লুটের মাল যেমন ছিল তেমনিই পড়ে রইল। সড়কি, বল্লম, রামদা ফেলে দিয়ে দু-দলই দাঁড় টানতে লাগল পাগলের মতো। ছিঁড়ে যেতে লাগল হাতের পেশি, ফেটে যেতে লাগল। হৃৎপিন্ড। কিন্তু প্রকৃতির এই অসম্ভব শক্তির কাছে মানুষের সমস্ত চেষ্টা হার মানল। এক-পা এগিয়ে তিন-পা পিছিয়ে এল নৌকা। উজানের বাতাসটুকুও পড়ে গেছে, পালের কাছ থেকে কোনো সাহায্যের আশা নেই।
নৌকা আর বাঁচবে না।
এবার ঝুপঝাপ করে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল সবাই। নৌকার যা হওয়ার হোক, কোনোমতে বাহুবলে যদি আত্মরক্ষা করা যায়, যদি চড়া কিংবা অন্য কিছুর আকস্মিক আশ্রয় জুটে যায়। নৌকা দুখানা উল্কার গতিতে ছুটে চলে গেল সেই অনিবার্য মৃত্যুচক্রের দিকেই।
৫.
জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল বটে, কিন্তু স্রোতের টানে কে যে কোন দিকে বুদবুদের মতো নিশ্চিহ্ন হল তার আর সন্ধানই মিলল না। সে-আকর্ষণে মথুরা ঘোষালও কুটোর মতো ঘূর্ণির রাক্ষসগর্ভের দিকে ভেসে চলল। আগেই প্রায় মরে গিয়েছিল সে, এখন আচ্ছন্ন চেতনার ভেতর তার মনে হতে লাগল পেছন থেকে মরণের দূতেরা লক্ষ লক্ষ ঠাণ্ডা হাতে তাকে পাতালের অন্ধকারে ঠেলে নিয়ে চলেছে, একবিন্দু করুণা নেই তাদের। জলের গর্জন ক্রমশ একটা ক্রুদ্ধ জন্তুর আক্রোশধ্বনির মতো বেড়ে উঠছে, পাকটা আর কত দূরে?
সেই সময় হটাৎ জলের ভেতরে কীসে পা আটকাল মথুরার। কী যেন একটা জিনিস স্থির হয়ে আছে এই ভয়ংকর স্রোতের ভেতরেও। দু-হাতে সেটাকে প্রাণপণে আঁকড়ে ধরল মথুরা, টের পেল পাড়-ভেঙেপড়া একটা নারকেল গাছের আশ্রয় পেয়েছে সে। পাড় কবে ভেঙেছে, পদ্মাতীরের সীমানা কত দূর সরিয়ে দিয়েছে ঠিক নেই, তবু অল্প গভীর এখানকার জলে ঘূর্ণির প্রবল টানকে উপেক্ষা করেও মাত্র মাথাটুকু জাগিয়ে এখনও দাঁড়িয়ে আছে নারকেল গাছটা।
পিঠের ওপর দিয়ে একটানা স্রোত। আশ্রয় পেয়েও অস্বস্তি বোধ করছিল মথুরা। নিশ্চিত মরণের ভেতর বাঁচার এতটুকু আশা মনকে চাঙ্গা করে তুলল অনেকখানি। শরীর ক্রমশ অচল হয়ে আসছে, গায়ে যে প্রচুর শক্তি অবশিষ্ট আছে তাও নয়। আর একটু দুর্বল হয়ে পড়লে নিঃসন্দেহে আত্মসমর্পণ করতে হবে নদীর করুণার সামনে।
অবশিষ্ট শক্তিটুকু কোনোমতে গুছিয়ে নিয়ে মথুরা বহুকষ্টে নারকেল গাছটার আগায় এসে পৌঁছুল। জল থেকে মাথাটা হাত তিনেক মাত্র উপরে। কিন্তু মাথা বলতে কিছুই এখন আর অবশিষ্ট নেই। কালক্রমে শুকিয়ে শুকিয়ে তারা পদ্মার জলে ঝরে পড়েছে। শুধু দু-একটা শুকনো ডাঁটা ন্যাড়া মাথার ওপর কাঁটার মুকুটের মতো দাঁড়িয়ে আছে।
