে দূরে আলেয়া ছাড়া লণ্ঠন হাতে একটা লোকও চলছে না। দেড় বছরে বাংলাদেশ কি এতই ঘুমকাতুরে হয়ে গেল!
এক দিন, এক রাত। সন্ধ্যা ঘোর হয়ে আসছে। বাঞ্ছা এসে দাঁড়াল মঙ্গলবাড়ির মাঠের ধারে।
ওই তো গ্রাম। ঝাঁকড়া তেঁতুল গাছটা পার হলেই বদন চৌকিদারের ঘর। তার শালা। কিন্তু এতক্ষণে বাঞ্ছার মনটা ভরে উঠল সংশয়ে। যাবে কি যাবে না।
পথে আসতে আসতে অনেক জিনিসই তার নজরে পড়েছে। নতুন রাস্তা হয়েছে যেখানে সেখানে, ঝকঝকে তকতকে পাথর-ফেলা রাস্তা। মাঝে মাঝে নতুন নতুন গ্রাম বসেছে। বড়ো বড়ো আটচালা, এক ইটের কোঠাঘর, টিউবওয়েল। প্রকান্ড প্রকান্ড মোটর সেইসব নতুন রাস্তা ধরে নতুন গ্রামের দিকে এগিয়ে চলেছে। মিলিটারি কলোনি।
