দপ দপ দপ…
নদীর ওপারে অত বড়ো কীসের আলো ওটা? জলটা মুহূর্তে ঝলসে উঠল খানিকটা তীব্র আগুনের আকস্মিক দীপ্তিসম্পাতে। নাঃ, ভয় পাওয়ার কিছু নেই। নিতান্তই আলেয়া।
একটা আম গাছের গুঁড়িতে ঠেসান দিয়ে পলাতক বসে পড়ল। আর চলতে পারছে না সে। সমস্ত দিন পেটে কিছুই পড়েনি, নাড়িভুড়িগুলো খিদেয় একসঙ্গে জড়াজড়ি করছে জ্বলে যাচ্ছে। তা ছাড়া একেবার অক্ষতদেহও সে নয়। অত বড়ো পাঁচিলের উপর থেকে লাফ দিয়ে নীচের মোটা ডালটা ধরবার সময় পাঁজরে একটা চোট লেগেছিল, তীব্র যন্ত্রণা সেখানে টনটন করে উঠছে। জঙ্গলের পথ দিয়ে ছুটে আসবার সময় লাটা গাছের আঁচড়ে দু-পায়ের চামড়া ছিঁড়ে গেছে একেবারে। এখান-ওখান থেকে রক্ত চুইয়ে পড়ছে ধুলোভরা পায়ের পাতার ওপর। পায়ের তলায় অনবরত খচ খচ করে বিধছে, অন্তত ডজন খানেক কাঁটা যে মাংসের ভেতরে ঢুকে নিশ্চিন্তে বিশ্রাম করছে তাতে বিন্দুমাত্রও সন্দেহ নেই।
অহস্য ক্লান্তিতে পা ভেঙে সে বসে পড়ল মাটিতে। পিপাসায় বুকের ভিতরটা পুড়ে যাচ্ছে আর সামনে তারার আলোয় দীপ্তি পাচ্ছে রুদ্ধস্রোতা নদীর কালো জল। সে-জল থেকে দুর্গন্ধ আসছে পচা পাতার, জমাট শ্যাওলার, রাশীকৃত পাঁকের। তবু ওই জলটা তাকে হাত বাড়িয়ে আকর্ষণ করতে লাগল। সমস্ত তৃষ্ণার্ত শিরা-স্নায়ুগুলো যেন একসঙ্গে কোলাহল করে বলতে লাগল–চলো, চলো জুড়িয়ে দাও আমাদের। জ্বলে যাচ্ছি, পুড়ে যাচ্ছি আমরা। চলো, চলো…
কিন্তু উঠতে গিয়েও আঠারো নম্বর উঠতে পারল না। অত্যন্ত গভীর অবসাদ। জল সে খাবে, তার আগে এক বার বুক ভরে অনুভব করে নেবে তার মুক্তিকে। দীর্ঘ দেড় বছর পরে ফিরে-পাওয়া তার স্বাধীন জীবনানন্দকে।
তারায় ভরা আকাশটার দিকে সে এক বার তাকাল। অপরিসীম–অপর্যাপ্ত। কোনোখানে এতটুকু ছেদ পড়েনি, কোনোখানে নিষেধের প্রাকার তুলে সেই নীলিমাকে কেউ খন্ডিত করে দেয়নি। জেলখানার প্রাচীরের ভেতর দিয়ে যে-আকাশ সে দেখত—তা যেন তারই মতো বন্দি। সেখানে এক টুকরো মেঘ দেখা দিয়েই পালিয়ে যেত, ফটিক জল পাখি নতুন বর্ষার আনন্দে নেচে যেত শুধু একটি মাত্র মুহূর্তের জন্য। ষাঁড়ের কুঁজের মতো ঢেউ-খেলানো পাঁচিলের ওপারে মর্মরিত ছোটো একটি নারিকেল কুঞ্জের এক ছোপ সবুজ ছাড়া বিশাল পৃথিবীর মহারণ্যের কোনো সংবাদই পাওয়া যেত না।
আর এই তো দিগন্ত। বন্দি চোখকে মুক্তি দাও—পাঠিয়ে দাও দূরেদূরান্তে। বৃত্তাকার চক্ৰবালে, মাঠের শেষে, বহুদূরের নাম-না-জানা গ্রামের সীমানায়। উড়ে চলে যাও শরতের আকাশের সোনা-ঝরানো আলো পাখায় মেখে নেওয়া নীলকণ্ঠ পাখির সঙ্গে সঙ্গে। নদীর চর পেরিয়ে কাশের বনে, কাশের বনের ওপারে তাল আর খেজুরের বীথিতে, তারপরে আরও দূরে। আকাশের শেষ নেই, অরণ্যের শেষ নেই, দিক প্রান্তরের শেষ নেই, জনপদের ইয়ত্তা নেই এবং মহাপৃথিবীর সীমানা নেই।
