ঘোড়ার পূর্বপুরুষ খুব সম্ভব রায়বেশে নাচত–আমি বলটুদাকে জানাতে চেষ্টা করলাম।
উত্তরে বলটুদা বললে, গ্যাঁ-গ্যাঁ-গ্যাঁ। হয়তো হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ।
–চ্যাঁহোঁ-চ্যাঁহো-হি-হি-হি ঘোড়াটা নাচতে লাগল। একবার সামনে আসে, একবার পিছিয়ে যায়। কখনও দুপা আকাশে তুলে হরি সংকর্তনের মতো নাচতে থাকে, মনে হয় এক্ষুনি গেয়ে উঠবে : লাগল হরির লুটের বাহার।
আবার তক্ষুনি সামনে পেছনে এমন করে দুলতে থাকে যে, যেন ও সাঁওতালী ঝুমুর দেখিয়ে দিচ্ছে।
প্রায় সাত-আট মিনিট নেচে ঘোড়াটা থামল। তারপর–তারপর সামনের দিকে গলা বাড়িয়ে দিয়ে হাসতে শুরু করে দিলে।
হাসিই বটে। দাঁত-টাত বের করে নাকের ফুটোর ভেতর থেকে ধোঁয়াধোঁয়া মতন কী সব ছড়িয়ে দিয়ে হাঁঃ হাঁঃ হাঁঃ হাঁঃ শব্দে অট্টহাসি শুরু করে দিলে! সে-হাসি যে কী চিজ তা বলে বোঝানো শক্ত।
পণ্ডিতমশাই সামনে থাকলে সন্ধি করে বলতেন : ঘোড়াট্টহাস্য!
পরক্ষণেই একটি লাফ। রামলাফ বললেও কম বলা হয়। দশরথ লাফ বললেও ঠিক বলা হয় কিনা কে জানে? মাটি থেকে প্রায় হাত দশেক ওপরে উঠে গেল।
আমি ভাবলাম বুঝি উড়েই গেল এবার। কিন্তু ঘোড়া উড়ল না, উড়ল বলটুদা। কিন্তু বলটুদার তো আর পাখা নেই, বেশি দূর যাবে কী করে? হাত-পনেরো উড়ে গিয়ে, নেহাত কপাল জোরেই বলতে হবে, একেবারে বিচালির গাদায় গিয়ে ধরাশায়ী– মানে গাদাশায়ী হলে। আর ঘোড়া? সেই একটি লাফেই বাড়ির চৌহদ্দি পার হল। আবার লাফ- আধ মাইল দূরে চলে গেল। আর-এক লাফ।
তারপরেই ঘোড়া দিগন্তে বিলীন হল। হয়তো আকাশেই উড়ে গেল। ঠিক বলতে পারব না।
আমি বলটুদার কাছে ছুটে গেলাম। তারপরে যেতে হল ডাক্তারের কাছে।
দুদিন পরে হাত-পায়ে প্লাস্টার বেঁধে বলটুদা উঠে বসল। আমি খবর নিতে গিয়েছিলাম। জিজ্ঞেস করলাম, চৈতকের বংশধরের কোনও সন্ধান পেলে বলটুদা?
–চৈতকের না ছাই। ব্যাটা পালিয়েছে না আপদ গেছে। বলটুদা নাক-মুখ কুঁচকে বললে, জানিস প্যালা, আসলে ওটা সিদ্ধিখোরের বংশধর।
সিদ্ধিখোর।
নয়তো কী? বাগানের বাইরে ওই যে ঝোপঝাড়গুলো চিবুচ্ছিল– ওগুলো কিসের গাছ জানিস? ভাঙের। আর ওই খেয়েই তো
বলটুদা থামল। একটা বুকভাঙা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল তার।
ঘোড়ামামার অবদান
সেদিন রাস্তায় বেরিয়েই আমার ঘোড়ামামার সঙ্গে দেখা হল। ঘোড়ামামা আসলে কারও মামা নন, তাঁর কোনও ভাগ্নে-টাগ্নেকে আমরা কোনওদিন দেখিনি; আর ঘোড়া তো তিনি নিশ্চয়ই নন, কারণ খুরওয়ালা চারটে পা তার নেই, তিনি কখনও চিহি চিহি করেও ডাকেন না। তবু সবাই তাঁকে সামনে মামা বলে, আড়ালে ঘোড়ামামা বলে ডাকে।
ঘোড়ামামা রাস্তা থেকে কী কুড়োচ্ছিলেন। সেটা কাঁধের একটা থলের মধ্যে ফেলে উঠে দাঁড়ালেন, তারপর আমাকে বললেন, এই যে পেলারাম, কী বেপার?
