এর মধ্যেই অন্ধকারে নৌকাটা অনেকখানি এগিয়ে এসেছে। বারো-চৌদ্দোটি কালো কালো মাথা। বারো-চৌদ্দোটি হাতের দাঁড়ে জলের ওপর দিয়ে ছুটে আসছে বাইচের নৌকার মতো। ছিপ-নৌকা। এত রাত্রে এই সময় কোন বাইচ খেলায় তারা বেরিয়ে পড়েছে সেটা বুঝতে কারও আর এক মিনিটও সময় লাগল না। মথুরা ঘোষাল গেঞ্জির তলায় কাঁপা আঙুল ঢুকিয়ে পৈতে খুঁজতে লাগল, কিন্তু সময় বুঝে পৈতের সন্ধান পাওয়া গেল না।
ছিপ-নৌকা প্রায় ঘাড়ের ওপর এসে পড়েছে। ইয়াকুব অনর্থক জেনেও হাঁক ছাড়ল, এই নাও সামলে, আপন ডাইন…
আপন ডাইনে নৌকা সামলাবার কোনো গরজ দেখা গেল না তাদের। তার বদলে বেশ মোলায়েম গলায় কে যেন জানতে চাইল, নৌকা কোথায় যাবে হে?
কুমারহাটি।
কুমারহাটি? বেশ বেশ। তা একটু তামাক খাওয়াও-না মিয়াভাই, গলা শুকিয়ে গেছে।
দু-চোখ বুজে বসে রইল মথুরা ঘোষাল, কানের মধ্যে তার ঝিঝি ডাকছে। সব নিয়মমাফিক চলছে, এমনিভাবেই ওরা এসে আলাপ জমায়।
মকবুল গলা চড়িয়ে বললে, না, তামাক আমাদের নেই।
ও-নৌকা থেকে হাসির আওয়াজ এল। মিষ্টি খিলখিল হাসি।
আছে শেখের পো, আছে! কেন আর মিছে কথা বাড়াচ্ছ বলো দেখি! ভালো মানুষের মতো হুঁকোটা বাড়িয়ে দাও, এক ছিলিম টেনে নিয়ে চলে যাই।
মকবুল বোধ হয় একটা অসম্ভব আশায় হুঁকোই খুঁজতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই খটখটাং করে ছিপ এসে নৌকার গায়ে ভিড়ে গেল। টলমল করে দুলে উঠল নৌকা।
ইয়াকুব চেঁচিয়ে উঠল, গায়ে এসে পড়লে যে, তফাত যাও তফাত যাও!
থামো হে সুমুন্দি, আস্তে। ভালো কথায় কান দেওয়ার পাত্তর তো নও, তাই বাঁকা আঙুলেই ঘি ওঠাতে হবে। আচ্ছা, তামাক তোমাদের আর দিতে হবে না, আমরাই খুঁজে নিচ্ছি।
কথাটা বলেই তারা আর সময় দিলে না। চোখের পলকে তিন-চার জন লোক প্রায় একসঙ্গেই এই নৌকার ঝাঁপ দিয়ে পড়ল। একদিকে কাত হয়ে নৌকাটা সোজা হয়ে উঠতে না-উঠতেই দেখা গেল একখানা বিরাট রামদার উজ্জ্বল চেহারা তিন-চারখানা সড়কির ক্ষুধার্ত ফলক। অন্ধকার পদ্মার অতল থেকে একদল প্রেত এসে যেন তাদের সামনে দাঁড়াল।
রামদা যার হাতে ছিল, কালভৈরবের মতো তার চেহারা। মাথার বিরাট বাবরি নাচিয়ে রামদাখানাকে বার কয়েক শূন্যে ভেঁজে নিয়ে সে মথুরাকে বললে, তাড়াতাড়ি বের করে দাও সব। একটু শোরগোল তুলেছ কী ধড় থেকে মাথা তফাত করে দেব!
