ল্যাজের একটা বিরাট ঝাপটা দিয়ে, একরাশ জল ছলকে দিয়ে কুমির ডুবে গেল। যমুনা তখনও কাঠের পুতুলের মতো শক্ত হয়ে আছে। কালাচাঁদ হেসে বললে, ভয় নেই—ভয় নেই। আমরা আছি নৌকার উপর, ও-শালা আমাদের কী করবে। আর জলের তলায় হলেই বা কী করত? কালাচাঁদ দুলেকে চেনে না, গলা টিপে মেরে ফেলতুম ওকে।
কুমিরের চাইতে আরও নিষ্ঠুর—আরও বীভৎস দেখাল কালাচাঁদের চোখ। যমুনা ভরসা পেল না, আরও শক্ত হয়ে ঠায় বসে রইল, বুকের ভিতরটা তার হিম হয়ে গেছে। কিছুই জানত না যমুনা, তবু এই মুহূর্তে কেমন করে যেন টের পেল–কালাচাঁদকে সে যা ভেবেছিল, কালাচাঁদ ঠিক তা নয়।
২.
চাষির ছেলে, অথচ চাষবাস করে না। জমিজমা বলতেও কিছু নেই। অল্পস্বল্প ঘরামির কাজ জনমজুর খাটা। তবু টিনের নতুন দো-চালা ঘর, গোয়ালে তিন-তিনটে গোরু। ত্রি-সংসারে কোথাও কেউ নেই।
এই হল কালাচাঁদের সংসার।
তখনও কিছু টের পায়নি যমুনা। পেল সেদিন, যেদিন অনেক রাতে কোত্থেকে একপেট মদ খেয়ে ফিরল কালাচাঁদ। ভাত আর মাছের ঝোল রান্না করে যমুনা ঝিমুচ্ছিল দাওয়ায় বসে বসে। পেয়ারা গাছের পাশে হলদে রঙের এক টুকরো চাঁদ ঝুলে পড়ছিল, থেকে থেকে ডাহুক ডাকছিল ঝোপের ভেতর। যমুনা ঝিমুচ্ছিল আর আলগা আলগা স্বপ্নের মধ্য দিয়ে টুকরো টুকরো মেঘের মতো ভেসে যাচ্ছিল ছাড়া ছাড়া কতগুলো ছবি। মাকে উঠোনে নামানো হয়েছে, একমাথা রুখো চুল ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। ছোট্ট যমুনা কাঁদছে লুটোপুটি খেয়ে, পাশের বাড়ির মানিকের মা কী যেন বোঝাতে চাইছে তাকে। বাবা একটা নারকেল গাছে হেলান দিয়ে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে। তারপরে বৃষ্টি পড়ছে, অনেক-অনেক বৃষ্টি। উঠানে ব্যাং লাফাচ্ছে–একটা-দুটো-তিনটে-চারটে। বাবা হাট থেকে আসছে, বেলা ডুবে যাচ্ছে, যমুনা দাঁড়িয়ে আছে দোরগোড়ায়। বাবা এসে যমুনাকে দু-হাত বাড়িয়ে বুকে টেনে নিলে, বললে, কী সুন্দর শাড়ি কিনে এনেছি তোর জন্যে। বিক্রমপুরের তাঁতের শাড়ি, ময়ূরকণ্ঠী রং…
কড়-কড়াং! যেন বাজ পড়ল কোথাও। চমকে উঠে বসল যমুনা। সদর দরজাটা আছড়ে ফেলে বাড়িতে ঢুকল কালাচাঁদ, টলতে টলতে এগিয়ে এল।
মদ খাও নাকি তুমি? যমুনা চেঁচিয়ে উঠল।
কারও বাপের পয়সায় খাই নাকি? রূঢ় কর্কশ জবাব এল একটা।
ছি, ছি!
চুপ কর হারামজাদি। গলাটাকে সপ্তমে চড়িয়ে কালাচাঁদ জানোয়ারের মতো গর্জন করে। উঠল, চেঁচাবি তো গলা টিপে মেরে ফেলব!
নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারল না যমুনা, নিজের কানকেও নয়। লণ্ঠনের একমুঠো আলো গিয়ে পড়েছে কালাচাঁদের মুখে। সেই কালাচাঁদ, কিন্তু এক মাস ধরে যমুনা যার ঘর করেছে এ সে নয়। সমস্ত চেহারার আদলটাই বদলে গেছে তার। এখনই একটা লোহার মতো থাবা বাড়িয়ে সে যমুনার গলা টিপে ধরতে পারে।
যমুনা পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
আস্তে আস্তে স্বামীকে চিনল যমুনা। কালাচাঁদের আসলে পেশা ডাকাতি। রাতের অন্ধকারে পদ্মার বুকে সে ডাকাতি করে বেড়ায়।
প্রথম জানবার পর তিন রাত সে ঘুমোতে পারেনি। চোখের জলে ঘরের দাওয়া ভিজিয়ে ফেলেছে, ছুটে পালিয়ে যেতে চেয়েছে বাপের কাছে। কিন্তু কালাচাঁদের চোখের দিকে তাকিয়ে সে সাহসও পায়নি। কোথায় যাবে, কোনখানে পালাবে? কালাচাঁদের হাত থেকে তার পরিত্রাণ নেই কোথাও।
কেঁদেছে, নিজের মাথা খুঁড়েছে মাটিতে, তারপর ভাগ্যের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে। দেখেছে সন্ধ্যার অন্ধকারে ছায়ামূর্তির মতো একদল মানুষ এসে জড়ো হয় তাদের বাড়ির দাওয়ায়, ফিসফিস করে কথা বলে, মদ খায়, গাঁজা খায়, তারপর একসঙ্গে কোথায় বেরিয়ে চলে যায়। অসম্ভব ভয়ে সারারাত জেগে জেগে দুঃস্বপ্ন দেখে যমুনা। ভোর হওয়ার আগে ফেরে কালাচাঁদ, টাকা এনে ঢালে মেজের ওপর, আনে রক্তমাখা গয়না। দাঁতে দাঁত চেপে যমুনাকে বলে, একটা টু শব্দ যদি করবি কারও কাছে, তাহলে গলা কেটে পদ্মায় ফেলে দেব—মনে থাকে যেন।
যমুনা বালিশ কামড়ে উপুড় হয়ে পড়ে থাকে, নিশ্বাস পর্যন্ত বন্ধ হয়ে আসে তার। তারপর একটা ছোটো শাবল দিয়ে ঘরের কোনায় গর্ত করে টাকা-গয়নাগুলো পুঁতে রাখে কালাচাঁদ। বিড়ি ধরিয়ে যমুনার পাশটিতে এসে শোয়। আতঙ্কে শরীর সিঁটিয়ে ওঠে যমুনার, স্বামীর গা থেকে যেন মানুষের রক্তের আঁশটে গন্ধ পায় সে!
কালাচাঁদের মনটা নরম হয় এতক্ষণে, হাত বাড়িয়ে যমুনাকে টেনে নিয়ে আদর করতে থাকে। যমুনার মনে হয় একটা বাঘ যেন মেরে ফেলবার আগে খেলা করছে শিকারটাকে নিয়ে। চোখের পাতা চেপে ধরে সে শক্ত হয়ে থাকে।
চোখ মেলে চা বউ, চোখ মেলে চা। তোর জন্যই তো এসব করি। একছড়া সুন্দর হার পেয়েছি, পরিয়ে দেব তোকে।
প্রায় নিঃশব্দ গলায় যমুনা বলে, হার আমি চাই না, তোমার পায়ে পড়ি, এই মানুষ মারার কাজ তুমি ছেড়ে দাও। তারপর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে আরম্ভ করে।
বিরক্ত হয়ে কালাচাঁদ বিড়বিড় করে, দুত্তোর, মেয়েমানুষের নিকুচি করেছে।
যমুনাকে ছেড়ে দিয়ে কাত হয়ে শোয়। ভাবে, বিয়ে না করেই বেশ ছিল। দলের শাকরেদ রাখালের সেই বিধবা বোনটাই ছিল তার সত্যিকারের যোগ্য। যমুনার মতো একটা ভিজে কাঁথা নয়, তেতে থাকত আগুনের মতো। তেমনি ছিল সোনা আর পয়সার খাঁই। কালাচাঁদের সড়কিতে নিজের হাতে শান দিয়ে বলত, একসঙ্গে তিনটেকে ফুড়তে পারবে এমনি করে ধার দিয়ে দিলুম।
