ঘোড়ামামার সঙ্গেই গেলুম।
একতলা-দোতলায় ভাড়াটে, ঘোড়ামামা তেতলায় একটা ঘর আর একটুকরো বারান্দা নিয়ে থাকেন। সেই ঘরের দিকে তাকিয়েই আমার প্রায় দমবন্ধ হয়ে এল।
কী নেই সেখানে?
সারা কলকাতার যত ফেলে-দেওয়া! যত কাগজের বাক্স, কাঠের টুকরো, ক্ষয়ে-যাওয়া দাঁতের বুরুশ, ছেঁড়া জুতো, মরচে-পড়া পেরেক, এখানে উৎকৃষ্ট চিড়া পাওয়া যায়, পাগলের মহৌষধ–কিছুই আর বাকি নেই। আর স্তুপাকার কাগজের টুকরো তো আছেই, যত কাগজ কুড়নের অন্ন মেরে দিয়েছেন ঘোড়ামামা। তাকিয়েই সমস্ত মনটা আঁতকে উঠল–যেন সারা গায়ে একজিমা কুটকুট করছে, এইরকম বোধ হল আমার।
বললুম, ঘোড়া—
ঘোড়া? ঘোড়া কী?
জিভ কেটে বললুম, সরি, মামা। আমি বলছিলুম কি মামা, আপনার ওই ঘরে বসে কাটলেট খাওয়া চলবে না। ঘরটা কী বলে ইয়ে, বিষম নোংরা।
নোংরা!–ঘোড়ামামা ভীষণ আশ্চর্য হয়ে গেলেন : তুমি কী বলছ হে পেলারাম। ওই ঘরে যা জিনিস আছে তা দিয়ে আমি দেড় পাটি জুতো বানাতে পারি, ছটা ঘুড়ি তৈরি করতে পারি, টিনের কৌটোয় হাতল লাগিয়ে পাঁচটা মগ বানাতে পারি–
আমি বললুম, থাক, থাক। জুতো, ঘুড়ি কিংবা টিনের মগে আমার দরকার নেই। আমি জানতে চাই-কাটলেট কোথায়! আর সেটা আপনার ওই ঘরেই আছে কি না–মানে রাস্তা থেকে পচা-টা একটা কুড়িয়ে এসেছেন কি না।
পোচা? রাস্তার পোচা কাটলেট!–ঘোড়ামামা যেন ভীষণ ব্যথা পেলেন আবার– তুমি কি আমায় এতই ছোটলোক ভাবলে পেলারাম! তোমার জন্যে কাটলেট আসবে পাড়ার দি গ্রেট আবার খাবো রেস্টুরেন্ট থেকে–গরম-গরম–প্রাণকাড়া
শুনতে-শুনতে আমার রোমাঞ্চ হল–চোখের সামনে ঝিলিক দিয়ে গেল দি গ্রেট আবার খাবো রেস্তোরাঁর একজোড়া গরম কাটলেট। এমন যে ঘোড়ামামা–যাঁর গাল ভর্তি ঝব্বু দাড়ি আর মুখভর্তি কাঁটাল-বিচির মত দাঁত, যিনি মাসে একবারও স্নান করেন কি না সন্দেহ, দশ হাত দূর থেকেও যাঁর গায়ের চিমসে গন্ধ পাওয়া যায়; ইচ্ছে করল, দুহাতে জাপটে ধরি তাঁকে।
বললুম, ঘো–আই মিন মামা, আর দেরি কেন তা হলে? আপনাকে আর কষ্ট করতে হবে না–টাকা দিন, আমি এক্ষুনি, দুটো গরম কাটলেট খেয়ে আসব কথা দিচ্ছি আপনাকে। যাকে বলে, ওয়ার্ড অব অনার। ঘোড়ামামা হাসলেন।
আহা-হা, ব্যস্ত কেন পেলারাম? এসবে-এসবে, কেটলেট এসবে। কিন্তু কেটলেট খাওয়ার জন্যে রেডি হতে হবে না? খেলেই হল?
রেডি? রেডি আবার কী?–আমি উৎসাহিত হয়ে বললুম, রেডি তো আমি হয়েই রয়েছি। কাটলেট খেতে আমি ভীষণ ভালবাসি, ক্যাবলার জন্যে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দারুণ খিদেও পেয়েছে–পেলেই তক্ষুনি খেয়ে ফেলব–আপনি দেখে নেবেন।
আহা, সে তো দেখবই–ঘোড়ামামা আবার একমুখ দাড়ি নিয়ে হাসলেন : তার আগে একটু হাত লাগাও।
কিসে হাত লাগাব?
