ঘোঁ-ঘোঁ করে বললুম, আমি তো আর দর্জি না।
আরে দর্জি না হলে কী হয়–হেলেপ, সেলেফ-হেলেপ! এই এমনিভাবে পোটাপোট—
পোটাপোট মানে পটাপট সেলাই করতে গিয়ে খুচ করে ছুঁচের ডগা বিধে গেল বুড়ো আঙুলে।
উরেব্বাপ বলে আমি চেঁচিয়ে উঠলুম।
দেখো একবার কেণ্ডো (মানে, কাণ্ড)! আমি কি তোমায় আঙুল সেলাই করতে বলেছি নাকি? বিরক্ত হয়ে ঘোড়ামামা জানতে চাইলেন।
একত্কিউজ মি ঘোড়া–মানে মামা, আমি আর সেলাই করতে পারব না–বিদ্রোহ করে এবারে আমি বললুম, যথেষ্ট খেটেছি, এবার টাকা দিন, কাটলেট খেয়ে আসি।
অ্যাঃ, কেটলেট-কেটলেট করে এ পাগল হয়ে যাবে দেখছি।–ঘোড়ামামা আমার পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, আর একটু–এই একটুখানি। তা হলেই কেটলেট রেডি হয়ে যাবে।
আরও আধ ঘণ্টা ধস্তাধস্তি করে, আরও একবার আঙুলে ছুঁচ ফুটিয়ে, সেই অত্যাশ্চর্য ইজিচেয়ার সেলাই শেষ হল। তখন আমি বেদম হয়ে বসে পড়েছি। আঙুল টনটন করছে, ঘাড় ব্যথা করছে, সারা গা বেয়ে টপটপ করে ঘাম পড়ছে। সেই অবস্থায় আমি বললুম, কাটলেট?
ঘোড়ামামা হেসে বললেন, হেঁ, কেটলেট। ইজিচেয়ারে বসে কেটলেট খেতে হয়। কিন্তু কেটলেট রাখার জন্যে তো একটা টিবিল চাই। সেই টিবিল বানাতে হবে। পেলারাম, কাল থেকে রাস্তায় আমরা টিবিলের কাঠ খুঁজব। তুমিও আমার সঙ্গে সঙ্গে খুঁজবে–কেমোন? ধরো, এক বছর, দেড় বছরের মধ্যে টিবিলের কাঠ হয়ে যাবে। তারপর টিবিল তৈরি হলে—
আমি খেপে গিয়ে বললুম, থামুন–থামুন। তারপর ভাঙা প্লেটের টুকরো যোগাড় করে করে, পুটিং জুড়ে ছমাস পরে প্লেট তৈরি হবে, ভাঙা কাঁচ কুড়িয়ে আরও ছমাস পরে গ্লাস—
হেঁ-হেঁ পেলারাম, মিথ্যে চেঁচাচ্ছ কেন? কেটলেট খাওয়া কি সোজা বেপার? ধৈর্য ধরতে হয়, কত এরেনজমেন্ট করতে হয় তার জন্যে। দু বছর, তিন বছর, চার বছর–যতদিন বাদেই হোক, কেটলেট তোমায় আমি খাওয়াবই। তবে কিনা, তুমিও একটু হেলেপ করবে বুঝেচ না? এই বছর দু-তিন আমার সঙ্গে রাস্তায় একটু কুড়বে ব্যস, তার পরেই গরমাগরম কেটলেট। হেঁঃ-হেঁঃ-হেঁঃ
বলে, দিলখোলা হাসি হেসে ঘোড়ামামা সেই ইজিচেয়ারে বসে পড়লেন। এবং এবং সেই রদ্দিমাকা ছাতার কাপড়, পুরনো রাস্তায় ফ্রেম, আর আমার অনবদ্য সেলাই!!
ফড়-ফড়-ফড়ড়াৎ! খটাং!
ভাঙা ইজিচেয়ারের ফ্রেমের মধ্যে চার হাত-পা তুলে চেঁচাতে লাগলেন ঘোড়ামামা : বেজায় আটকে গিয়েছি পেলারাম-টেনে তোলো-টেনে তোলোনা
এবার আমি স্পষ্ট গলায় বললুম, না ঘোড়ামামা, না। টেনে আমি তুলব না। আপনি ওর মধ্যে হাত-পা ছুঁড়তে থাকুন–ছুঁড়তেই থাকুন। ছুঁড়তে ছুঁড়তে এক মাস, দুমাস, তিনমাস পরে আস্তে-আস্তে আপনার হাত দুটো ডানা হয়ে যাবে। তারপর আপনি আকাশে ফ্রেমসুদ্ধ উড়তে থাকবেন, উড়তেই থাকবেন, তারপর আরও দু-তিন বছর রোদে-জলে বৃষ্টিতে পুড়ে–ফ্রেমটা খসে পড়ে যাবে, তখন আপনি ফ্রি। ইজিচেয়ারের ফ্রেম থেকে বেরুনো কি সোজা কথা ঘোড়ামামা? কত ধৈর্য ধরতে হয়, কত এরেনজমেন্ট করতে হয়–কোষ্টো না করলে কি আর কিষ্টো মিলে?
