আসবার দিন ঝরঝর করে কেঁদে ফেলেছিল বুড়ো বাপ।
তোর মা নেই যমুনা, এইটুকু বয়েস থেকে তোকে বড়ো করে তুলেছিলুম। আজ তুই দূরদেশে চলে যাচ্ছিস, বছরে এক বারও তোকে দেখতে পাব না। কী নিয়ে আমি বাঁচব বল দিকি?
যমুনা কিছু বলতে পারেনি। চোখের জলে গলার স্বর থমকে গিয়েছিল।
কালাচাঁদ বলেছিল, তুমি ভেবো না মোড়ল। দু-চার মাস বাদ এক বার করে তোমার মেয়েকে আমি দেখিয়ে নিয়ে যাব।
কথা দাও।
কথা দিচ্ছি।
বুড়ো মোড়ল আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু সময় পেল না। নোঙর আগেই তুলে ফেলেছিল কালাচাঁদ, এবার একটা খোঁচ দিলে লগিতে। পদ্মার স্রোতে ছোট্ট একটা দুলুনি খেয়ে নৌকা ছুটল তিরের মতো। পড়ে রইল ভাঙনের মুখে হেলে-পড়া মন্দিরটা। দেখতে দেখতে মিলিয়ে এল গ্রামের চিহ্ন, কখন ছাড়িয়ে গেল শ্মশানটা। নৌকা চলল।
কালাচাঁদ বইঠা ধরে বসেছিল। যমুনার দিকে তাকিয়ে নরম গলায় জিজ্ঞেস করলে, ভয় করছে তোমার?
লালশাড়ির ঘোমটাটা আস্তে আস্তে মুখ থেকে সরিয়ে দিলে যমুনা। ভিজে ভিজে পাতার তলা থেকে দুটো ডাগর চোখ মেলে ধরল স্বামীর দিকে। বললে, না।
বাপের জন্যে মনখারাপ করছে?
যমুনা জবাব দিলে না। আবার দু-ফোঁটা জল গড়িয়ে এল চোখ থেকে।
কালাচাঁদ এক বারের জন্যে বইঠাটা তুলে ধরল। তারপর বললে, মনখারাপ করবারই কথা। তুমি ভেবো না, যখনই তোমার ইচ্ছে হবে নিয়ে আসব বাপের বাড়িতে। কেমন?
কৃতজ্ঞতায় যমুনা ঘাড় নাড়ল, আচ্ছা।
পদ্মার ভরা স্রোতে নৌকা চলল। যমুনা তাকিয়ে রইল জলের দিকে। গহীন অথৈ পদ্মা। এপারের গাছপালাগুলো দেখা যায়, ওপারটা একেবারে ঝাপসা। মাঝখানে জল আর জল। উঃ, কত জল আছে এই নদীতে।
হঠাৎ যমুনা জিজ্ঞেস করল, তুমি বুঝি পদ্মায় খুব নৌকা বাও?
কালাচাঁদ হা-হা করে হেসে উঠল। হাসিটা যেন কেমন বেয়াড়া আর নতুন রকমের শোনাল যমুনার কানে। চমকে চোখ তুলল যমুনা।
পদ্মার জলেই তো বাস করি বলতে গেলে। অমাবস্যার ঘুটঘুটে আঁধারে পাড়ি জমাই। ঝড়-তুফান পেরিয়ে চলে আসি।
যমুনা শিউরে উঠল মনে মনে।
ভয় লাগে না তোমার?
কালাচাঁদ শব্দ করে হাসল না বটে, কিন্তু হাসি এবার ঝরে পড়ল গলা দিয়ে।
পদ্মার ধারে যে ঘর বাঁধে, পদ্মাকে ভয় করলে তার চলে?
কিন্তু এ যে রাক্ষুসি নদী!
