নিস্তারণ লোহারের কামারশালা গ্রামের একান্তে।
ছোটো চালাঘর। সামনের দরজাটা এত ছোটো যে প্রায় হাঁটু ভেঙে ঢুকতে হয় তার ভেতরে। পয়সার অভাবেও বটে, আর খানিকটা ইচ্ছে করেও বটে—ঘরের দরজাটা নিস্তারণ ছোটোই রেখেছে। ঢোকবার সময় শত্রু অর্থাৎ পুলিশকে যাতে অনেকক্ষণ দ্বিধা করতে হয় এবং সেই ফাঁকে দরকারি দু-চারটে জিনিস সে নিরাপদে হাতসাফাই করে ফেলতে পারে। পুলিশের গভীর সন্দেহ তার ওপরে। সে নাকি লোহার ছাঁচ তৈরি করে দিয়ে স্বদেশি টাকা প্রসারের ব্যাপারে সহায়তা করে থাকে।
নিস্তারণ অবশ্য সেজন্যে গর্বিত। এদিক থেকে স্বদেশি বাবুদের সঙ্গে এক-জাতীয় একাত্মতা অনুভব করে সে। তোমরা দিশি খদ্দর পর, তোমরা বিলিতিকে বাদ দিতে চাও, তোমরা বোমা তৈরি করে রাতারাতি স্বাধীনতা আনতে চাও। সেদিক থেকে আমিই-বা কম কী। আমিও স্বদেশি জিনিস তৈরি করছি; বিদেশিকে প্রাণে না মেরে তার পকেট মারছি, হরে দরে দুটোই এককথা। তা ছাড়া রোমাঞ্চ এবং উত্তেজনা আমার ক্ষেত্রেও একেবারেই কম নয়।
আর নিস্তারণ নিজেও ছোটোখাটো মানুষ। ভেতরে ঢুকতে এর চাইতে বড়ো দরজা তার দরকার হয় না। কৈফিয়ত হিসেবে এইটুকু বললেই তার যথেষ্ট।
সেই ছোটো দরজাটার ঝাঁপ খোলা। আর তাই থেকে এক টুকরো লাল আলো বাইরে দপ করে ঝলকে পড়ছে আবার নিবে যাচ্ছে। দশ-বারোটা মহিষের নিশ্বাস টানবার মতো শব্দ উঠছে একসঙ্গে—হাপর। ঝনঝন করে ভেতরে হাতুড়ির ঘা পড়ছে আর খোলা দরজার পাশে আগুনের ফুলকি উড়ে উড়ে এসে বাইরের জোনাকির ঝাঁকের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে।
নিস্তার দা, নিস্তার দা!
হাপরের দীর্ঘশ্বাসে নিস্তারণ শুনতে পেল না। আবার দরজায় টোকা দিয়ে তীব্র চাপা স্বরে সে ডাক দিলে, নিস্তারণ দা আছ?
বাইরে লাল আগুনের যে আভা পড়ছিল, এক বার দপ করে উঠেই নিবে গেল সেটা। ঝনাৎ করে একটা প্রচন্ড শব্দ করেই বন্ধ হল হাতুড়ি। শেষ ঝাঁক জ্বলন্ত লৌহকণার জোনাকি এসে অন্ধকারের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ল। সদাসন্দিগ্ধ নিস্তারণের ঘর স্তব্ধ হয়ে গেল একটা রহস্যময় নীরবতায়।
নিস্তার দা, ঘরে আছ কি?
কে? লোহার হাতুড়িটা শক্ত করে বাগিয়ে ধরে মিশকালো রঙের প্রৌঢ় বেঁটে জোয়ানটা তীক্ষ্ণ গলায় জিজ্ঞাসা করলে, এত রাত্রে কে ডাকছে?
আমি বাঞ্ছা।
বা–ঞ্ছা?
যেন ঘরের মধ্যে বোমা ফেটেছে একটা, নিস্তারণ থ মেরে রইল এক মুহূর্ত। গলার স্বরটা চিনেছে, তবু শেষপর্যন্ত না আঁচালে বিশ্বাস নেই।
বাঞ্ছা! কোন বাঞ্ছা?
আমাকে চিনতে পারছ না গো? সোনাডাঙার বাঞ্ছা হাড়ি?
