চক্রবর্তীর রক্ত দেখে যেমন হয়েছিল, তেমনি আর এক বার মাথাটা ঘুরে গেল কালাচাঁদের। একদিনে দু-বার। অন্ধের মতো বসে পড়ল সেই দুর্গন্ধ ময়লাগুলোর ওপর। ঘরের ভেতর ককিয়ে ককিয়ে কেঁদে উঠল ছেলেটা, শুকনো কাতর গলায়। ওর খিদে পেয়েছে, মায়ের দুধ চায় এখন।
৪.
ক্রমশই দূর আকাশের একেবারে শেষ সীমায় বন্দরের আলোগুলো অস্পষ্ট হয়ে মিলিয়ে এল। মিঠাইয়ের দোকানে যে বড়ো পেট্রোম্যাক্স ল্যাম্পটা জ্বলছিল, সেটা পর্যন্ত একটা তারা হয়ে গেল কেবল। তারপরেই নীরেট অন্ধকার আর অতল গহীন পদ্মা ছাড়া ডাইনে-বাঁয়ে সামনে পেছনে দেখবার মতো কিছুই রইল না।
উজানের মুখে শিরশিরিয়ে খানিক বাতাস দিচ্ছিল, তবু স্রোতের একরোখা টানে নৌকা এগিয়ে চলল সামনের দিকেই। পদ্মার ওপর কোনাকুনি পাড়ি জমালে লক্ষ্মীপুরের বাজার, সেখান থেকে কুমারহাটির খাল বেয়ে আরও ঘণ্টা খানেকের পথ। ভোরের আলো ফুটতে-না-ফুটতেই বাড়ি পৌঁছে যাব—মথুরানাথ ঘোষাল ভাবল।
বিশাল পদ্মা, মাথার ওপর তারা-জ্বলা বিরাট আকাশ। মাঝখানে অন্ধকারের কালো পর্দা এই দুটোকে যেন একসঙ্গে জুড়ে দিয়েছে। ওপরের তারারা স্থির, নীচে পদ্মার জলে লক্ষ লক্ষ তারা নেচে উঠছে একসঙ্গে, ঠিকরে পড়ছে, ছিটকে যাচ্ছে। স্রোতের মুখে ভেসে-যাওয়া পচা কচুরিপানার গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে। এক-একটা কচুরির ঝাঁক পাশ দিয়ে ভেসে যাচ্ছে পচা মড়ার মতো। দাঁড় টানা আর ফেলার আওয়াজ উঠছে তালে তালে। তরতর করে এগিয়ে চলেছে নৌকা। অন্ধকারে যাদের চোখ ভামবেড়ালের মতো তীক্ষ্ণ আর উজ্জ্বল হয়ে যায়, সেই মাঝিরাও কপালে হাত রেখে একাগ্রভাবে তাকিয়ে। এপার-ওপারের একটা গাছপালার আভাস পাচ্ছে না। এ বছর বান ডেকেছে অস্বাভাবিক, খ্যাপা পদ্মা মাত্রা ছাড়িয়ে নিজেকে এলিয়ে দিয়েছে।
অনেকটা আন্দাজ, অনেকখানি অভ্যাস আর রক্তের সংস্কারের ওপর ভরসা রেখে মাঝিরা পাড়ি জমিয়েছে। এক বার ওপারের ডাঙা ধরতে পারলে লক্ষ্মীপুরের বাজার খুঁজে নিতে আর কষ্ট হবে না। তবু মনের ভেতর অনিশ্চিত অবস্থা একটা আছেই। আর সেইটে কাটাবার জন্যে একজন গান ধরেছে :
কোন দেশেতে গেলা বন্ধু
পাথার দিয়া পাড়ি,
আমার সাথে দিয়া গেলা
জীবন-ভরা আড়ি রে–
যে দুজন দাঁড় টানছিল, তাদের একজন মাঝপথে থামিয়ে দিলে গানটাকে।
একটু সামাল ভাই, খেয়াল থাকে যেন। বড় পাকটা অনেক নৌকা গিলেছে এবার।
হালের মাঝিই গান ধরেছিল। সে বললে, ভয় নেই—ভয় নেই, টেনে যা। সে আরও ঢের দক্ষিণে, অনেক নীচুতে।
ভয় নেই, ভরসাও নেই।
আমার হাল ঠিক আছে। হালের মাঝি অভয় দিলে, নিজেদের কাজ করে যা তোরা।
মথুরানাথ ঘোষাল ছইয়ের বাইরে বসে হুঁকো টানছিল। এই রাতে এমন দুরন্ত পদ্মায় পাড়ি দেওয়ার ইচ্ছে তার বিশেষ ছিল তা নয়। কিন্তু বন্দরে দু-তিন দিন আটকে পড়তে হল। ওদিকে কাল থেকে ভাগীদারেরা গোলায় ধান তুলতে থাকবে। সামনাসামনি দাঁড়িয়ে নজর না রাখলে ঠিক বোকা বুঝিয়ে যাবে বউ-ছেলেকে। তাই আজ রাতে না ফিরলেই তার নয়।
কিন্তু মাঝখানে ভাবনায় বাধা পড়ল মথুরার।
অন্ধকারে তাকাতে তাকাতে তার চোখের দৃষ্টি এতক্ষণে অনেকটা স্পষ্ট আর স্বচ্ছ হয়ে গিয়েছিল। তা ছাড়া তারাজ্বলা আকাশের ছায়া পদ্মার ঘোলা জলের ওপর পড়ে একটা চঞ্চল আলোর দীপ্তি যেন নেচে উঠছিল, ছুটন্ত স্রোতের ওপর কাঁপছিল। সেই আলোয় একটা কীসের ওপর যেন মথুরার চোখ পড়ল।
একখানা নৌকা আসছে না এদিকপানে?
