মনের ভেতরে অসহ্য অস্বস্তি। নিজের হাত কামড়ে খেতে ইচ্ছে করে শ্যামলালের। ছুটে যেতে ইচ্ছে করে ওই শালা গাঁজাখোর ঘাটোয়ালের কাছে। তার পা ধরে সে বলতে পারে…
কিন্তু বাধা দিয়েছে রুকনি। কেমন চমকে উঠেছে, আশঙ্কায় ছলছল জ্বলজ্বল করে উঠেছে কালো চোখ, বলেছে, না না।
না না কেন? টাকা যদি চায়, আমি দেব। শ রুপেয়া, দেড়শো রুপেয়া— আমার টাকার অভাব নেই।
রুকনি তবুও বলেছে, না, সে হবে না!
কেন?
হঠাৎ একটা ঢোঁক গিলেছে রুকনি, কী-একটা কথা সামলে নিয়েছে মুহূর্তের মধ্যে। রপর দ্বিধা করে বলেছে, আমার বাপের ভারি রাগ তোমার ওপরে। হাজার টাকা দিলেও রাজি হবে না। বরং ঝামেলা হবে খানিকটা। তার চাইতে এই ভালো।
এই ভালো! মনের দিক থেকে মেনে নিতে পারে না শ্যামলাল। এ ভালো নয়, এ লুকোচুরি এখন রীতিমতো পীড়া দিচ্ছে তাকে। অপরাধবোধ, লজ্জা। কারও কাছে কখনো ছোটো হয়নি শ্যামলাল, চলেছে মাথা উঁচু করে, সোজা মনের মতো হাতের সোজা লম্বা লাঠিটার ওপরে নিঃসংকোচ জোর রেখে। আজ হীন মনে হয় নিজেকে, মনে হয় ঘাটোয়ালের কাছে সে হেরে যাচ্ছে। এমন একটা জায়গাতে এখন দাঁড়িয়ে আছে ঘাটোয়াল, যেখানে তার দিকে মুখ উঁচু করে তাকানোর সাহস নেই শ্যামলালের।
আরও অসহ্য লাগে রাত্রি। দুর্বিষহ বোধ হয় একেবারে। খোলা বারান্দায় খাঁটিয়ায় ঘুমোয় শ্যামলাল। গভীর রাত্রে শুনতে পায় বহু দূরের সাঁওতাল পাড়া থেকে বাঁশির সুর, ওই সুরটা রক্তের ভেতরে যেন ঝিনঝিন করে বাজে—দক্ষিণের হাওয়াটায় যেমন বিশ্রী একটা অস্বস্তি, শরীরকে আচ্ছন্ন করে তুলতে চায়। বড়ো একা, বড়ো বেশি নিঃসঙ্গ।
নাঃ, আর পারা যায় না। এবার বলতেই হবে ঘাটোয়ালকে, কপালে যা থাকে তাই হোক। সারারাত ছটফট করে বলেই ঘুমটা ভাঙতে দেরি হচ্ছে আজকাল। মুখের ওপরে রোদ এসে পড়েছে শ্যামলালের, ঘুমের ভেতরে কেমন অস্বস্তি বোধ হচ্ছে। হঠাৎ–
চমকে ধড়মড় করে উঠে বসল শ্যামলাল।
এ কি সত্যি? এ কি বিশ্বাস করবার মতো? তার দাওয়ার নীচে দাঁড়িয়ে ঘাটোয়াল। ন্যাড়া মাথা, কানে আংটি। এই সকালেই নেশা করে এসেছে—টকটকে লাল চোখের দৃষ্টি। হাতে একখানা তেল-পাকানো মস্ত লাঠি। ডাক দিচ্ছে, হোই হো ঘোষ, শুনত হো?
