উজ্জ্বল চোখে রুকনি বলল, চলো।
পাখির মতো হালকা মেয়েটা, এক হাতে তাকে তুলে নেওয়া চলে।
অনাবৃত আদিম পৃথিবীতে আদি অন্তহীন ঘাসের বন। অনাবৃত, অনায়োজন সহজ ভালোবাসা। আজ ঘরে ফিরতে অনেক রাত হয়ে গেল শ্যামলালের। কিন্তু আজ আর ভয় করল না, ভয় করল না জলার ওপরে তমিস্রাঘন রাত্রিকে। ঘন অন্ধকারেও তারার আলোয় এমন করে পথ দেখতে পাওয়া যায়, একথা কি আগে কোনোদিন জানতে পেরেছিল শ্যামলাল?
খেয়া পারাপার করে ঘাটোয়াল। পারানির পয়সা আদায় করে, ঝগড়া করে গোরুর গাড়ির গাড়োয়ানদের সঙ্গে। গাড়ি বেশি বোঝাই থাকলে ছ-আনার জায়গায় আট আনা আদায় করতে চায়, মুখচেনা থাকলে কখনো এগারো আনায় রফা করে দু-খানা গাড়িকে। কাঞ্চনের শান্ত নীল জলের ওপর দিয়ে অনবরত পারাপার করে ঘাটোয়ালের জোড়া নৌকো। আর আনে নবিপুরের বাজার থেকে তোলায় তোলায় গাঁজা, কখনো কখনো দু-চার বোতল তিরিশ লম্বর কা দারু। মদের মধ্যে এইটেই সবচেয়ে কড়া, আর এটা নইলে গাঁজাখোরের কড়া মগজে নেশা চড়তে চায় না।
ওদিকে পার হয়ে গেছে কৃষ্ণপক্ষ। ফালি ফালি করে আকাশে বড় হচ্ছে চাঁদ, ক্রমশ উজ্জ্বল হয়ে উঠছে ঘাসের বন, জ্যোৎস্নায় আশ্চর্য সুন্দর আলোছায়া নেচে যায় তার ওপর দিয়ে। বহুদূরের সাঁওতাল পাড়া থেকে নিশুতি রাত্রে বাঁশির সুর আসে, আসে মাদলের শব্দ। জল-মেশানো পাতলা মহিষের দুধের মতো রংধরা আকাশের তলা দিয়ে উড়ে যায় রাজহাঁসের ঝাঁক, খাঁটিয়ার ওপরে বসে বসে জাগ্রত স্বপ্ন দেখে শ্যামলাল।
মহিষগুলোকে এখনও আদর করে, যত্ন করতে চেষ্টা করে এখনও। কিন্তু সে-আন্তরিকতা আর নেই, এখন পরিষ্কার দ্বিমুখী হয়ে গেছে মনের গতিটা। যা নিয়ে এতদিন সে সম্পূর্ণ হয়েছিল, আজ মনে হয় তার ভেতরে কত বড়ো একটা ফাঁকি লুকিয়ে ছিল। এভাবে একা একা আর বাস করা চলে না, একা একা থাকা এখন অসম্ভব তার পক্ষে।
আজকাল আর অপেক্ষা করতে হয় না বিকেলের ছায়া ঘনানো পর্যন্ত। দুপুরের পরেই আসে রুকনি। নিরিবিলি ভূতের জাঙ্গালের পাশে ঘন সবুজ ঘাস স্নিগ্ধ নিবিড় আবরণ দিয়ে ওদের ঢেকে রাখে। এমনিতেই বুক পর্যন্ত ঘাস, মাথা উঁচু করে না দাঁড়ালে দেখতে পাওয়া যায় না। তার আড়ালে নিভৃত নিঃসঙ্গ অপরূপ অবকাশ।
সবুজ ঘন ঘাস। বিচিত্র একটা মিষ্টি গন্ধে ভরা। প্রজাপতি উড়ে আসে, উড়ে আসে ফড়িং; মাথার ওপর সকৌতুকে চক্র দিয়ে উড়ে যায় ওদের নিভৃত প্রেমের নিঃশব্দ সাক্ষী। রাজারাজড়াদের বিছানা কি এই সবুজ ঘাসের চাইতেও নরম?
