সুখে-দুঃখে এমনি করে দিন কাটে। মাঝে মাঝে আসে নবিপুরের বাজার থেকে হিন্দুস্থানি ভগৎজি আর পাঁড়েজি, পাইকারি দরে ঘি কিনে নিয়ে যায়, ভেজিটেবল মিশিয়ে এক নম্বর ঘি বানিয়ে ছেড়ে দেয় বাজারে।
খোলা মাঠে, সবুজ ঘাসের জগতে দিন কাটে শ্যামলালের। ভালোই কাটছিল, কিন্তু একদিন গন্ডগোল বাঁধল ঘাটোয়ালের সঙ্গে।
কাঞ্চন নদীর ওপারে ছোটো খেয়াঘাটের সে ইজারাদার। নবিপুরের যাত্রী পার করে আদায় করে দু-পয়সা ধানের গাড়ি এলে ছ-আনা, খালি গাড়ি তিন আনা। কানে আংটি, ন্যাড়া মাথা আধবুড়ো লোক। সারাদিন গাঁজা খেয়ে চোখ লাল করে বসে থাকে, রোজগারপাতি মন্দ হলে খিটখিট করে বিশ্রী রকমে।
তা করুক, শ্যামলালের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল না বিশেষ। কিন্তু মহিষের পিঠে একদিন সবে নদী পার হয়ে ডাঙায় উঠেছে শ্যামলাল, এমনসময় এসে পথ আগলাল ঘাটোয়াল।
শ্যামলাল বললে, কেয়া হুয়া?
ঘাটোয়াল জবাব দিলে, পয়সা?
কীসের পয়সা?
পারানির।
পারানি! শ্যামলাল আশ্চর্য হয়ে গেল, নৌকায় পার না হলেও পয়সা?
জরুর। গাঁজার ঝোঁকে ঘাটোয়াল ব্যাখ্যা করে দিলে, এ ঘাট তার ইজারা। এ ঘাট যে পেরুবে, তাকেই পয়সা দিতে হবে। জমিদারের কাছ থেকে বহু টাকার ডাক দিয়ে ঘাট নেওয়া হয়েছে, ইয়ার্কি নয়। পয়সা জরুর দিতে হবে, তা নৌকোতেই পার হও আর ভৈঁসায় চেপেই চলে যাও।
বলা বাহুল্য যুক্তিটা শ্যামলালের ভালো লাগবার কথা নয়। মহিষের পিঠ থেকে তখনি সে লাফ দিয়ে পড়ল—মারামারি করবে। ঘাটোয়ালও তৈরিই ছিল, উরু চাপড়ে বললে, ত আও বাবুয়া!
ঘাটোয়ালের লোকজন মাঝে পড়ে ছাড়িয়ে দিলে। বিদায়লগ্নে দুজন পরস্পরের দিকে যে দৃষ্টিক্ষেপণ করলে তার অর্থ জলের মতো প্রাঞ্জল।
একজন মনে মনে বললে, ফিন ইধার আয়েঙ্গে তো…
আর-একজন স্বগতোক্তি করলে, এক বার ওদিকে যায়েগা তো…
আসতে আসতে গভীর ক্ষোভের সঙ্গে শ্যামলালের মনে হয়েছিল, কেন আজ সে লাঠিটা সঙ্গে আনেনি!