কালাচাঁদ বললে, উঁহুঁ, মা। মা কালী। ঝড় উঠলে, রাত কালির মতো কালো হয়ে গেলে খাঁড়া নিয়ে নাচতে শুরু করে। সে-নাচ দেখলে আর ভয় হয় না বউ, সঙ্গে সঙ্গে নেচে উঠতে ইচ্ছে করে। তোমাকেও সে-নাচ দেখাব বউ, কোনোদিন ভুলতে পারবে না।
আমার দেখে দরকার নেই। যমুনা কেঁপে উঠল।
কালাচাঁদ একটু চুপ করে রইল, বইঠা বাওয়া বন্ধ করে স্নেহভরা চোখ মেলে চেয়ে রইল যমুনার দিকে। ছেলেমানুষ, এখনও কিছু জানে না। কিন্তু আস্তে আস্তে সব সয়ে যাবে ওর। রাত্রের পদ্মাকে চিনবে, রাত্রের পদ্মায় যা ঘটে তা-ও ওর কাছে তখন আর ভয়ংকর ঠেকবে না। ঠিক কথা, মা-র সেই কালীমূর্তি এক বার যে দেখেছে, তার চোখ সে-রূপে একেবারে ডুবে গেছে। যমুনারও তাই হবে।
কিন্তু এখনই নয়। এই দিনের আলোয় পদ্মা আর এক রকম। এ মা-র আর এক চেহারা। কোলে তুলে নেয়, আদর করে, ঠাণ্ডা হাওয়ার আঙুল বুলিয়ে দেয় গায়ে। এই পদ্মার মাঝিরা সারি গায়, ধানের নৌকা গঞ্জে এসে ভেড়ে, বাচ্চারা মোচার খোলা ভাসায়, দামাল ছেলে ঝাঁপাই ঝোড়ে, বউ-ঝিরা কলসি ভরে নিয়ে যায়, জেলের জালে রুপোলি ইলিশ ঝিলমিল করে। এই পদ্মা ফসল দেয়, বাঁকে বাঁকে খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে। তুফানের রাতের কথা এখন থাক।
কালাচাঁদের চোখ আর মন পদ্মার ওপর দিয়ে ছড়িয়ে গেল। সাদা ঘোলাজল তো নয়, যেন মায়ের দুধ! মাটি সেই দুধ টেনে নিচ্ছে শিশুর মতো, পুষ্ট হয়ে উঠছে ধানের চারা, আম-জাম নারকেল-সুপুরি রসে-শাঁসে ভরে উঠেছে। যমুনার ভীরু মুখের ওপর দৃষ্টি ফিরিয়ে এনে একটু চেয়ে রইল কালাচাঁদ, গুনগুন করল বার কয়েক, তারপর গান ধরল গলা ছেড়ে :
পদ্মা মোদের মা জননী রে,
পদ্মা মোদের প্রাণ,
তার সোনার জলে মোদের খেতে
ভরে সোনার ধান রে
ভরে সোনার ধান–
মুগ্ধ আনন্দে চোখের তারা দুটো বড়ো হয়ে উঠল যমুনার। এমন ষন্ডা জোয়ান মানুষটা, এত বড়ো বুকের ছাতি, এমন লোহার মতো হাতের গুল, তার গলায় এই গান! আর এত মিষ্টি তার গলা! পদ্মার বুকের ওপর দিয়ে দরাজ গলার এই গান যেন দূরদূরান্তে ভেসে যেতে লাগল।
যমুনার মুখের দিকে আড়চোখের দৃষ্টি রেখে কালাচাঁদ গেয়ে চলল :
রঙ্গিলা নাও স্রোতে বাইয়া
বন্ধু আসে ভিনদেশিয়া
আর আপন ভুলে রূপবতী
ভাসায় কলসখান–
যমুনার চোখে আর পলক পড়ে না। এই রূপবতী কে? সে-ই? আর এই কি সেই ভিনদেশিয়া বন্ধু, যে এমন করে তাকে রঙিলা নায়ে তুলে নিয়ে ভেসে চলেছে?
যমুনা স্বপ্ন দেখছিল, কিন্তু স্বপ্নটা ভেঙে গেল আচমকা।
নৌকার সঙ্গে সঙ্গে ওটা কী চলেছে? শ্যাওলা-ধরা কাঠের গুড়ি? না, তা তো নয়! পিঠের ওপরে কাঁটার মতো উঁচু উঁচু হয়ে আছে, চারটে ছোটো ছোটো কদাকার পা জল টানছে, সরু সুচালো মুখ, আর জলের একটু ওপরে দুটো হিংস্র পলকহীন চোখ যেন একভাবে চেয়ে আছে তার দিকে!
কুমির! কুমির! ভীত বিকৃত গলায় চেঁচিয়ে উঠল যমুনা।
সঙ্গে সঙ্গে জলের দিকে চোখ গেল কালাচাঁদের, আচমকা থেমে গেল গানটা! হিংস্র কর্কশ গলায় বললে, শা-লা। তারপর বইঠাটা বাগিয়ে ঢপাস করে একটা প্রচন্ড ঘা বসাল কুমিরটার পিঠের উপর।
