আশ্চর্য! কান্নায় ভরা লোকটার গলা। একটা নিষ্ঠুর ভয়ংকর ডাকাত কোথাও নেই— নিতান্তই সাধারণ মানুষ। মরণের সামনে দাঁড়িয়ে বুকের ভেতর থেকে তার হাহাকার উঠছে।
মথুরা শুনতে লাগল।
ছেলেটাকে মানুষ করতে চেয়েছিলুম চাষি গেরস্থর মতো লাঙল ঠেলে, মাটি কুপিয়ে। বউয়ের শেষ মিনতি। পারলুম না। কিছুদিন পরেই আবার ওরা আমায় টানতে লাগল। বললে, চল কালাচাঁদ চল। আবার ধরিয়ে দিলে ডাকাতির নেশা। ছেলের কথা ভাবলুম না, বউয়ের শেষ কথা ভুলে গেলুম। কিন্তু এবার দারোগা দল-কে-দল ধরে নিয়ে গেল। তিন বছর ফাটক খেটে এলুম।
তারপরেও আবার বেরিয়েছিলে ডাকাতি করতে?
ও যে রক্তের টান বাবু, ওখানেও যে সর্বনাশা বড়ো পাকের টান। নদীর ওপর কালো হয়ে রাত নামলে, পদ্মার জল খাঁড়া দুলিয়ে ডাক পাঠালে, হু-হু করে হাওয়ার তুফান বইলে তখন যে আর কিছুতেই ঘরে থাকা যায় না। অনেক চেষ্টা করেছি, দড়ি দিয়ে নিজেকে বেঁধে রেখেছি, তারপর নিজেই দড়ি কেটে পালিয়ে গেছি। এতদিনে সব মিটল। শুধু ছেলেটাকে যদি…
কালাচাঁদ থামল। পদ্মা গর্জন করে চলল একটানা। ঘুমের ঘোরে কোন দূরের বাসা থেকে ভুলে বেরিয়ে এসে একটা গাংচিল কেঁদে চলে গেল।
জল থেকে ওপরে উঠে যাওয়ার চেষ্টা করল কালাচাঁদ, কিন্তু বসবার জায়গা কোথাও নেই। বৃষ্টিবাদলায় শ্যাওলা পড়ে পড়ে গাছটা পেছল হয়ে আছে, বার বার হাত ফসকে যেতে চায়। আবার ভালো জায়গাটি মথুরা দখল করে বসে আছে, এক বার হতাশভাবে কালাচাঁদ সেদিকে তাকিয়ে দেখল। তার পা দুখানা তখনও জলের ভেতর, বড়ো পাকের টান হিংস্রভাবে সে-দুখানাকে যেন শরীর থেকে ছিঁড়ে নিতে চাইছে। হাতের মুঠা একটু আলগা হলেই সঙ্গে সঙ্গে টেনে নেবে নিজের ঘুরন্ত রাক্ষসগর্ভের মাঝখানে।
কালাচাঁদ আবার বললে, তোমার বাড়ি তো কুমারহাটি না?
হুঁ।
আমার হল মাদারঘাটা। একই দেশের মানুষ তাহলে।
সে তো বটেই। একটু খোঁচা দেওয়ার লোভটা সামলাতে পারল না, না হলে আর সর্বনাশ করতে আসবে কেন আমার?
জ্যোৎস্না আর একটু উজ্জ্বল হলে দেখা যেত কালাচাঁদের কালো মুখ লজ্জায় আরও কালো হয়ে উঠেছে।
আর লজ্জা দিয়ো না ও-কথা বলে, শাস্তি তো আমার শুরু হয়েছে। নামটা কী?
মথুরা নাম জানাল।
ঘোষাল? ব্রাহ্মণ? কালাচাঁদ জিভ কাটল, ব্রহ্মস্ব লুট করতে গিয়েছিলুম! হবেই তো, হবেই তো। নিজে নিজেই এক বার মাথা নাড়ল, এমনিই হয়।
আর কখনো ব্রহ্মস্ব লুট করনি বোধ হয়?