এই হল শত্রুতার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।
সন্ধ্যার মলিন ছায়ায় যখন ঘাসের বন ধরেছে কালো সমুদ্রের রূপ, তখন ঘরে ফিরল শ্যামলাল। আর ফিরে এসে দেখল, কখন কোন ফাঁকে দু-দিনের হারানো মহিষটা আপনা থেকেই বাথানে ফিরে এসেছে।
কষে মহিষটাকে একটা চাঁটি বসাল শ্যামলাল। গাল দিয়ে বললে, কাল থেকে বেঁধে রাখব। রাত্রে নিজের খাঁটিয়াতে শুয়ে শুয়ে একটা আশ্চর্য নতুন ভাবনায় আচ্ছন্ন হয়ে গেল মন। ঘাটোয়ালের মেয়ের ওপরে একটা অপরিসীম ক্রোধ আর বিরক্তি নিয়ে যে-চিন্তাটা শুরু হয়েছিল, কখন তার ধারাটা ঘুরে গেছে সম্পূর্ণ উলটো দিকে সেটা টেরই পায়নি শ্যামলাল। মন বলতে লাগল, ভারি সুন্দর তার মুখোনা, নদীর স্রোতের মতো তার হাসির শব্দ। ঘাসবনের নিরবচ্ছিন্ন শিরশির আর সোঁ সোঁ শব্দের মধ্যে পড়ন্ত রোদের শান্ত কোমল নির্জনতার একটা অপরূপ আবির্ভাবের মতো এসে দাঁড়িয়েছিল মেয়েটা।
সমস্ত রাত্রি ধরে ওই ছবিটা স্বপ্নসঞ্চার করতে লাগল তার ঘুমের মধ্যে। শ্যামলাল স্বপ্ন দেখতে লাগল— শত্রুর মেয়ের সঙ্গে ক্রমাগত সে ঝগড়া করে চলেছে।
পরের দিনটা আবার শুরু হল বাঁধা কাজের তাগিদে। চাকরগুলোকে দিয়ে দুধ-দোয়ানো, সেই দুধ জ্বাল দিয়ে ঘি-তৈরির বন্দোবস্ত। কাল সকালেই আসবে রামরতন ভগৎ, এক মন ঘি চাই তার।
কিন্তু বেলা যেই পড়ে গেল, যেই আকাশের ছাড়া ছাড়া মেঘে ধরল লালের রং, সঙ্গে সঙ্গে অকারণে চনমন করে উঠল বুকের ভেতরে। আগুনে পোড়া তামাটে রঙের বিশাল কঙ্কালের মতো ভূতের জাঙ্গালটা তার শিমুলের শাখা দুলিয়ে দূর থেকে হাতছানি দিলে তাকে। আজ মহিষ হারায়নি, সবগুলোই আছে চোখের সম্মুখে, তবু লম্বা লাঠিটা হাতে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল শ্যামলাল। আর রওনা হল সেদিকেই, যেদিকে হিংস্র আলাদ গোখুরের ভয়ে মানুষ এগোতে চায় না।
লাঠিতে ভর দিয়ে মাটির সঙ্গে শরীরটাকে সমান্তরাল করে একটা অর্ধবৃত্ত রচনা করে শূন্যের ওপর দিয়ে খালটা পার হয়ে গেল শ্যামলাল। দাঁড়াল এসে জাঙ্গালের নীচে। আর তখনি যেন ফিরে এল চৈতন্য, খেয়াল হল এ সে করেছে কী!
একে তো এই সাপের জাঙ্গালে আসা এমনিতেই বিপজ্জনক। তার ওপরে কাল যে মেয়েটি দৈবাৎ এখানে ছাগল চরাতে এসে পড়েছিল, আজও যে এখানে সে আসতে পারবে তার সম্ভাবনা কোথায়! তা ছাড়া শত্রুর মেয়ে।
ফিরে যাবে কি না ভাবতে ভাবতেই শ্যামলাল দেখলে কখন সেই বর্ষার জলনামা টিলার খাঁজে খাঁজে লাঠি আটকিয়ে উঠে বসেছে জাঙ্গালের মাথায়। এসে দাঁড়িয়েছে সেই শিমুল গাছটার নীচে, ঝরাপাতাগুলোর ওপরে। কিন্তু…
মুহূর্তে ম্লান হয়ে গেল মুখ, বিষণ্ণ হয়ে গেল চোখের দৃষ্টি। বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল নিরাশায়। তবু চেষ্টা করতে দোষ নেই। মুখে হাতটা চাপা দিয়ে অকারণেই বিশ্রী বাজখাঁই আওয়াজ তুললে শ্যামলাল, আঃ-আঃ-আঃ–
কিন্তু ডাকটা শেষ হওয়ার আগেই জলতরঙ্গের মতো উচ্ছল হাসির কলরোল ভেসে উঠল। এবারে আর ঘাসবনের ভেতরে নয়, ঠিক তার পেছনে, শিমুল গাছটার আড়াল থেকে।
চমকে পেছন ফিরল শ্যামলাল। বিশ্বস্ত পরিচিত গলায় বললে, এখানে উঠলে কেন? বড্ড সাপের ভয়।
রুকনি হাসল, এখানে না উঠলে তো দেখা যেত না তুমি আসছ কি না।
তাহলে ব্যাপারটা একতরফা নয়। শত্রুর মেয়েও তারই মতো ঝগড়া করবার প্রতীক্ষা করছিল, জাঙ্গালে উঠে দেখছিল শ্যামলাল আসছে কি না। চোয়াড় কাঠখোট্টা মুখে হাসি দেখা দিল। বলল, চলো, এখানে নয়, ঘাসবনের ভেতরে গিয়ে বসি।