ঘোড়ামামার জিভে একটু গণ্ডগোল আছে। চ্যাঁচানো-কে বলেন চিঁচানো, হাতিকে বলেন হেতি, বিউটি-কে বলেন বেউটি। লোকটি যে খুব খারাপ তা নন, কিন্তু দুটো ব্যাপারে তাঁর একটু স্বাধীন মতামত আছে। এক নম্বর কখনও দাড়ি কামাবেন না আর চান করবেন না, কারণ দাড়ি নাকি মুখের বেউটি–ঝিমোন পাতায় ঢাকা গোলাপ ফুল। তাঁর মুখ গোলাপ ফুলের মতো কি না তা নিয়ে আলোচনা করে অবশ্য লাভ নেই কিন্তু একরাশ ঝন্ধু দাড়িতে তাঁকে যা দেখায় সে আর কী বলব। আর চান করলে? ঘোড়ামামা বলেন, একটা গামছা তিনদিন জলে ভিজিয়ে রাখলে কী হয়? পচে যায়। তিমনি রোজ চান করলে– ইত্যাদি ইত্যাদি। মোক্ষম যুক্তি সন্দেহ কী!
ঘোড়ামামার দুনম্বর কাজ হল, রোজ সকালে থলে কাঁধে রাস্তায় বেরিয়ে পড়া। শ্যামবাজারে শুরু করেন, এসপ্লানেড পর্যন্ত আসেন, কখনও কখনও ভবানীপুর পর্যন্ত এগিয়ে যান। উদ্দেশ্য আর কিছু নয়, রাস্তা থেকে এটা-ওটা কুড়োতে থাকেন। যেমন সিগারেটের খালি বাক্স, জুতোর সোল, টিনের চাকতি, আলপিন, পেরেক, ছেঁড়া দড়ি–আরও নানারকম।
আমরা জিজ্ঞাসা করি : ঘো–সরি, মামা, এসব করেন কেন? উত্তরে মামা বলেন, লোকে না বুঝে কত দরকারি জিনিস ফেলে দেয়। আমি কুড়িয়ে জমা করি। কখন কী কাজে লাগে কে জানে!
তাই বলে জুতোর সোল?
হেঁ-হেঁ-জুতোর সোল। আজ জুতোর সোল পেলাম, কাল খানিক চামড়া পাব, পরশু একটা ফিতে পাব, ঘরে অনেক পিরেক আছে, তাই দিয়ে ঠুকে লাগিয়ে নেব। ব্যস, বিনি পয়সায় জুতো হয়ে যাবে। বুঝলে না পেলারাম?
এ বোঝা আর শক্ত কী! কিন্তু এভাবে করে যে কে জোড়া সম্পূর্ণ জুতো তৈরি হবে, মানে ঘোড়ামামার সারা জীবনেও সেটা সম্ভব হবে কি না–এ-সব কথাও যে মনে আসে না তা নয়। ঘোড়ামামাকে অবশ্য তা বলা যাবে না, তর্ক তিনি একদম পছন্দ করে না।
তিনবার ক্লাস সেভেনে ফেল করেও খাওয়ার ভাবনা ঘোড়ামামার নেই। তাঁর বাবা খানতিনেক বাড়ি রেখে গেছেন শ্যামপুকুরে, তার ভাড়া থেকেই তাঁর চলে। কাজেই নিশ্চিন্তে কলকাতার রাস্তায় তিনি দরকারি জিনিস কুড়িয়ে বেড়ান আর বাড়িতে নিয়ে গিয়ে সেগুলি জমা করেন।
আজও ঘোড়ামামা পথে বেরিয়েছিলেন। আমাকে দেখে বিকট দাড়ির ভেতর থেকে, তাঁর সেই গোলাপ ফুলের মতো মুখে, একটা বত্রিশ ইঞ্চি হাসি ফুটে বেরুল।
কোথায় যাচ্ছ পেলারাম?
বললুম, আমার বন্ধু হাবুল সেনের ওখানে।
–হেঁঃ, হেবুল সেন! গিয়ে তো খালি আড্ডা দিবে।