না জেনে ক-বার করেছি বলতে পারিনে, কিন্তু জানিতে এক বার। কালাচাঁদ থামল। চক্রবর্তীর কবন্ধ থেকে একরাশ রক্ত যেন ফিনকি দিয়ে চোখে-মুখে ছিটকে পড়ল তার। একটু চুপ করে থেকেই বললে, দন্ড হাতে হাতেই পেয়েছিলুম। ঘরে ফিরে দেখি বউটা মরে কাঠ হয়ে আছে। কলেরা।
আবার চুপ। পদ্মার গর্জন, ঘূর্ণির একটা ক্রুদ্ধ আহ্বান। কালো আকাশ আর কালো জল, দুয়ের মাঝখানে খানিকটা কাকজ্যোৎস্না জ্বলছে কুয়াশার একটা পর্দার মতো। পাখার শব্দ বাজিয়ে উড়ে চলেছে গোটা কয়েক বাদুড়, মরা জ্যোৎস্নায় তাদের ছায়া ওদের ওপর দিয়ে ভেসে গেল। নীচে জলের অবিশ্রান্ত গতি, সময়ের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন কলরোল ছুটেছে দ্বৈতসংগীতে। কাল যেমন করে সব ভেঙে এগিয়ে যায়, ঠিক সেই একই নিয়মে ছুটেছে কীর্তিনাশা পদ্মা। দুই কূলে তার ভাঙনের ডমরু বাজছে।
মানুষের দেহ-মন দুই-ই আশ্চর্য! সব অবস্থার সঙ্গেই যেমন করে হোক মানিয়ে নিতে পারে। তাই এর মধ্যেও মথুরার চেতনা অসাড় হয়ে আসছিল। চট করে ঘোর ভেঙে গেল। সত্যি সত্যিই ঝিমুচ্ছে নাকি সে! এক বার হাত খুলে পড়ে গেলেই আর দেখতে হবে না, একটা টানেই পদ্মা একেবারে পনেরো-ষোলো হাত দূরে নিয়ে চলে যাবে। তখন আর ফিরে আসা মানুষ কেন–দৈত্যের পক্ষেও সম্ভব নয়।
চোখ মেলে মথুরা চেয়ে দেখল। তেমনি জলের ভিতর বারো আনা শরীরটাকে ডুবিয়ে প্রাণপণে গাছটাকে আঁকড়ে আছে কালাচাঁদ। চাঁদ আরও খানিকটা উঠে এসেছে, প্রায় মাথার ওপর। সেই আলোয় মথুরা আরও স্পষ্ট করে দেখতে পেল তাকে। ক্লান্তি, যন্ত্রণা আর ভয় সমস্ত মুখের ওপর থমকে আছে তার বেঁচে থেকেও যেন নরকবাস করছে।
কেমন আছ হে কালাচাঁদ?
ভালো নেই ঠাকুরমশাই। ক্লিষ্ট গলায় জবাব এল, জলে পড়বার আগেই পাঁজরাতে একটা চোট পেয়েছিলাম। ভিজে ভিজে আর জোর পাচ্ছিনে গায়ে। বেশিক্ষণ যে ধরে থাকতে পারব, সে-ভরসা আর নেই।
ওপরে উঠতে পারবে? ওপরে দুজনের জায়গা হওয়ার কথা নয়, কিন্তু এই চরম বিপদে পরমশত্রুকে মথুরা ডাক না দিয়ে থাকতে পারল না। লোকটার জন্যে এখন তার কষ্ট হচ্ছে।
কিন্তু কালাচাঁদের মনও বদলে গেছে এখন।
না ঠাকুরমশাই, দুজনের জায়গা হবে না ওখানে। তা ছাড়া শরীরেও এমন বল নেই যে। এতটুকু উঠে আসতে পারি। হাত-পা আমার অসাড় হয়ে যাচ্ছে।
তাহলে?
আর উপায় নেই ঠাকুর, মরণ আমার ঘনিয়ে এসেছে। তার আগে…
বার-বার-বারাং–
একটা ভয়ংকর শব্দ চারদিক কাঁপিয়ে জেগে উঠল, কোথায় যেন তোলপাড় হয়ে উঠল জল। পদ্মা ভাঙছে, ভেঙে চলেছে— মানুষের নীড়, পৃথিবীর মাটি। কোথায় যেন মস্ত একটা ভাঙন নামল কাছাকাছিই।
দুজনেই কান পেতে কিছুক্ষণ ধরে শুনল শব্দটা। আবার পাড়ি ভাঙল। হয়তো কারও ঘর গেল, কারও জমি গেল, কারও সর্বস্ব হারিয়ে গেল ওর সঙ্গে।
