তিন দিনের জ্বরে মরে গেল। নইলে কি আর যমুনাকে বিয়ে করে আনত সে? রাখালের বোনটার কথা ভাবতে ভাবতে কালাচাঁদের ক্লান্ত শরীর ঘুমে জড়িয়ে আসে, নাক ডাকতে শুরু করে। আর আস্তে আস্তে বিছানা ছেড়ে বেরিয়ে যায় যমুনা—আকাশে সকালের আলো ফুটেছে।
তবু চেষ্টা করেছে যমুনা। দিনের আলোয় কালাচাঁদের মনটা ভালো থাকলে, তার মুখোনাকে বারো বছরের ছেলের মতো শান্ত আর কোমল দেখালে—সেই সময়।
আচ্ছা, তোমার পরকালের ভয় নেই?
দুত্তোর পরকাল! ওসব বুঝি না!
খুন কর কেন?
সহজে করি না তো? চিনে না-ফেললে কিংবা বাধা না-দিলে হাত ছোঁয়াই না কারুর গায়ে।
মানুষ মারতে কষ্ট হয় না?
কই মাছ কুটতে কষ্ট হয় তোর? হাঁস কাটতে?
এক হল?
কালাচাঁদ হাসে, তফাত কিছু নেই। লাল রক্ত বেরোয়, ছটফট করে, তারপর সব ঠাণ্ডা।
যমুনা চুপ করে থাকে কিছুক্ষণ। আবার বলে, পরকালের ভয় না-ই করলে, পুলিশকে ভয় হয় না? ধরতে পারলে যে নিয়ে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেবে।
এই ভয়টা কালাচাঁদেরও নেই তা নয়। পুলিশের নজর তার ওপর আছেই। যমুনাকে বিয়ে করে আনবার আগে দু-তিন বার দারোগা এসে এটা-ওটা জিজ্ঞেস করে গেছে তাকে। কিন্তু এত সাবধান তার দলটা, এমন হিসেব করে কাজ করে যে আজ পর্যন্ত কাঁটার আঁচড়টি লাগেনি তার গায়ে। তবু মধ্যে মধ্যে বুক ধুকপুক করে। জলপুলিশের লঞ্চ ইদানীং একটু বেশি যাওয়া-আসা করছে এই তল্লাট দিয়ে। ভয় করে বই কী কালাচাঁদের।
আর ভয় করে বলেই সেটাকে আরও বেশি করে উড়িয়ে দিতে চায়। হা-হা করে হাসে এবারে।
ওঃ, পুলিশ। পুলিশ ঢের দেখেছি।
বেশ, পুলিশও নয় কিছু করতে পারবে না। কিন্তু টাকা তো কম জমল না। কেন আর এসব করে বেড়াও তুমি? যা আছে তাই দিয়ে জমিজমা কেনো, বলদ আনো, চাষবাস করো।
বলিস কী! সড়কি ফেলে লাঙল নেব! জোয়ানের কাজ ছেড়ে চাষা হয়ে যাব।
কোনো লজ্জা নেই। চাষেই তো লক্ষ্মী। দোহাই তোমার—অনেক তো করলে, এবার ছেড়ে দাও এসব।
দাঁড়া দাঁড়া। আর দু-চারটে ভালো খেপ মেরে নিই, তারপর…
না না, এখুনি। আজ থেকেই ছেড়ে দাও। যমুনা পা জড়িয়ে ধরে, ছেড়ে দাও এসব।
আবার রাখালের বোনটাকে মনে পড়ে, বুকের ভেতরটা যেন জ্বালা করতে থাকে কালাচাঁদের। উঠে দাঁড়িয়ে বলে, দেখব, দেখব ভেবে।
ভাবে কালাচাঁদ। পুলিশের ভয়, ফাঁসির দড়ি। ছেড়েছুড়ে দিলেও মন্দ হয় না। কিন্তু তার বদলে চাষা? লাঙল চেপে ধরে দুপুরের রোদে হাল দেওয়া, জল-কাদার ভেতর ধান রোয়া, সকাল থেকে নুয়ে নুয়ে পিঠ কুঁজো করে ফসল কাটা। পারবে কালাচাঁদ? তার মেজাজে কুলোবে?