পেছন ফিরে যারা দাঁড় টানছিল, তারা দেখতে পায়নি। কিন্তু হালের মাঝির ভামবেড়ালের মতো জ্বলন্ত সজাগ চোখ ঠিকই লক্ষ করেছিল। মনের ভেতর ছায়া ঘনাচ্ছিল তার।
ঠিকই বলেছেন কর্তা। বড়ো একটা জেলেডিঙির মতো এগিয়ে আসছে তরতরিয়ে। কিন্তু
আলো নেই কেন? এই রাত্তিরে যেভাবে পাড়ি মেরে এগিয়ে আসছে…
মাঝপথেই সে থেমে গেল। আর সঙ্গে সঙ্গেই আতঙ্কে গলা বুক শুকিয়ে উঠল মথুরার।
হ্যাঁ রে, এ তল্লাটে তো কোনো ভয়ডর ছিল না।
একেবারে যে নেই তাই-বা কী করে বলি কর্তা? দিন বারো আগেই মাইল সাতেক উজানে একটা বড়োরকম ডাকাতি হয়ে গেছে!
জলপুলিশ কী করে?
ঘুরে তো বেড়ায়। কিন্তু এত বড়ো গাং। তারপর কে কোনদিক দিয়ে কোন খাল বেয়ে সুট করে সরে পড়ে, তার কি ঠিকঠিকানা আছে! শয়তানের সঙ্গে কে পেরে উঠবে বাবু?
বলিস কী! মথুরার জিভটা কে যেন ভেতর থেকে টানতে লাগল। রাত্রির এই ঠাণ্ডা ভিজে হাওয়াতে সারা গা দিয়ে যেন আগুনের হলকা বেরিয়ে এল। ভাঙা গলায় বললে, হাঁকডাক করব?
দাঁড়ের মাঝিরা দাঁড় বন্ধ করে ঝুঁকে বসল সামনের দিকে। নীরস গলায় একজন বললে, এত রাত্তিরে মাঝগাঙে চেঁচিয়ে গলা ফাটালেও কেউ সাড়া দেবে না কর্তা। এ বড়ো বিষম ঠাঁই। ধারেকাছে দু-একখানা এক-মাল্লাই থাকলেও এখন তারা কিছুতেই কাছে ভিড়বে না।
হালের লোকটি নড়েচড়ে বসল। পদ্মায় মাঝি, রক্ত গরম হয়ে উঠেছে। সে বললে, লগি বাগিয়ে ধর মকবুল। যদি ডাকাতই হয় একটা মোকাবেলা করে ছাড়ব।
মকবুল সংক্ষেপে শান্ত গলায় বললে, খেপেছ ইয়াকুবচাচা!
সত্যি কথা। কী স্বার্থ আছে তাদের? সামান্য দু-একটি ময়লা জামাকাপড়, এক-আধটা তেলচিটে বালিশ, হুকো আর আগুনের মালসা, রান্নার মাটির হাঁড়ি আর কলাইকরা বাসন, সঙ্গে দু-চার ছ-গন্ডা পয়সা বা এক-আধটা টাকা। এর লোভে কেউ আর ডাকাতি করতে আসবে না, মজুরিই পোষাবে না তার। অনর্থক পরের জন্যে মারামারি করতে গিয়ে তারা নিজেদের মরণকে ডেকে আনবে কেন?