এই বলে–একলাফে আমি রাস্তায় নেমে পড়লুম।
চক্রব্যুহ
সরকার সেলাম–
বন্দিরা উঠে দাঁড়াল সঙ্গে সঙ্গে। এটা নিয়ম, শান্তি আর শৃঙ্খলার অপরিহার্য অনুশাসন। অবহেলা করলেই ওজনমাফিক পদাঘাত। উঠে দাঁড়াতে এতটুকু দেরি হলে মুখ-থুবড়ানো একটা আছাড় খেয়ে প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে তার।
সরকার সেলাম—
হাতের পর হাত উঠে যাচ্ছে কপালে। যত বিদ্রোহীই হও, যত বাঁকাই হোক ঘাড়, এখানে এলে সব সিধে হয়ে যাবে। নৈতিক আরোগ্যশালায় মানুষের যাবতীয় ব্যাধির চিকিৎসা করা হয়। কেউ বাদ নেই রোগীর দলে। চোর, পকেটমার, লম্পট, আত্মহত্যাকামী, হত্যাকারী, বিনা টিকিটের যাত্রী, ভারত রক্ষা বিধান অমান্যে অপরাধী এবং দেশপ্রেমিক। ব্যাধিগুলি মানসিক হলেও শলাকা প্রয়োগটাই একটু বেশি। পুন্নাম, রৌরব এবং কুম্ভীপাকের ইহলৌকিক সংস্করণ। ইংরেজের জেলখানা থাকা সত্ত্বেও পৃথিবীটা কেন যে স্বর্গপুরী হয়ে যায় না এইটেই আশ্চর্য!
এক দুই তিন চার…
গুনতি করে চলেছে ওয়ার্ডার। পাঁচ ছয় সাত…
কিন্তু আঠারো নম্বর? আঠারো নম্বর?
আঠারো নম্বর নেই, কোথাও নেই! চক্ষে বিশ্বাস করা যায় না, ব্যাপারটা স্বপ্ন হলেই ভালো হত। কিন্তু বিশ্বাস না করে উপায় নেই এবং এমন একটা ভয়ানক দুঃস্বপ্ন স্বপ্নই হতে পারে না কখনো। ওয়ার্ডারের মাথায় নীল আকাশ ফুড়ে বাজ নেমে এল কড়াকড় শব্দে।
ঢন ঢন ঢন…
আর্ত চিৎকার করে পাগলাঘণ্টি বেজে উঠল। সমস্ত জেলখানা সমুদ্রের মতো মথিত হয়ে উঠল মুহূর্তে। সসাগরা পৃথিবী অর্থাৎ এসডিও থেকে টাউন দারোগা পর্যন্ত এক সুরে আর্তনাদ করে উঠল, আঠারো নম্বর?
কিন্তু কোথায় কে!
আঠারো নম্বর তখন একটা মরা নদীর পাশে পাশে গা-ঢাকা দিয়ে হেঁটে চলেছে। দু-পাশে ঘন বাঁশ আর আমের ছায়া। আসন্ন সন্ধ্যায় অমাবস্যা রাত্রির মতো সে-ছায়া কালো হয়ে গেছে। অন্ধকারে অন্য মানুষ তো দূরের কথা, নিজেকেই সে দেখতে পাচ্ছে না। তবু থেকে থেকে শঙ্কিত সংশয়ে সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠছে তার, থমকে দাঁড়িয়ে পড়ছে।
কেউ কি আসছে? কেউ কি দেখতে পাচ্ছে?
চমকে থেমে দাঁড়ায় আঠারো নম্বর। হৃৎপিন্ডে রক্ত যেন উছলে ওঠে, মনে হয় বুকের স্পন্দনটা এত জোরে বাজছে যে দু-মাইল দূর থেকেও লোকে তা শুনতে পাবে! পায়ের তলায় শুকনো পাতাগুলো এমনভাবে মচ মচ শব্দ করে কেন? নিজেই কি সে নিজের শত্রু হয়ে দাঁড়াল?
