কিছুক্ষণ পরে আবার নিশ্বাস ফেলল কালাচাঁদ।
তুমি আমার দেশের মানুষ ঠাকুরমশাই, মরণের আগে তোমার চরণে নিবেদন আছে একটা।
মথুরার কষ্ট হল।
মরবে কেন হে? অনেকক্ষণ তো কাটালে। আর ঘণ্টা তিনেকের বেশি রাত্তির নেই। এর মধ্যে যদি কোনো জাহাজ এসে পড়ে তো ভালোই, নইলে দিনের বেলা যে করে হোক উপায় একটা হবেই। ভগবান আছেন।
আমার জন্যে নেই। কালাচাঁদ হাসতে চেষ্টা করল, তা ছাড়া তিন ঘণ্টা আর পারছিনে ঠাকুরমশাই, আমার হয়ে এসেছে। আমার ন-দশ বছরের একটা ছেলে আছে সংসারে, সে পড়ে আছে রতনগঞ্জে তার এক পিসির বাড়িতে। তুমি সেই পিসিকে এই গেজেটা দিয়ে, খান কয়েক মোহর আছে এতে। এ নিয়ে যেন আমার ছেলের নামে জমি কিনে রাখে। বড়ো হলে যেন আমার ছেলে চাষি হয়ে নিজের রোজগারের ফসল খেতে পারে। তা ছাড়া আরও বোলো, উত্তরের পোঁতায় দু-ঘটি…
হাত নামিয়ে গেজেটা তুলে নিলে মথুরা।
উত্তরের পোঁতায় দু-ঘটি…
কিন্তু আর বলতে পারল না কালাচাঁদ। এক হাতে গেজেটা বাড়িয়ে দিতে গিয়ে দুর্বল বাঁ হাতখানা কালাচাঁদের পিছলে গেল নারকেল গাছের গা থেকে। তারপরেই ছলাৎ করে শব্দ হল—যেন বড় একটা রুই মাছ উলাস দিয়ে উঠল জলের ওপর।
তাকিয়ে রইল মথুরা ঘোষাল। দেখল পদ্মার সেই দুরন্ত ঘূর্ণির টানে কালাচাঁদের ঝাঁকড়া মাথাটা ডুবতে ডুবতে ভেসে উঠল এক বার।
যমুনা ঠিকই বলেছিল ঠাকুরমশাই। মাথাটা ডুবে আবার ভেসে উঠল। মা নয়, রাক্ষুসি; রক্ত খায়।
সেই শেষ কথা। জলে বুদবুদ মিলিয়ে গেল। আর যাওয়ার আগে সমস্ত বিশ্বাস এমন একজনের হাতে দিয়ে গেল—একটু আগে চোখ বুজে যাকে সে খুন করতে পারত।
সকালের আলো জাগল। জেগে উঠল পদ্মা, যে মা, যে খিদের ফসল দেয়, পিপাসার জল দেয়। যে-পদ্মায় রঙিলা নাও ভাসিয়ে ভিনদেশিয়া বন্ধু দেশে ফিরে আসে। যে-পদ্মার জলে কালাচাঁদের ছেলে ডিঙি বেয়ে ধান বেচতে যাবে লক্ষীপুরার বাজারে।
একটা চলতি স্টিমার এসে নারকেল গাছের মাথা থেকে যখন অজ্ঞান অচৈতন্য মথুরা ঘোষালকে উদ্ধার করল, তখন তার হাতের মুঠোয় গেজেটা বজ্রশক্তিতে ধরা।
ঘোড়া-টোড়ার ব্যাপার
বলটুদা বললে, এই যে ঘোড়াটা দেখছিস, এর পূর্বপুরুষ কে– জানিস?
অন্য একটা ঘোড়া নিশ্চয়–আমি জবাব দিলাম।
বলটুদা বললে, তোর মুণ্ডু!
তবে কি ওর পূর্বপুরুষ হাতি? নাকি গণ্ডার? না বাঘ?
কিন্তু বাঘ বলে আমার নিজেরই খটকা লাগল : উঁহু, বাঘ জেব্রার পূর্বপুরুষ– জেব্রার গায়েই তো বাঘের মতো ডোরা আঁকা আছে।
আমি জানতে চাই প্যালা, তুই তোর গবেষণা বন্ধ কবি কিনা?
বলটুদা চটে উঠল : যা মনে আসছে তাই যে বলে যাচ্ছিস। আমি তোকে ঘোড়ার কথা জিজ্ঞেস করছিলুম–জেব্রা নিয়ে কে তোকে মাথা ঘামাতে বলেছে?