আতঙ্কে মড়ার মতো পাড়ুর হয়ে গেল শ্যামলাল। রুকনির ব্যাপারটা টের পেয়েছে নাকি ঘাটোয়াল? বিহ্বল চোখ বুলিয়ে এক বার তাকিয়ে দেখে নিলে লাঠিটা তার তৈরি আছে কি না।
কিন্তু তাজ্জব লাগিয়ে দিয়ে ঘাটোয়াল হাসল। বললে, এত বেলা পর্যন্ত শুয়ে থাক কেন? কাজের কথা আছে তোমার সঙ্গে।
কাজের কথা! এবং ঘাটোয়াল হাসছে। তাহলে…
এবারেও চমক লাগল শ্যামলালের, কিন্তু আনন্দের চমক। রুকনিই তবে ব্যবস্থা করে ফেলেছে সব! কিন্তু ঘাটোয়াল পাকা লোক, অনেক টাকা চাইবে নিশ্চয়। তা হোক, তা হোক। রুকনির জন্যে দুশো টাকা খরচ করতে তার আপত্তি নেই।
আও, বৈঠো খাঁটিয়ামে
আমন্ত্রণ গ্রহণ করে খাঁটিয়ার এসে বসল ঘাটোয়াল। রোমাঞ্চিত আনন্দে সর্বাঙ্গ কাঁপছে শ্যামলালের। তার উড়ে যেতে ইচ্ছে করছে এই সবুজ ঘাসবনের ওপর দিয়ে, ঝাঁপিয়ে পড়তে ইচ্ছে হচ্ছে রুকনির বুকে। কিন্তু আর একটু ধৈর্য ধরতে হবে, করতে হবে আরও একটু প্রতীক্ষা।
কথা আরম্ভ করবার আগে হাতের চেটোতে বেশ খানিকটা খৈনি পাকিয়ে নিলে ঘাটোয়াল। ভাগ দিলে শ্যামলালকে, নিজে মুখে পুরলে খানিকটা। তারপর ধাতস্থ হয়ে বললে, ভেবে দেখলাম তোমার সঙ্গে ঝগড়াঝাঁটি করে কোনো লাভ নেই।
শ্যামলাল বললে, জরুর।
যা হয়ে গেছে ভুলে যাওয়াই ভালো। পিচ করে দাঁতের ফাঁক দিয়ে খানিকটা থুথু ফেললে ঘাটোয়াল, এখন একটু কাজে এসেছি।
নিজের বুকের স্পন্দন যেন শুনতে পাচ্ছে শ্যামলাল। কী কাজ?
দু-সের ভালো ঘি চাই। কত দাম?
এও কি ভূমিকা, না শুধু এইটুকুই মাত্র বলতে এসেছে ঘাটোয়াল? আশায় আশঙ্কায় দুলতে লাগল শ্যামলালের মন। দু-সের ভালো ঘি? ওর আর দাম লিব না তোমার কাছ থেকে, হাজার হোক যখন দোস্তি হয়ে গেল।
খুশিতে ঘাটোয়ালের মুখ ভরে গেল। আচ্ছা, আচ্ছা, তব তো ঠিক হ্যায়। আজ থেকে তোমার আর পারানির পয়সা লাগবে না দোস্ত। আসল কথাটা কী জান? ঘি আমার জন্যে নয়, আমার বেটির বর আসবে, তাকেই…
তোমার বেটির বর? শ্যামলালের মাথার ওপর মস্ত একটা লাঠির ঘা এসে পড়ল, মাথাটা যেন চুরমার হয়ে গেল মুহূর্তে। কোন বেটি?
একটাই তো বেটি আমার। ওই রুকনি।
রুকনি! প্রতিধ্বনি করলে শ্যামলাল। কিন্তু এত ক্ষীণকণ্ঠে যে ঘাটোয়াল তা শুনতে পেল না। ঘাটোয়াল বলে চলল— শাদি তো হয়েছে দু-বছর বয়েসে, কিন্তু এতদিন গাওনা হয়নি কিনা, তা এইবারে নিতে আসবে। জামাই আমার খুব মানী লোক, হবিবপুর থানার সিপাহি। শনিবারে সে আসবে মেয়েকে নিতে। বলেছে একটু ভালো ঘিয়ের জোগাড় রাখতে।
নিস্পন্দ হয়ে রইল শ্যামলাল। হাতের চেটোয় আবার নতুন করে খানিকটা তামাক পাতা নিয়ে ঘাটোয়াল ডলতে লাগল, জামাই বড়ো ভালো লোক। খত পাঠিয়েছে চৌকিদারের সঙ্গে, মেয়েকে পাঠিয়েছে লালশাড়ি। লিখেছে গয়নাও নিয়ে আসবে। বরাত ভালো রুকনির, কী বল। দোস্ত?
হঠাৎ শ্যামলাল হেসে উঠল, জরুর।
কেমন সন্দিগ্ধ হয়ে তাকাল ঘাটোয়াল, হাসিটার অর্থ যেন ঠিক বুঝতে পারল না। তারপর জিজ্ঞাসা করলে, ঘি-টা কখন পাওয়া যাবে?