মথুরা অস্পষ্টভাবে কী-একটা হাউমাউ করে বলবার চেষ্টা করছিল। কিন্তু সেই মুহূর্তেই বুঝতে পারলে, ঠিক তার হৃৎপিন্ডের ওপরটিতে বুকের চামড়ায় পিনের মতো খোঁচার একটুখানি মৃদুযন্ত্রণা। সড়কির একটা ধারালো ফলা অত্যন্ত পরিষ্কার অর্থ নিয়ে জায়গাটি স্পর্শ করে আছে।
চুপ। নইলে এখুনি এফোঁড়-ওফোঁড় করে ফেলব।
মথুরা যেমন ছিল তেমনি বসে রইল। একটা নিশ্বাস পর্যন্ত শব্দ করে ফেলবার মতো সাহস তার নেই।
লুট শুরু হয়ে গেল। বাক্স-বিছানা থেকে শুরু করে জার্মান সিলভারের পান খাওয়ার ছোটো কৌটোটি পর্যন্ত বাদ পড়ল না। স্পর্শ করল না কেবল মাঝিদের ছেঁড়াখোঁড়া বিছানা, গোটা দুই লোহার কড়াই আর তিন-চারখানা কলাই-করা এনামেলের থালা।
সমস্ত চেষ্টা-ভাবনা ছেড়ে দিয়ে মাঝিরা গলুইয়ের উপর নিশ্ৰুপ হয়ে বসে ছিল। যেন নিতান্তই দর্শকের দল, যেন কিছুই তাদের করবার নেই। হঠাৎ যেন মকবুলের জ্ঞান ফিরে এল। চমকে জিজ্ঞেস করল, এমন করে নৌকা ছুটেছে কেন ইয়াকুব চাচা? জলের এমন টান কেন?
টান!
সঙ্গে সঙ্গে খেয়াল হল সকলের। সত্যিই তো! দুরন্ত একটা স্রোতের টানে দুখানা নৌকাই যেন ঝড়ের পালে ছুটে চলেছে। এ স্বাভাবিক টান নয়, পদ্মার স্রোতের চাইতে অনেক প্রখর, অনেক দুরন্ত এর শক্তি।
মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেল সব। শিকার আর শিকারি দু-দলের মধ্যেই একসঙ্গে হাহাকার উঠল একটা। রামদা হাতে করে যে এতক্ষণ সকলকে শাসাচ্ছিল, তৎক্ষণাৎ তার হাতখানা ঝুলে পড়ল দুর্বলভাবে। ভয়-জড়ানো গলায় সে বলল, বড়ো পাকের টান!
বড়ো পাকের টান! পদ্মার এই অঞ্চলে সে-পাকের খ্যাতি কে না জানে! চুম্বক যেমন অনিবার্য আকর্ষণে লোহাকে টেনে আনে, তেমনি এই বড়ো পাকের টানও বহুদূর থেকে নৌকা বা যা-কিছু পায় সকলের অজ্ঞাতে বুভুক্ষু জলচক্রের ভেতর সেগুলিকে গ্রাস করতে নিয়ে আসে। সাপের চোখের মতো তার আকর্ষণ-প্রভাব। হুশিয়ার মাঝিরা দূর থেকে সে প্রভাব অনুভব করে প্রাণ বাঁচায়। যারা পারে না, সেই অনিবার্য নিষ্ঠুর আকর্ষণে মোহমুগ্ধের মতো ছুটে আসে। বিশাল ঘূর্ণি প্রচন্ড কয়েকটি আবর্তে বার কয়েক তাদের ঘুরিয়ে সোঁ করে অতলগর্ভে তলিয়ে নেয়, জলের উপর কোনোখানে এতটুকু চিহ্ন রেখে যায় না। তারপর হয়তো তিন মাইল দূরের বাঁকের মুখে কয়েকটা দেহ বা একখানা উবুড়-করা নৌকা ভেসে ওঠে। এ নিয়তির টান, এর হাত থেকে পরিত্রাণ নেই। এই পাকের টানে এক বার পড়লে কোনো মাঝির সাধ্য নেই যে নৌকা কিংবা প্রাণ বাঁচিয়ে আসতে পারে।
ডাকাতির উত্তেজনায় হোক কিংবা অসাবধানেই হোক—কোন অশুভক্ষণে যে নৌকা পাকের টানের মধ্যে এসে পড়েছে কেউ তা বুঝতে পারেনি। যখন পারল তখন আর সময় ছিল না। নৌকার গায়ে ঘা দিয়ে দিয়ে পদ্মার জল বাজতে লাগল খানিকটা ক্রুর কুৎসিত হাসির মতো।