আমি কান-টান চুলকে বললাম, কী জানো বলটুদা, ঘোড়া-টোড়ার কথা ভাবলেই আমার সব কেমন গোলমাল হয়ে যায়। ঘোড়া থেকে মনে পড়ে ঘোড়ার ডিমকে ঘোড়ার ডিম থেকে মনে পড়ে ডিমের ডালনাকে, তা থেকে মনে পড়ে ফুলকো লুচিকে।
উঃ, এ যে বকবক করে কানের পোকা বের করে দিলে। তোদের মতো পেটুকের সঙ্গে কথা কওয়াই ঝকমারি বলটুদা হাল ছেড়ে দিলে।
আর সঙ্গে সঙ্গেই বলটুদার ঘোড়াটা চিহিহি করে ডেকে উঠল। ঠিক মনে হল, আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ঠাট্টার ভঙ্গিতে হি হি করে হাসছে। আচ্ছা বেয়াদব ঘোড়া তো।
বলটুদা বললে, দেখলি তো প্যালা– কেমন সমঝদার ঘোড়া? তোর ক্যাবলামি দেখে কেমন তোকে ভেংচে দিলে। তাই তো বলছিলুম- এর পূর্বপুরুষ হল চৈতক।
চৈতন?–আমি আশ্চর্য হয়ে বললুম, চৈতন তো হল বড়মামার বুড়ো চাকর। সে তো ধানবাদে থাকে, আর সন্ধে হলেই মামা হো–মামা হো, বলে গান গায়।
শুনে বলটুদা কটাং করে আমার মাথায় একটা গাঁট্টা মারলে। বললে, তুই একটা ছাগল। মামা হো নয় রে বেকুব, ওটা রামা হো। আর চৈতন নয়-চৈতক। তোর বড়মামার চাকর নয়–রানা প্রতাপ সিংহের ঘোড়া।
প্রতাপ সিঙ্গী,–ওহো, বুঝতে পেরেছি। আমি ঘাড় নেড়ে বললাম, ছোটকাকার বন্ধু। রেলে চাকরি করে। আমাকে একবার কেলনারের হোটেলে কাটলেট খাইয়েছিল।
কটাং করে আর একটা গাট্টা পড়ল আমার চাঁদির ওপর। বলটুদা তিনটে পোকা-খাওয়া দাঁত খিঁচিয়ে বললে, এঃ– এটার কেবল খাই-খাই। প্রতাপ সিঙ্গি নয় রে উজবুক রানা প্রতাপ সিং। চিতোরের মহারানা। ইতিহাস-টিতিহাস পড়িসনি?
বললাম, পড়ব না কেন? ওই তো–যাতে মহম্মদ ঘোরীর গল্প আছে। পরীক্ষায় প্রশ্ন এসেছিল, ঘোরী নাম হইল কেন? আমি লিখেছিলুম, তাঁহার একটি ঘড়ির দোকান ছিল বলিয়া। ইতিহাসের মাস্টার কেশববাবু সেইটে পড়ে আমাকে হাফডাউন করিয়ে দিয়েছিলেন। বলটুদা বললে ইসস–এটা যে জ্বালিয়ে খেলে। ইতিহাস-ভূগোল সব দেখছি পালাজ্বরের পিলে হয়ে এর পেটের মধ্যে সেঁধিয়ে বসে আছে। ওই পিলেটায় একটু ঝাঁকুনি দেওয়া দরকার। এই প্যালা, ঘোড়ার চড়বি?
–অ্যাঁ।
বলি, ঘোড়ায় চড়বি?–বলটুদা আমায় উৎসাহ দিতে লাগল : ঘোড়ায় চড়লে কী কী উপকার হয় তা জানিস? শরীর শক্ত হয়–পালা জ্বর পালাতে পথ পায় না, পিলে ভ্যানিশ করে, রাত্তিরে নাক ডাকে না, চুল ওঠা বন্ধ থাকে, মস্তিষ্ক স্নিগ্ধ হয়– বিজ্ঞাপন যা-কিছু লেখা আছে সব পর পর আওড়াতে লাগল বলটুদা : দাঁতের মাড়ি শক্ত হয়, কাটা ছেঁড়া সত্বর শুকাইয়া যায়–মুখের ত্বক কোমল ও লাবণ্যযুক্ত হয়–জামাকাপড় ধবধবে শাদা হয়–