দরজার পথে নিস্তারণ লোহার এসে দাঁড়াল। সাড়ে তিন হাত মিশকালো মানুষ, হাত দুটো প্রায় হাঁটুতে গিয়ে ঠেকে। গায়ে জামা নেই—হাপরের আবছা আলোয় দেখা যায় সাপের পাকের মতো যেন তার সারা গায়ে মাংসপেশি আবর্তিত হয়ে খাচ্ছে। মুখের ওপর ধবধবে সাদা এক জোড়া গোঁফ গায়ের ঘোর কালো রঙের সঙ্গে আশ্চর্যভাবে ছন্দ মিলিয়েছে।
তুই কোত্থেকে এলি এ সময়ে?
আস্তে, চেঁচিয়ো না। আমার দিকে তাকিয়ে দ্যাখো-না এক বার।
তাই তো। পায়ে বেড়ি, গায়ে সরকারি জাঙিয়া। পলাতকের ক্লান্ত দুর্গম পথ তার শরীরের সর্বত্র প্রত্যক্ষ প্রকট চিহ্ন এঁকে দিয়েছে।
কী সর্বনাশ, তুই ফাটক থেকে পালিয়েছিস নাকি?
পালালাম তো। কদ্দিন আর ভালো লাগে বলো। তিন বছর মেয়াদ হয়েছিল। দেড় বছর খেটেছি, আর থাকতে ইচ্ছে করল না।
পালিয়ে এলি কী করে?
বাঞ্ছা দু-তিনটে পোকাধরা দাঁত বের করে আপ্যায়নের হাসি হাসল এইবারে। বললে, যেমন করে পালাতে হয় তেমনি করেই। পাঁচিল টপকে, মাঠ-ঘাট বন-জঙ্গল দিয়ে।
আয় আয়, ভেতরে আয়। কেউ আবার টপ করে দেখে ফেলবে। নিস্তারণ হাত ধরে তাকে কামারশালার ভেতরে টেনে নিয়ে এল। পেছনে ছোটো ঝাপটা ধড়াস করে দিলে আটকে।
ঘরের মধ্যে পোড়া কাঠকয়লার গন্ধ, পোড়া লোহার গন্ধ, হাপরের পুরোনো চামড়ার গন্ধ। একপাশে একটা লণ্ঠন মিটমিট করছে। আগুনের মধ্যে পুড়ে গনগন করছে লোহা। ছোটো ঘর, কোনোখানে একটি জানলা নেই, কোথাও এতটুকু আলো আসবার অনাবশ্যক পথ রাখেনি নিস্তারণ। একটা গুমোট গরমে হঠাৎ যেন নিশ্বাস বন্ধ হয়ে এল বাঞ্ছার।
নাও আগে বেড়িটার একটা ব্যবস্থা করে দেখি নিস্তার দা। ভদ্দরলোক না হতে পারলে আর ভালো লাগছে না।
ছেনি দিয়ে বেড়ি কাটতে কাটতে নিস্তারণ বললে, পালিয়ে তো এলি, এখন থাকবি কী করে।
সে ভাবতে হবে না, একটা ব্যবস্থা করে নেবই।
কট। বেড়িটা দু-খানা হয়ে নীচে পড়ে গেল। শৃঙ্খলের অবসান। বাঞ্ছা নিজের পায়েই এক বার হাত বুলিয়ে নিলে।
নাঃ, কোনোখানে কিছু বাজছে না। দু-পা হেঁটে দেখল সারাক্ষণের সে গুরুভারটা দূর হয়ে গেছে। আঃ! কী আশ্চর্য একটা মুক্তির অনুভূতি।
নিস্তারণের ঘরে বসে যে ছোটো ছেলেটা হাপর টানছিল, সে-ই একটা গাঁজার কলকে এগিয়ে দিলে। হলদে রঙের ন্যাকড়াটা জড়াতে জড়াতে নিস্তারণ বললে, দিবি নাকি একটান।
নাঃ। বাঞ্ছা হাসল, এবার ওসব ছেড়েই দেব ভাবছি।
উঁঃ? নিস্তারণ সাদা-কালো জ্বর নীচে চোখ দুটোকে বার কয়েক নাচিয়ে নিলে। দেখছি এবারে জেল খেটে তুই সত্যিই মানুষ হয়ে এলি।
বাঞ্ছা এবারেও নিরুত্তরে হাসল।
তাহলে সিঁদকাঠির আর দরকার হবে না?
বোধ হয় না।
যাক বাঁচলি তাহলে। একমুখ ধোঁয়া ছড়িয়ে নিস্তারণ বলল, কিন্তু এখন কী করবি? পুলিশ তো ফেউয়ের মতো পিছনে লেগেছে, ধরলে পাক্কা পাঁচটি বছর ঠুকে দেবে।
