সেই ছায়ামূর্তিরা এল, অনেকক্ষণ ধরে আলাপ করল ফিসফিসে গলায়। তারপর… কালাচাঁদ বললে, বউ যাচ্ছি!
কালাচাঁদের মুখের দিকে তাকিয়েই বুঝতে পেরেছিল যমুনা। ভয়ে পিছিয়ে গেল দু-পা। কোথায় যাবে?
শিকারে।
আবার? তুমি যে আমায় কথা দিয়েছ।
কথা দিয়েছি! কদর্যভাবে মুখ ভ্যাংচাল কালাচাঁদ, তুই আমায় ভেড়য়া বানিয়েছিস, সকলের কাছে ইজ্জত নষ্ট করেছিস। আমি আর এভাবে থাকতে পারব না, পাগল হয়ে যাব।
যাবার জন্যে পা বাড়াল কালাচাঁদ। যমুনা দু-হাতে পা জড়িয়ে ধরল তার।
আমার কথা না-শোনো না-ই শুনলে। কিন্তু ছেলেটা…
কালাচাঁদের সমস্ত চেহারাটাকে বুনো মোষের মতো দেখাল। হিংস্র গলায় বললে, পা ছাড়, ছেড়ে দে বলছি।
দোহাই তোমার, ছেলেটার কথাও একটি বার…
ছেলে নিয়ে পদ্মায় ডুবে মর তুই। তোরও শান্তি, আমিও বেঁচে যাই। পা ছাড় হারামজাদি।
ধৈর্যের শেষ সীমায় এসে লাথি মারল কালাচাঁদ। যমুনা ছিটকে পড়ল তিন হাত দূরে। এক বারের জন্য অনুতাপ এল মনে। এক বার ভাবল…
কিন্তু ভাবলেই জট পাকায়। এতদিন ধরে যত ভেবেছে ততই যমুনার জালে সে জড়িয়ে গেছে, টের পেয়েছে ধীরে ধীরে তার শক্তি শুকিয়ে আসছে, সাহস থমকে দাঁড়াচ্ছে। কালাচাঁদ আর অপেক্ষা করল না, পদ্মা তখন তার নাড়ি ধরে টান দিয়েছে।
নৌকাতে ছিল চক্রবর্তী। মেয়ের বিয়ের জন্যে গয়না কিনে নিয়ে ফিরছিল।
কাঁপতে কাঁপতে বেরিয়ে এল, ছাইয়ের মতো তার মুখ।
দোহাই বাবা, গরিব ব্রাহ্মণকে ছেড়ে দাও, ব্রহ্মস্ব হরণ কোরো না।
জবাব দিলে রাখাল। চক্রবর্তীর গলার ওপর রামদা বাগিয়ে ধরে বললে, চুপ কর বুড়ো শয়তান কোথাকার। যা আছে বের করে দে এখুনি। নইলে এক কোপে মাথা উড়িয়ে দেব।
তেমনি থরথর কাঁপতে কাঁপতে হাঁটু ভেঙে বসে বড়ল চক্রবর্তী। ভাঙা ঘ্যাসঘেসে গলায় বললে, বাবাসকল, দয়া করে… চুপ। কী আছে দে এখুনি!
