বুড়ো কেঁদে অস্থির হয়ে গিয়েছিল।
তবু ভাগ্যিস এতদিনে মনে পড়ল বাপটাকে।
কী করব বাবা, অনেক দূরের পথ যে।
না-এলি, না-এলি। তোরা সুখে থাকলেই আমার সুখ। হ্যাঁ রে, তোকে তো কালাচাঁদ কোনো কষ্ট দেয় না? ভাত-কাপড়ের দুঃখু পাসনে তো?
এক বারের জন্যে মুখ শুকিয়ে গিয়েছিল যমুনার। না, ভাত-কাপড়ের কষ্ট নেই। কষ্ট যে তার কোথায়, সেকথা মুখফুটে কোনোদিন বলতে পারবে না যমুনা, শুধু ভেতরে ভেতরে পুড়ে খাক হয়ে যাবে তুষের আগুনে।
না বাবা, কোনো কষ্ট নেই।
বলে যমুনা ভেবেছিল— সত্যিই তো। এই সাত-আট মাসের ভেতরে কালাচাঁদ এক বারও রাত্রে বেরোয়নি পদ্মার বুকে হানা দিতে, রক্তমাখা পাপের ধন নিয়ে আসতে। ছেলের ভবিষ্যৎ ভেবে বদলে গেছে সে। জমি কেনবার কথা ভাবছে, বলদও মনের মতো খুঁজছে হাটে হাটে। না, যমুনার কোনো দুঃখ নেই।
ফিরে আসবার সময় তেমনি করেই বুড়ো বাপ এসে দাঁড়িয়েছিল ঘাটে। আর পদ্মার স্রোতে তেমনি তিরের মতো ভেসে গিয়েছিল নৌকা। এবার আর কালাচাঁদ কথা বলেনি, গান গায়নি, নিঃশব্দে বইঠা টানতে টানতে তাকিয়ে ছিল জলের দিকে।
কী ভাবছ? যমুনা জিজ্ঞেস করেছিল।
উঁ?
কী ভাবছ চুপ করে?
ক্লান্তভাবে হেসেছিল কালাচাঁদ। বলেছিল, ভাবছি তোর কথাই সত্যি হল তাহলে। এরপর থেকে একেবারে চাষাই হয়ে যাব। রাতের পদ্মা যখন কালো আঁধারে ডাক পাঠাবে, তখন সে-ডাক আমি আর শুনতে পাব না, একপেট পানতা ভাত খেয়ে ভোঁস ভোঁস করে ঘুমোব কেবল।
আবার ওই কথা? ফের যদি ওসব বলবে, তাহলে ছেলে বুকে করে আমি সোজা গাঙের মধ্যে ঝাঁপ দিয়ে পড়ব এই বলে দিচ্ছি তোমাকে।
কালাচাঁদ আর কথা বলেনি। চুপ করে বইঠা টেনেছে বসে বসে।
হ্যাঁ, চেষ্টা সে করেছিল। মদ ছেড়ে তাড়ি ধরেছিল, তাও হপ্তায় এক-আধ দিনের বেশি নয়। সন্ধ্যার অন্ধকারে যারা ছায়ামূর্তির মতো আসা-যাওয়া শুরু করেছিল, টিটকিরি দিত তারা।
কী হল তোর? বউয়ের আঁচল ছেড়ে যে নড়তে চাসনে?
আর ভালো লাগে না এসব। আমাকে আর ডাকিনি। পাপ কাজের ভেতরে আমি আর নেই। ছেলের আখেরটা তো দেখতে হবে।
আরে ছেলের আখেরের কথাই তো হচ্ছে। একটু বড় হলেই সঙ্গে নিবি। নিজের হাতে শিখিয়ে পড়িয়ে নিবি এখন থেকে। তবে-না বাপের নাম রাখতে পারবে।
না। ওসব করব না আমি।
পাগলামো করিসনি কালাচাঁদ। একজন ধমকে দেয়, ওই বউ-ই তোর মাথা খেয়েছে। দে ওটাকে তাড়িয়ে। তুই সঙ্গে না বেরুলে আমরা জোর পাই না—কানা হয়ে যাই। বউটাকে দে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে।
কালাচাঁদ চুপ করে থাকে। তার মুখের চেহারা দেখে বোঝা যায়, কথাটা তার পছন্দ হয়নি।
একজন টিপ্পনী কেটে বলে, তাহলে একদিন রাতে মুখে কাপড় বেঁধে দিই বউটাকে লোপাট করে। তারপর…
হঠাৎ কালাচাঁদ বেসুরো গলায় গর্জন করে ওঠে। দপ দপ করে জ্বলে ওঠে চোখ, মুখের চেহারা হয়ে ওঠে হিংস্র জানোয়ারের মতো। কালাচাঁদ বলে, খবরদার-খুন করে ফেলে দেব এসব বললে। মুখ সামাল!