আর মানুষ। শাসন আর ভয়। প্রতি মুহূর্তে শৃঙ্খলের পেষণ। দুর্বাক। পায়ের বেড়িতে ঝনঝন শব্দ তুলে সরকার সেলাম।
কিন্তু এখানে বহুধা আর বহুব্যাপ্ত জীবন। হাটে বাজারে, খেয়ানৌকোয়, যাত্রা আর জারি গানের আসরে। এখানে বিয়েতে সানাইয়ের সুর লাগে; এখানের বোধনের ঢাক বাজে-বাঁশি বাজে। এখানে মানুষ হাসে, মানুষ কাঁদে। মানুষ ভালোবাসে, মানুষ অপমান করে। কত বিরাট—কত বন্ধনহীন। ঘর এখানে ডাকে, আবার দিগন্ত এসে ছিনিয়ে নিয়ে যায়।
বুক ভরে প্রকান্ড একটা নিশ্বাস নিলে সে। ফাযন এসেছে, আমের বনে ধরেছে মুকুল। বাতাসে ভাসছে মধুর আর মদির গন্ধ। শুকনো পাতার ওপর ঝিরঝির করে চুইয়ে পড়ছে মধু—শব্দ হচ্ছে টুপ-টুপ-টুপ। আঠায় পায়ের তলাটা চটচট করছে।
মরা নদীর ওপর থেকে বাতাস আসছে। হোক দুর্গন্ধ—তবু মুক্ত বাতাস, তবুও মুক্তির বার্তা। মনে হল যেন এতদিন পরে ওর ফাঁকা আর ফাঁপা ফুসফুসটা পরিপূর্ণ হয়ে গেল। যেন শিরার মধ্যে অচল হয়ে থেমে যাওয়া রক্ত আবার পূর্ণ তেজে বইতে শুরু করেছে।
আঠারো নম্বর উঠে দাঁড়াল। নিঝুম নিঃশব্দ পৃথিবী, শুধু টুপ-টুপ করে মৌঝরানির শব্দ। এখানে কেউ আর তাকে খুঁজে পাবে না, তার পেছনে পেছনে এতদূরে অন্তত ছুটে আসেনি কেউ। কিন্তু সরকারের শাসন-লোহার বেড়ি এখনও পায়ের গিঁটে খট খট করে বাজছে। সরকারি ডোরাকাটা ফতুয়া আর জাঙিয়া এখনও লজ্জানিবারণ করছে তার। এই রাজকীয় দাক্ষিণ্য থেকে আগে তাকে মুক্তি পেতে হবে।
কিন্তু উঠে দাঁড়াতেই পায়ে ঠক করে কী-একটা ঠেকল তার। শুধু ঠেকল না, খানিকটা গড়িয়েও গেল যেন। কৌতূহলভরে সেটাকে তুলে নিতে গিয়েই সে আর্তনাদ করে সভয়ে পিছিয়ে গেল। একটা নরমুন্ড। বেশিদিনের পুরোনো নয়, এখনও তার সঙ্গে শুকনো ক্লেদ আর কয়েকগুচ্ছ চুল জড়িয়ে রয়েছে!
একী ব্যাপার! অন্ধকারের মধ্যে ঝাপসা দৃষ্টিতেও যেন সে স্পষ্ট দেখতে পেল শুধু একটা নয়, পাঁচটা-ছয়টা-সাতটা-আটটা… অগুনতি মানুষের মাথা তার সর্বত্র ছড়িয়ে রয়েছে। দেড় বছরের মধ্যে এই বহুপরিচিত আমবাগানটা এমনভাবে শ্মশান হয়ে গেল কী করে?
মুহূর্তে মিথ্যে হয়ে গেল সব। আমের মুকুলের গন্ধ, তারায় ভরা আকাশ, মরা নদীর ঠাণ্ডা জল। মনে হল এখানে যেন থমথম করছে মৃত্যুর বিভীষিকা। ঊর্ধ্বশ্বাসে আমবাগান থেকে ছুটে পালাল আঠারো নম্বর। জীবিতেরা নয়, এখানে মৃতের দল তার পিছনে পিছনে তাড়া করে আসছে।