নক্ষত্র-ছাওয়া আকাশে এতক্ষণ কেবল অন্ধকারের উৎসব চলছিল। কিন্তু এতক্ষণে সেটা ফিকে হয়ে এল। ভাঙা ভাঙা হয়ে টুকরো মেঘের ওপার থেকে চাঁদ উঠল এতক্ষণে। খন্ড চাঁদ, নিষ্প্রভ আলো, তবু সেই ম্লান করুণ আলোয় পদ্মার এই নিশীথ রূপটাকে আরও রহস্যময়, আরও ভয়ংকর মনে হতে লাগল। নারকেল গাছটা থরথর করে উঠছে স্রোতের বেগে, দীর্ঘকাল এই টান সয়ে জলের ভেতর ডুবে থেকে তার দাঁড়াবার শক্তিও কমে আসছে। ক্রমশ তিল তিল করে ক্ষয় হচ্ছে তার তলার মাটি, যেকোনো সময়ে উপড়ে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু এত কথা ভাববার সময় মথুরার ছিল না। শেষ অবলম্বনটুকু দু-হাতে জড়িয়ে ধরে সে অজ্ঞানের মতো পড়ে রইল। তার চারদিকে মুখের শিকার ছেড়ে যাওয়া কালনাগিনি আক্রোশে গর্জে চলল।
বোধ হয় পাঁচ মিনিটও নয়, হঠাৎ সে টের পেল নারকেল গাছটায় জোরালো ঝাঁকুনি লেগেছে একটা। চমকে তাকিয়ে দেখল স্রোতে ভাসতে ভাসতে এসে আর একটি মানুষও তারই মতো এই গাছটাকে আঁকড়ে ধরেছে। লোকটার সারা শরীর জলের মধ্যে, ঝাঁকড়া চুলওয়ালা মাথা আর দুখানি হাত মাত্র ভেসে আছে জলের ওপর।
এক বারের জন্য শিউরে উঠে পরক্ষণেই হাসি ফুটে উঠল মথুরার মুখে। একেই বলে বিধাতার ঠাট্টা। রামদা মাথার ওপর ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে এই লোকটাই-না এতক্ষণ শাসাচ্ছিল তাদের। এতক্ষণ জলে ভিজলেও তাকে চিনতে কষ্ট হয় না। তার ঝাঁকরা বাবরি আর বুনো মোষের মতো শরীরটা এক বার দেখলে আর ভোলবার নয়। কয়েক মিনিটের মধ্যেই লোকটার এত পরাক্রম চুপসে এতটুকু হয়ে গেছে। ইচ্ছের বিরুদ্ধেও মথুরা শব্দ করে হেসে উঠল।
লোকটা চমকাল-দারুণভাবে চমকাল। যেন মাথার ওপর কালো পদ্মার প্রেতাত্মার হাসি শুনেছে সে। আতঙ্কে বিষণ্ণ চোখ মেলে তাকিয়ে দেখল, চাঁদের আলোয় চিনতেও পারল মথুরাকে।
ওঃ, তুমি!
সমস্ত ভয় আর ভাবনার একেবারে শেষ ধাপে পৌঁছেছে মথুরা। এখন আর ঘাবড়াবার মতো কিছু নেই। লোকটার দশা দেখে ভারি কৌতুক বোধ হল তার।
ঠাট্টা করে মথুরা বললে, তোমাদেরই দয়ায় এখানে আসতে হল বাবা। কিন্তু যাত্রাটা দেখছি তোমাদেরও শুভ হয়নি।
নাঃ! একটু চুপ করে থেকে লোকটা বড়ো রকমের নিশ্বাস ফেলল। পদ্মার হাওয়ায় আর কলধ্বনিতে নিশ্বাসের আওয়াজটা মথুরা শুনতে পেল না। লোকটা আবার বললে, ছ-মাস আগেও জেল খেটে বেরিয়েছি, দু-বছর, কিন্তু এমন বিপদে আর কখনো পড়িনি।
মথুরা চুপ করে রইল।
লোকটা বলে চলল, কাল পূর্ণ হয়েছিল আর কী। ধর্মের ঢাক হাওয়ায় বাজে কিনা? বউটা বলত, এত পাপ ধর্মে সইবে না, এমন কাজ কোরোনি। আমি তার কথা শুনিনি। মরণ তাকে টেনে নিলে। দু-তিন বছর ভালো হয়ে থাকলুম, তারপর আবার মানুষ মারার জন্যে পদ্মা ডাক পাঠাল। মায়ের কাছে অনেক বলি দিয়েছি, এবার আমাকেই বলি নেবে।