আহা-হা! ঠাট্টাও বুঝতে পারিসনে?
না, ওসব ঠাট্টা আমার ভালো লাগে না।
দলের লোকেরা নিরাশ হয়ে চলে যায়। কিন্তু কালাচাঁদ খুশি হতে পারে না। মনের ভেতর সমানে জ্বলে যেতে থাকে। ওদের কথাগুলো বাজতে থাকে কানে।
যমুনা এসে বলে, অনেক রাত হল যে। খাবে না?
না।
কী হল?
কালাচাঁদ ধমক দিয়ে বলে, বিরক্ত করিসনি আমাকে। তোর ইচ্ছে হয়, একপেট গিলে পড়ে থাক গে।
নিজের ওপর রাগ হয় কালাচাঁদের, অকারণ বিদ্বেষে মনটা ভরে ওঠে। ঘরামি-জনমজুর চাষি! রাত্রের পদ্ম আর তাকে কোনোদিন ডাক পাঠাবে না। সে তার জীবন থেকে সরে গেছে চিরকালের মতো। এখন ভালোমানুষ হবে কালাচাঁদ, পরের ঘর ছেয়ে দেবে, বেড়া বাঁধবে, ফসল কাটবে।
অসহ্য মনে হয়।
সব ওই যমুনার জন্যে। যদি রাখালের বোনটা অমন করে না মরে যেত, যদি সে বিয়ে করে না আসত, যদি ছেলেটা না হত কীসের ভয় ছিল কালাচাঁদের, কাকেই-বা পরোয়া করত সে? যেমন চলছিল, তেমনিই চলত। পুলিশের হাতে ধরা পড়ে ফাঁসিতে ঝুলতে হলেই-বা কী আসত-যেত তার! জোয়ান চিরকাল জোয়ানের মতোই মরে।
কিন্তু…
মাথাটা দু-হাতে টিপে ধরে বসে থাকে কালাচাঁদ। কিছু ভালো লাগে না। বিশ্রী অশ্লীল ভাষায় পৃথিবীসুদ্ধ লোককে তার গালাগাল দিতে ইচ্ছে করে।
যমুনা আবার এসে জিজ্ঞেস করে, খেয়ে নিলে হত না?
দূর হয়ে যা সামনে থেকে। উঠে ছিটকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় কালাচাঁদ।
আরও এক মাস যায়, দু-মাস যায়, জমি কিনব কিনব করেও কেনা হয় না। হাটে হাটে ঘুরেও বলদ পছন্দ হয় না কিছুতেই। আর রাত জেগে জেগে শোনে দূরে পদ্মার ঢেউ ভাঙার শব্দ। ভাবে অন্ধকারে নিশ্চিন্ত টাকার থলে নিয়ে পদ্মায় পাড়ি দিচ্ছে পাটবেচা মহাজন, ভারী ভারী গয়নাপরা মেয়েদের নিয়ে নৌকা চলেছে দূরের শহরে। কালাচাঁদের মাথার ভেতর তুফান ছুটতে থাকে।
ছেলেটাকে বুকে নিয়ে যমুনা ঘুমিয়ে পড়লে এক-একদিন এসে দাঁড়ায় পদ্মার ধারে। কালো উজ্জ্বল জল যেন হাতছানি দিয়ে তাকে ডাক পাঠায়। মানুষ শিকার করার স্মৃতিগুলো সব ভেসে ওঠে চোখের সামনে। থাকতে পারে না কালাচাঁদ, একটা ডিঙি খুলে নিয়ে ভাসিয়ে দেয় অন্ধকার নদীতে, ঘণ্টা খানেক পাগলের মতো বইঠা টেনে মনের অসহ্য অস্থিরতাটাকে খানিক শান্ত করতে চেষ্টা করে।
কিন্তু আর পারল না শেষপর্যন্ত।
