কাল। কাল সন্ধের পরে নিজেই দিয়ে আসব আমি।
রুকনি অস্বীকার করেনি কিছুই। তেমনি ঘাসবনের শান্ত কোমল ছায়ায় নিজেকে লীলাভরে এলিয়ে দিয়েছে শ্যামলালের বুকের ভেতরে। বলেছে, তোমাকে বলিনি, বললে তোমার কষ্ট হত। তা ছাড়া তোমার মতো জোয়ান মানুষটাকে পাওয়ার জন্যে ভারি লোভও হয়েছিল।
ঠিক কথা, কোনো অন্যায় হয়নি। ঘৃণাভরে রুকনিকে বুকের ভেতর থেকে ছিটকে ফেলে দেয়নি শ্যামলাল। এই ঘাসের বনে, এই দিগন্তজোড়া মুক্ত মাঠের ভেতরে এমনি নির্ভাবনায় ভালোবাসাই তো ভালো। এখানে যেমন ঘরের বেড়া নেই, তেমনি কোনো নিয়মের বেড়া নাই-বা থাকল এই গোপন ভালোবাসায়। পৃথিবীর ধর্মকেই মেনে নিয়েছে রুকনি। ক্ষতি কী? নির্জন প্রেম মাঠের খোলা বাতাসেই উড়ে চলে যাক।
আস্তে আস্তে শ্যামলাল বললে, তুই চলে যাবি?
কথাটার সোজা জবাব দিল না রুকনি। হয়তো বেদনাবোধ হয়েছে, হয়তো জেগে উঠেছে মৃদু করুণ একটুখানি সহানুভূতি। ঘুরিয়ে বলল, তোমাকে ভুলব না।
আশ্বাসের কোনো প্রতিক্রিয়া হল না শ্যামলালের মুখে। বললে, কাল এক বার আসবি শেষ বারের মতো? এর পরে তো তোকে আর দেখতে পাব না।
রুকনি ম্লানমুখে বললে, আসব।
আর একটা অনুরোধ। তোর নতুন রাঙাশাড়িটা পরে আসবি রুকনি, যেটা টকটকে লাল। আমার দেখতে ভারি ইচ্ছে করছে।
রুকনি এবার টিপে টিপে হাসল একটু, আচ্ছা।
পরদিন দুপুরে বাথানের সবচাইতে বড় মহিষটাকে বেছে নিলে শ্যামলাল। হিংস্র চেহারা, খাঁড়ার মতো প্রকান্ড দুটো শিং। মাঠের প্রচুর ঘাস খেয়ে ইদানীং এটাই একটু বেয়াড়া হয়ে উঠেছে, মাঝে মাঝে চলতি দেহাতি লোককে তেড়ে যেতে চায়। চোখের দৃষ্টিতে লালের আভাস লেগেছে, আজকাল কেমন আশঙ্কা হয় সেদিকে তাকালে।
সেই মহিষটার পিঠে চড়ে বসল শ্যামলাল। এগিয়ে চলল জাঙ্গালের দিকে। খানিকটা আসতেই পেছনের জগৎটা হারিয়ে গেল ঘন ঘাসবনের নেপথ্যে। শুধু জেগে রইল নিস্তব্ধ নির্জনতা। বাতাসে রাশি রাশি ঘাসের আনন্দিত আন্দোলনে শব্দ উঠেছে শিরশির সোঁ সোঁ। এ সেই স্তব্ধতা যেখানে নির্জনে ভালোবাসা চলে, আর আর হত্যা করা চলে নিঃশব্দে।
নালা পার হয়ে মহিষটা শ্যামলালের তাড়া খেতে খেতে অনেকটা মাটি আর পাথর ভেঙে বহু কষ্টে উঠে পড়ল জাঙ্গালে। ফোঁস ফোঁস করে হাঁপাচ্ছে মহিষটা, মাঝে মাঝে অসন্তুষ্টভাবে নাড়ছে শিং দুটো, মুখের কষ দিয়ে গড়াচ্ছে ফেনা। তা ছাড়া আকাশে প্রখর রোদ—মাথাটা যে দস্তুরমতো তেতে উঠেছে তার, সে-বিষয়ে আর সন্দেহ নেই।
হ্যাঁ, রুকনি এসেছে, লালশাড়ি পরেই এসেছে। শ্যামলালের শেষ অনুরোধটা ভোলেনি। হাসিমুখে এগিয়ে এল সামনের দিকে। আজ শেষ বাসর।