চক্রবর্তী বেঁচে যেত, অনর্থক একটা বুড়ো মানুষকে খুন করে হাত নোংরা করবার ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু নৌকার লণ্ঠনের মিটমিটে আলোয় কালাচাঁদের মুখের দিকে তার চোখ পড়ল। দুগ্রহ।
চক্রবর্তী যেন সমুদ্রে ভাসতে ভাসতে কুটো কুড়িয়ে পেল।
তুমি বাবা কালাচাঁদ না? রায়নগরে চাটুজ্জেদের রান্নাঘর ছেয়ে দিয়েছিলে না গত বছর? বলতে বলতে আশায় জ্বলে উঠল চক্রবর্তীর মুখ। আমি সে-বাড়িতে ছিলুম, তারা আমার কুটুম। বসে বসে তামাক খেতুম আর তোমার সঙ্গে কত গল্প…
কথাটা আর শেষ হল না। রাখালের হাতের রামদা নেচে উঠল বিদ্যুতের মতো। চক্রবর্তীর মনে হল ঘাড়ের ওপর খুব জোরে কে একটা ধাক্কা দিয়েছে। তারপরেই মাথাটা ছিটকে পড়ল পাটাতনের ওপর। চোখ দুটো তখনও জ্বলজ্বল করছে, ঠোঁট দুটো বাকি কথাটা শেষ করতে চাইছে তখনও। কবন্ধটা কয়েক সেকেণ্ড স্থির হয়ে বসে রইল। আট-দশটা শিরা থেকে ফোয়ারার মতো ছিটকে উঠল রক্ত, তারপর উবুড় হয়ে পড়ে গেল শরীরটা।
শা-লা! চিনে ফেলেছিস। রাখালের চোখ দুটো অদ্ভুত দেখাচ্ছে, মনে হল এখন সে রক্ত খেতে পারে।
একটা মাঝি নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তাকে ধরা গেল না। আর-একটা বল্লমের মুখে এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে গেল।
এ খুন এই প্রথম নয়, এমন আরও অনেক বারই ঘটেছে কালাচাঁদের। নিজের হাতেই যে কতগুলোকে শেষ করেছে সেকথা আঙুল গুনেও বলতে পারে না। তবু হঠাৎ রক্ত দেখে মাথাটার ভেতর কেমন পাক খেয়ে গেল তার। চোখ বুজে বসে পড়ল পাটাতনের ওপর।
ঝিম ভাঙল কার যেন ঝাঁকুনিতে।
কী হল তোর? এই কালাচাঁদ, এই…
কিছুই হয়নি, চোখ খুলে উঠে পড়ল কালাচাঁদ। চক্রবর্তীর রক্তে সারা গা তার মাখামাখি।
শেষরাতে যখন স্নান করে বাড়ি ফিরল, রক্তের গন্ধটা তখনও যেন জড়িয়ে আছে শরীরে, কেমন গুলিয়ে উঠছে শরীর।
চক্রবর্তীকে খুন না করে উপায় ছিল না, চিনে নিয়েছিল। তবু–তবু–
শালা!
নিজের উদ্দেশেই গালাগাল করলে কালাচাঁদ। এই অধঃপাত হয়েছে যমুনার জন্যেই।সে-ই তাকে এমনভাবে সব কাজের বার করে দিয়েছে। মানুষের রক্ত দেখে আজ তার মাথা ঘুরে গেল—ছি ছি! এরপরে আর তার মুখ-দেখানোর জো রইল না। বাড়ির দরজায় পা দিয়ে কালাচাঁদ ভাবল, আজ বউটা একটা কথাও বলতে এলে একচোট বোঝাপড়া হয়ে যাবে তার সঙ্গে।
কিন্তু কিছুই করবার দরকার হয় না কালাচাঁদের।
ভাঙা চাঁদের আলো পড়েছে বারান্দায়। সেইখানেই মুখথুবড়ে শুয়ে আছে যমুনা।
এই ওঠ, ওঠ। ওঠ-না হারামজাদি! দরজা খোলা রেখে এইভাবে পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছিস!
যমুনার সাড়া এল না। কালাচাঁদের পায়ের গুতোয় সমস্ত শরীরটা একবার নড়ে উঠল কেবল। আর তখনি একটা তীব্র দুর্গন্ধ এসে লাগল নাকে-মুখে, চাঁদের বিবর্ণ আলোয় দেখল খানিকটা তরল জিনিস লেপটে আছে যমুনার সর্বাঙ্গে, সারা বারান্দায়।
ঘরের বারান্দায় মিটমিট করছে লণ্ঠন। পলতেটা বাড়িয়ে দিল কালাচাঁদ, তারপর সেটা নিয়ে যমুনার মুখের ওপর এক বার ঝুঁকে পড়েই দু-হাত পিছিয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে।
দুটো সাদা পর্দা নেমে এসেছে যমুনার খোলা চোখে—যেন মরা পাখির চোখ। ঠোঁটের দু পাশে গলায় বুকে বমি চিকচিক করছে এখনও।
কলেরা।
কখন বার কয়েক ভেদবমি করে এই বারান্দার ওপরেই মুখথুবড়ে মরেছে যমুনা। কালাচাঁদকে ছুটি দিয়ে গেছে চিরকালের মতো। আর কাঁদবে না, বাধা দেবে না, বারণ করবে না কোনোদিন।