তা ছাড়া রাত? ডাকিনীর মতো কালো হয়ে আসে। পদ্মা তার ঝোড়ো চুল মেলে দিয়ে ডাক দেয়। অথই গহীন জলের ওপর খাঁড়া নাচতে থাকে। সঙ্গীরা আসে, ফিসফিস করে খবর দিয়ে যায় পাট বিক্রি করে ফিরছে নামকরা মহাজন, নৌকাটা ধরতে পারলে…
বুকে ঢেউ দোলে, খাঁড়া নাচিয়ে পদ্মা ডাক দেয়। মাথার ভেতর মদের নেশা আগুনের চাকা হয়ে ঘুরতে থাকে। কালাচাঁদ আর থাকতে পারে না। খিদেয় ছটফটিয়ে ওঠা বাঘ হরিণের গন্ধ পায়।
তারপর নদী।
ছিপের দাঁড় তালে তালে পড়তে থাকে, জল কেটে সোঁ সোঁ করে এগিয়ে চলে। বারো চোদ্দো জোড়া চোখ অন্ধকারে জোনাকির মতো জ্বলে, একটা মিটমিটে আলো দুলতে থাকে–পাটবেচা মহাজনের নৌকাটা আসছে। মাঝপদ্মা, নিথর রাত—পদ্মার জলে খড় ঝলকায়। তখন কোথায় যমুনা, কোথায় কে?
দাওয়ার খুঁটি ধরে বসে আছে যমুনা। জল গড়াচ্ছে চোখ দিয়ে।
সকালে দৃশ্যটা দেখেই বিরক্ত হয় কালাচাঁদ।
এই সাতসকালেই কাঁদতে বসলি কেন?
যমুনা চুপ করে রইল।
তবে তুই কাঁদ বসে বসে, আমি চললুম কালাচাঁদ পা বাড়াবার উদ্যোগ করল।
একটু দাঁড়াও। যমুনা চোখের জল মুছল, কথা শুনবে একটা?
আবার ওইসব বলবি তো? কালাচাঁদের মুখে মেঘ ঘনিয়ে এল, তুই যা শুরু করেছিস, এরপর বাড়ি ছেড়ে পালাতে হবে আমাকে। নইলে গিয়ে ধরা দিতে হবে পুলিশের হাতে।
যমুনা চোখ দুটো মেলে ধরল কালাচাঁদের দিকে। কাঁপা গলায় বললে, আমার কথা নাহয়–ই ভাবলে। আমার পেটে যে আসছে তার কথা এক বার ভাবো। তোমার যদি একটা-কিছু হয় তাহলে…
যমুনাকে শেষ করতে দিলে না কালাচাঁদ। সঙ্গে সঙ্গে বসে পড়ল বউয়ের পাশে, দু-হাতে জড়িয়ে ধরল কোমরটা।
তোর ছেলে হবে বউ? সত্যি, ছেলে হবে তোর?
আনন্দে আদরে যমুনাকে ভরে দিলে এক মুহূর্তে। বদলে গেছে কালাচাঁদ—আবার সেই মানুষটা, বিয়ের আগে যার মস্ত জোয়ান শরীরটার ওপর ছেলেমানুষের মতো একখানা মুখ দেখে ভারি ভালো লেগেছিল যমুনার।
অনেকক্ষণ পরে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বললে, ডাকাতের ছেলে ডাকাত হবে—এই কি তুমি চাও?
কালাচাঁদ চুপ করে রইল একটু। তারপর ধীরে ধীরে বললে, না, এবার থেকে ভালো হয়ে যাব, সব ছেড়ে দেব–দেখে নিস তুই।
৩.
ছেলেই হল। গোলগাল, হৃষ্টপুষ্ট। কোলে তুলতে কাঁকাল বেঁকে আসে যমুনার। বড়ো হলে বাপের মতো হয়ে উঠবে, এখুনি ফুঠে বেরুচ্ছে তার লক্ষণ।
কিন্তু কেবল জোয়ানই হবে বাপের মতো? ভাবতে গিয়ে চোখে অন্ধকার নামে।
কথা রাখতে চেষ্টা করেছিল কালাচাঁদ। প্রায় এক বছর সে যেন নতুন হয়ে গিয়েছিল। ঘরে পোঁতা টাকাকড়ি যা আছে আছেই, তবুও আবার মন দিয়ে ঘরামির কাজ শুরু করেছিল এখানে-ওখানে। জনমজুরির খোঁজে আসা-যাওয়া করেছিল দূর দূর গ্রামে। যমুনাকে নিয়ে গিয়েছিল বাপের বাড়ি, বুড়োকে দেখিয়ে এসেছিল নাতির মুখ।