আর সেই মুহূর্তেই একটা ভৈরব গর্জন করল মহিষটা। সজোরে সামনের পা-দুটো ঠুকল জাঙ্গালের ওপরে, ঠিকরে ছড়িয়ে পড়ল একরাশ মাটি আর পাথর, লাফিয়ে নেমে পড়ল শ্যামলাল। টকটকে লাল রং দেখে খুন চেপেছে উত্তেজিত মহিষের। চোখ দুটোতে ঠিকরে বেরুল আদিম পৃথিবীর আরণ্য হিংসা। শিং দুটো নীচু করে সোজা ছুটল রুকনির দিকে।
আর্তনাদ করে পালাতে গেল রুকনি, পারল না। টিলা থেকে দৌড়ে নামতে গিয়ে হুড়মুড় করে পড়ে গেল ঘাসবনের মধ্যে। চেঁচিয়ে উঠল, বাঁচাও—বাঁচাও–
কিন্তু বুনো খ্যাপা মহিষের হাত থেকে কাউকে বাঁচানো কি সম্ভব? অনর্থক চেষ্টা করে লাভ নেই। পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে একটা বিড়ি ধরাল শ্যামলাল।
নির্জন দিগন্তপ্রসার ঘাসের বন। বাতাসে সোঁ সোঁ শব্দ। খানিকটা এগিয়ে গেলেই বাতাসের শব্দ সব কোলাহল উড়িয়ে নিয়ে যায়, কয়েকটা চাপা আর্তনাদের তো কথাই নেই। কিছুক্ষণ পরে যখন পেছনের গোঙানিটা একটু কমে এসেছে, তখন এক বার, শুধু এক বারের জন্যে ফিরে তাকিয়ে দেখল শ্যামলাল। ঘাসবনের মধ্যে কিছু দেখা যায় না, তবে ল্যাজটা ওপরের দিকে তুলে মহিষটা ক্রমাগত কী যেন গুঁতিয়ে চলেছে আর গর্জন করছে হিংস্র ভয়ংকরভাবে। পায়ের দাপটে ঘাসের বন ছিঁড়ে ছিঁড়ে বাতাসে ঘুরপাক খাচ্ছে ঘূর্ণির মতো। পলকের জন্যে শিং দুটো চোখে পড়ল; লালশাড়ির চাইতে আরও গাঢ়, আরও গভীর রঙে সে-দুটো টকটক করছে। সে-রক্ত ঘাসবনের হিংসা, ঘাসবনের ভালোবাসার মতোই নগ্ন আর নিরাবরণ।
শ্যামলাল নিশ্চিন্তে বিড়িটায় একটা টান দিল, তারপর হাতের লাঠিটা বাগিয়ে ধরে জাঙ্গালের ওপর দিয়ে সোজা হেঁটে চলল। তার কাজ এখনও আর একটু বাকি। একটা আলাদ গোখুর দরকার, দরকার খানিকটা তাজা বিষ। ঘাটোয়ালের জামাইয়ের জন্যে খাঁটি ঘি-টা সন্ধের মধ্যেই পৌঁছে দিতে হবে যে!
ঘূর্ণি
অনেক দূরের গ্রাম থেকে বিয়ে করে এনেছিল কালাচাঁদ। বউ যমুনা তখনও কিছু জানত না।
বাবরি চুল ষন্ডা মানুষটাকে দেখে তার ভালোই লেগেছিল। মস্ত ছাতি, মোষের মতো চওড়া কাঁধ। গায়ের কুচকুচে কালো রং রোদ পড়লে যেন উজলে উজলে ওঠে। আর কী অসম্ভব শক্তি তার শরীরে। একটা হ্যাঁচকা টান দিয়ে তিনমনি ধানের বস্তাটাকে কতদূরে ছিটকে দিলে!
এমন জোয়ান, অথচ মুখোনা ঠিক বারো বছরের ছেলের মতো শান্ত আর কোমল। হাসলে ভারি লাজুক মনে হয়। যমুনা খুশি হয়েছিল। সরল মানুষটি প্রাণভরে তাকে ভালোবাসবে, আপদ-বিপদের দিন এলে লোহার মতো চওড়া বুকের ভেতরে ছোট্ট একটা পাখির মতো লুকিয়ে রাখবে—বলবে, আমি আছি, ভাবনা কী!