শ্যামলালের বাহুতে নিজেকে এলিয়ে দিয়ে গুনগুন করে গান গায় রুকনি। শিরশির শরশর সোঁ সোঁ করে তার সঙ্গে সুর মেলায় ঘাসবনের গান। ভূতের জাঙ্গালের ওপরে শিমুলের ছায়াটা ঘন হয়ে আসতে থাকে, সূর্য পাটে নামে পশ্চিমের তালবনের ওপারে, এদিকে উঁকি মারে চাঁদের পান্ডুর রেখা। রুকনি ছাগল নিয়ে ফিরে যায় খেয়াঘাটের দিকে, লম্বা লাঠির ওপরে লাফ দিয়ে ঘরের দিকে রওনা হয় শ্যামলাল।
তারপর জ্যোৎস্নার মাতাল-করা সন্ধ্যা। একা একা খাঁটিয়ায় পড়ে ঝিমুতে অসহ্য লাগে এখন। অথচ উপায় নেই। ঘাটোয়ালকে বলা যাবে না, তেড়ে মারতে আসবে। অবশ্য মারামারিতে ভয় পায় না শ্যামলাল, কিন্তু তাতে কোনো ফয়দা হবে না। লাভের ভেতরে ঝামেলাই বাড়বে খানিকটা, ওতে করে রুকনিকে পাওয়া যাবে না।
একদিন রুকনির দুখানা সুডৌল হাত প্রাণপণে আঁকড়ে ধরলে শ্যামলাল।
চল পালিয়ে যাই।
রুকনি হাসল, কোথায়?
যেখানে খুশি, যতদূরে হোক। পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করব তোকে।
রুকনি তেমনি হাসতে লাগল, পারবে?
মাথার ভেতরে টগবগ করে রক্ত ফুটছিল শ্যামলালের। পারব না কেন? নিশ্চয় পারব। এই বাথান, এই ভৈঁসার পাল? এগুলোকে তো সবসুদ্ধ তাড়িয়ে দিতে পারবে না। ফেলে যেতে পারবে?
হাত দুটো আপনা থেকে ছেড়ে দিলে শ্যামলাল। এই মহিষের পাল। কত যত্ন, কত আশঙ্কা, কত সজাগ পরিচর্যা! মুখে যত সহজেই বলা যাক, মনের দিক থেকে অত জোর নেই তার।
তা ছাড়া যাবেই-বা কোথায়? এত বিরাট, এত বিপুল পৃথিবীতে কতটুকু জানে শ্যামলাল, কতটুকুই-বা তার চেনা? এই ঘাসের বন—সমুদ্রের মতো যার বিস্তার, ওই রাঙামাটির টিলাগুলো, দূরে দূরে তাল গাছ, আকাশে ছাড়া ছাড়া মেঘে সূর্যাস্ত-সূর্যোদয়ের রং, তাল গাছের মাথার ওপরে রুকনির হাসিভরা মুখের মতো উঁকি দেওয়া চাঁদ, কাঞ্চন নদী, খেয়াঘাট, আর দুরের নবিপুরের বন্দর—কী আছে এর বাইরেও সেখানে অপরিচয়, সেখানে এমন কি কিছু আছে যার ওপরে ভর দিয়ে সে দাঁড়াতে পারে নিজের পায়ে। গভীর রাত্রিতে এই দিগন্তসমাকীর্ণ মাঠের ভেতরে কেউ যদি পথ হারায় তাহলে যেমন আলেয়ার আগ্নেয়শিখা বিভ্রান্ত করে ঘুরিয়ে মারে তাকে, তেমনি করে সেই অচেনা জগৎ ঘুরিয়ে ভুলিয়ে মারবে তাকে। এবং সেই অন্ধকারে তাকে কি পথ দেখাতে পারবে রুকনি?
সংশয় কাটে না মনের ওপর থেকে।
তবু জোর করে জবাব দিলে শ্যামলাল, তোর জন্যে সব পারব।
আচ্ছা, ভেবে দেখো।
রুকনির চোখ তেমনি লীলামধুর কৌতুকে জ্বলজ্বল করছে। প্রতিবাদ করা উচিত, রুকনি বিশ্বাস করেনি বুঝতে পারছে শ্যামলাল; কিন্তু তবুও প্রতিবাদ করা চলে না। মুখে বলা সোজা, কিন্তু কাজটা নয়। ভয় আছে অপরিচিত অনাত্মীয় পৃথিবীর। সমস্ত নাড়িতে নাড়িতে জড়িয়ে আছে বাথানের প্রতি অন্ধ দুর্বলতা—সারাটা জীবন ধরে সবচাইতে একান্ত করে জেনেছে যাকে; আর আশঙ্কা আছে সেইসব আলেয়ার, রাত্রির অন্ধকারে নিথর কালো ঘন ঘাসবনে যারা অসতর্ক পথিককে বিভ্রান্ত করে ঘুরিয়ে নিয়ে বেড়ায়, কখনো কখনো-বা ডুবিয়ে মারে জলার হাতি-তলিয়ে-যাওয়া অথই কাদাজলের মধ্যে!
