এবারে ব্যাপারটা আমার বাড়াবাড়ি মনে হল। বললাম, ধ্যাৎ-জামাকাপড় ধবধবে শাদা হবে কেন? ঘোড়া কি সাবান?
বলটুদা ভুরু কুঁচকে বললে, ওই তোর দোষ প্যালা,খালি গুরুজনের মুখে মুখে তক্কো করিস। বেশ একটা ফ্লো এসেছিল– গড়গড়িয়ে বলে যাচ্ছিলাম, দিলে বাগড়া দিয়ে। নে–ওঠ
–কোথায় উঠব?
ঘোড়ায়।
–আমি পারব না। ওসব আমার কাজ নয়।
-পারতেই হবে! বলটুদা চোখ পাকিয়ে বললে, না পারলে চলবে কেন শুনি? আমি দেড়শো টাকা দিয়ে ঘোড়া কিনেছি- শুধু বসে বসে ছোলা খাবে বলে?
–কিন্তু আমাকে কেন?–আমি কাতর হয়ে বললাম :–ও সব ঘোড়া-টোড়ার ব্যাপারে আমাকে টানা-হেঁচড়া করে তোমার লাভ কী? তোমার ইচ্ছে হয়–তুমি চড়ো, আমি চলি বলে সরে পড়বার জন্যে পা বাড়াচ্ছি, বলটুদা সঙ্গে সঙ্গে আমার হাত চেপে ধরল।
–পালাচ্ছিস কোথায়? আমি তো চড়বই–তোকেও চড়তে হবে।
–পড়ে যাব যে?
–পড়বি কেন? আমার কোমর ধরে বসে থাকবি।
-যদি তুমিও পড়ে যাও?–আমার তখনও বিশ্বাস হচ্ছিল না– যদি আমাকে নিয়ে ধপাস করে রাম-আছাড় খাও একটা?
তা হলে তুইও খাবি। এক যাত্রায় পৃথক ফল হবে নাকি? বলে বলটুদা আমায় হিড়হিড় করে টানতে টানতে নিয়ে গেল চৈতকের সেই বংশধর–মানে দেড়শো টাকা দামের সেই লাল ঘোড়াটার কাছে। সেটা তখন বাগানের বাইরে কী কতকগুলো ঝোপঝাড় চিবিয়ে খাচ্ছিল একমনে।
পা দিয়ে বলটুদা দিব্যি টকাৎ করে উঠে পড়ল। আমাকে বললে, ওঠ।
-কী করে উঠব?
হাত ধরে উঠে পড় আমার। বলে হাত বাড়িয়ে দিল বলটুদা। আমি বলটুদার হাত ধরতে গেছি, হঠাৎ কী মনে করে চৈতকের সেই বংশধর বোঁ করে এক পাক ঘুরে গেল। আর সঙ্গে সঙ্গেই আমি যেটা জাপটে ধরলাম, সেটা বলটুদার হাত নয় ঘোড়ার ল্যাজ।
চি-হি-হি-হেঁ হেঁ বলেই চৈতকসন্তান তিড়িং করে লাফিয়ে উঠল।
সরে যা, সরে যা–বলটুদা চেঁচিয়ে উঠল : চাঁট মেরে দেবে এক্ষুনি!
সরে যাব মানে? তার আগেই এক লাফে বারান্দায়।
কিন্তু লাফিয়ে উঠেই ঘোড়াটার যে কী হল কে জানে। তারপরেই সোজা বন বন করে ঘুরতে লাগল লাট্টুর মতো। সে-ঘূর্ণি আর থামে না।
ঘোড়ার ওপর থেকে বলটুদা হাঁউমাউ ডাক ছাড়ল : প্যালা!
বারান্দার ওপর নিরাপদে দাঁড়িয়ে আমি জবাব দিলাম, বলো।
–ঘোড়াটা যে থামছে না!
–থামবে কেন? ওর তেজ এসেছে যে! মহারানা প্রতাপের বংশধর কিনা!
–খালি পাঁইপাঁই করে পাক খাচ্ছে যে!
–তাই তো খাবে। পাঁই-পাঁই করে ঘুরবে বলেই তো ওর নাম ঘোড়া!
ইয়ার্কি রাখ প্যালা। বলটুদা তখন ঘোড়ার পিঠের উপর শুয়ে পড়ে দু’হাতে গলা জড়িয়ে ধরেছে : আমাকে ছিটকে ফেলে দেবে মনে হচ্ছে!