কেটলেটের জন্যে।
কাটলেট পেলে তক্ষুনি হাত লাগাব। এক সেকেন্ডের মধ্যেই।
দেখো, পেলারাম, একটু কোষ্টো করতে হয়, নইলে কি আর কিষ্টো মিলে? কেটলেটের জন্যেও একটু পরিশ্রম করতে হবে বই কি।–বলতে বলতে ঘোড়ামামা ঘরের ভেতর থেকে ঘড়ঘড় করে একটা পুরনো ইজিচেয়ারের ফ্রেম টেনে আনলেন :এসো, আগে এটাকে মেনেজ করি।
এ আবার কী? এটাকে কোথায় পেলেন?
মুখুজ্যেদের বাড়ির পেছনে–আস্তাকুঁড়ে।
আরে রাম রাম!–আমি নাক সিঁটকে বললুম, আপনি যে কী-একটা ঘো–আই মিন মামা–যেখান-সেখান থেকে যা-তা কুড়িয়ে আনেন।
যা-তা? যা-তা হল এটা? পুরনো কাঠ, ভারি পোক্ত জিনিস। মুখুজ্যেদের আর কী–বড়লোক, যখন যা-খুশি ফেলে দিলেই হল। কিন্তু এ-দিয়ে যখন আমি একটা ফেসটো ক্লেস ইজিচেয়ার বানাব, তখন ওই কোট-পেন্টুল-পরা ছোট মুখুজ্যেও হাঁ করে থাকবে। বুঝবে, কী জিনিস তারা ফেলে দিয়েছে।
আমি অধৈর্য হয়ে বললুম, কিন্তু কাটলেট?
আঃ–কেটলেট কাটলেট করে তুমি যে খেপে গেলে পেলারাম–ঘোড়ামামা ঘর থেকে এবার কতগুলো ভাঙা ছাতার কালো কালো, কাপড়, রাস্তায় কুড়িয়ে-পাওয়া গিট-মারা কতটা টোয়াইন সুতো আর দুটো মরচে-পড়া চট-সেলাইয়ের ছুঁচ বের করে আনলেন এসো–আগে চেয়ারটাকে বেনিয়ে ফেলি। চেয়ার হয়ে গেলেই কেটলেট বুঝেছ?
বুঝেছি গোঁজ হয়ে জবাব দিলুম আমি। অর্থাৎ আমাকে আদর করে কাটলেট খাওয়াবেন, খামকাই খাওয়াবেন–এমন পাত্তর ঘোড়ামামা নন। তার আগে, এই নড়বড়ে একটা বিচ্ছিরি ফ্রেমে এইসব ফুটোফাটা ছাতার কাপড় সেলাই করে, তাঁকে ইজিচেয়ার বানিয়ে দিতে হবে! কাটলেট হল তারই পারিশ্রমিক।
ঘোড়ামামা বললেন, তোমায় বেশি কোষ্টো করতে হবে না। দুটো পেরেক ঠুকতে হবে, একটু সিলাই করতে হবে আমার সঙ্গে ব্যস
সেলাই? বিরক্ত হয়ে বললুম, আমি কোনওদিন সেলাই করেছি নাকি? আমি কি দর্জি?
আহা–চটো কেনো পেলারাম। তুমি দর্জি হবে কেনো? কিন্তু সব কাজ তো শিখতে হয়–যাকে বলে সেলেফ-হেলেপ!–এসো, লেগে যাও।
কী আর করা–জোড়া কাটলেটের আশায় আমি লেগে গেলুম। ঠিক কথা–বিনা খাটনিতে কে আর কাকে খেতে দেয়। মনে-মনে বললুম, প্যালারাম–জাগো, রাগো এবং লাগো। তারপরে নিজের শ্রমের অন্ন–অর্থাৎ কিনা কাটলেট-খুশি হয়ে খাও।
ছেঁড়া ছাতার কাপড় দুভাঁজ করে সেলাই করা–চারটিখানি কথা নাকি! তার ওপর আবার ঘোড়ামামার গজগজানি।
আঁ–উঃ, কী হচ্ছে! অমনি করে সিলাই করে নাকি? ও তো এক্ষুনি খুলে যাবে।