–তা হলে ছিটকে পড়েই যাও। আমি উপদেশ পাঠালাম।
ঠ্যাঙ ভেঙে যাবে যে। বলটুদার কাতর আর্তনাদ।
-দেড়শো টাকার ঘোড়া থেকে পড়ে কেবল ঠ্যাঙ ভাঙলেই চলবে কেন? মাথা না ভাঙলে কি তোমার প্রেসটিজ থাকবে? আমি জানিয়ে দিলাম। ঘোড়াটা সমানে বনবনিয়ে ঘুরেই চলেছে।
–ঘোড়া বোধ হয় লাট্টুর বংশধর রে প্যালা! বলটুদার ভগ্ন কণ্ঠ শোনা গেল।
–আমারও তাই মনে হচ্ছে। বলতে বলতেই দেখি ঘোড়াটা হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। একেবারে স্ট্যাচু, নট নড়নচড়ন টকাস মার্বেল!
আমি চেঁচিয়ে উঠলাম; বলটুদা, নেমে পড় শিগগির, এইটাই চান্স।
বলটুদা বোধ হয় নামতেও যাচ্ছিল, কিন্তু আর-একটা কাণ্ড হল তক্ষুনি। হঠাৎ ঘোড়াটা ভু-ভু খুরর-ঘুরর করে কেমন একটা বিটকেল আওয়াজ ছাড়লে। তারপরেই সামনের পা দুটো আকাশে তুলে দিয়ে মানুষের মতো সোজা হয়ে দাঁড়াতে চেষ্টা করল। ঘোড়ার পিঠের ওপর ঠিক একটা ব্যাগের মতো ঝুলতে লাগল বলটুদা।
-প্যালারে–গেলাম!
–যাচ্ছ বলেই মনে হচ্ছে! মানে ঘোড়াটা বোধহয় উড়তে চেষ্টা করছে। তোমাকে নিয়ে বোধহয় আকাশে পাড়ি দেবার মতলব আছে ওর। ঘোড়ার হালচাল দেখে আমার সেইরকম সন্দেহ হল।
বলটুদা তারস্বরে বললে, ওর পেটের দু’পাশটা কীরকম ফুলে উঠেছে, আর বুড়ৎ বুড়ৎ করে শব্দ হচ্ছে।
–খুব সম্ভব পাখা বেরুচ্ছে ওখান দিয়ে। ওটা বোধহয় পক্ষিরাজের বংশধর।
–তা হতে পারে। বলটুদার গলা দিয়ে কান্নার মত আওয়াজ বেরুল : কিন্তু আমার এখন আকাশে ওড়বার ইচ্ছে নেই। একদম না।
–মানে ঘোড়াটা যে ঘুড়ি হয়ে উড়ে যায় তা তুমি চাও না। কিন্তু তুমি না চাইলেই কি ও ছাড়বে? ওর যেরকম তেজ এসেছে।
আর তক্ষুনি ঘোড়াটা পেছনের পায়ে ভর দিয়ে লাফাতে আরম্ভ করল।
আমি চেঁচিয়ে উঠলাম : ক্যাঙারুর মতো লাফাচ্ছে যে!
বলটুদা গোঁ-গোঁ করছিল; কী বললে ঠিক বোঝা গেল না! কিন্তু আমার মনে হল ঘোড়া তা হলে নিশ্চয়ই ক্যাঙারুর বংশধর।
সার্কাসের খেল দেখানোর মতো টপাং টপাং করে হাত দশেক লাফিয়ে গেল ঘোড়া। তারপর বললে বিশ্বাস করবে না, নাচতে আরম্ভ করে দিলে।
ওঃ, সে কী নাচ! কখনও মনে হল রায়বেশে নাচছে, কখনও-বা উদয়শঙ্করকে একেবারে মেরে বেরিয়ে যাচ্ছে। কখনও চার-পা তুলে, কখনও দু-পা তুলে। সেই সঙ্গে চ্যাঁ-হ্যাঁ হ্যাঁ-হ্যাঁ-সে কী ঘোটকীয় রাগিণী। অমন নাচ-গান আমি জীবনে কোনওদিন। দেখিনি। আর ঘোড়ার পিঠের ওপর ঝুলন্ত বলটুদাকে নাচতে হচ্ছে সেইসঙ্গে।
ডাকলুম–বলটুদা!
বলটুদা সাড়া দিলে না; বোধহয় নাচের তালে মেতে উঠেছে। শুধু ওর গলা দিয়ে আওয়াজ বেরুল-গ্যাঁ-গ্যাঁ-গ্যাঁ। ঘোড়াটার সঙ্গে গানের কোরাস ধরেছে মনে হল।
