হাতের লম্বা লাঠিতে ভর দিলে শ্যামলাল, শরীরটাকে আকাশে ভাসিয়ে দিলে সরলরেখায়। তারপর মস্তবড়ো একটা অর্ধবৃত্ত রচনা করে সোজা লাফিয়ে পড়ল ঘাসবনের ভেতরে। এসে দাঁড়াল একেবারে মেয়েটার মুখোমুখি। ভয় পেয়ে দু-পা পিছিয়ে গেল মেয়েটা।
রূঢ়স্বরে শ্যামলাল হিন্দিতে বললে, এই, তুম কৌন হ্যায়?
শ্যামলালের হিন্দি শুনে মেয়েটা ফিক করে হেসে ফেলল। গোঁয়ারগোবিন্দ মানুষ, পাথরে গড়া শরীর, মেজাজ সম্প্রতি বিলক্ষণ চড়া! হাতে প্রকান্ড একটা পাকা বাঁশের লাঠি, ইচ্ছে করলে এই নির্জন ঘাসবনের ভেতরে পিটিয়ে ঠাণ্ডা করে দিতে পারে তাকে। আশ্চর্য, তবু ভয় পেল না মেয়েটা। স্বাভাবিক সংস্কারেই বোধ হয় কেমন করে জানতে পেরেছে লোকটা যত চোয়াড়ই হোক, সম্পূর্ণভাবে নিরাপদ তার পক্ষে।
জবাব দিলে, আদমি হ্যায়।
আরও চটে গেল শ্যামলাল, আদমি হ্যায় সে তো হাম জানতাই হ্যায়। তুম যে ভূত নেহি হ্যায়, সে হাম বুঝতে পারা থা। লেকিন হাসত কেঁও!
আশ্চর্য বুকের পাটা মেয়েটার। বললে, হামারা খুশি।
তাজ্জব লাগল শ্যামলালের। এই এক ফোঁটা মেয়ের দুঃসাহসের পরিমাণ দেখে রাগ। করতেও ভুলে গেল শ্যামলাল। জানতা হ্যায়, হাম কৌন?
হাম কথাটার উপর জোর দিলে শ্যামলাল, কৌন শব্দটা উচ্চারণ করলে বেশ দরাজ কণ্ঠে। কিন্তু এবারেও মেয়েটা তাক লাগিয়ে দিলে। তুম ঘোষ হো৷
আর রাগ করা চলে না, এবার অবাক হওয়ার পালা। হিন্দি ভুলে গিয়ে শ্যামলাল বললে, কী করে জানলে। মেয়েটা হাসতে লাগল, জবাব দিলে না।
আর তুম?
ঘাটোয়ালকা লেড়কি। রুকনি।
মুহূর্তে ভাবান্তর ঘটে গেল শ্যামলালের। বিস্ময়, কৌতূহল, সব কিছু মিলিয়ে গিয়ে ক্রোধে দপ করে জ্বলে উঠল রক্ত। তাই বলো। শত্রুর মেয়ে না হলে এমন বুকের পাটা হয়! এতক্ষণে সে কৌতুকভরা হাসিটা একটা নতুন অর্থ নিয়ে দেখা দিল তার কাছে।
রাগে বেশি কথা আর বেরুতে চাইল না মুখ দিয়ে। হাতের লম্বা লাঠিটাকে সামনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে শ্যামলাল বললে, ভাগো।
তারপর নিজেই আর অপেক্ষা করল না। লাঠির ওপর ভর দিয়ে এক লাফে উঠে পড়ল জাঙ্গালের ওপরে, আর একটা লাফে চলে গেল ওপারে। দুজনের মাঝখানে ব্যবধানের মতো মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রইল ভূতের জাঙ্গালটা। বাতাসে শোনা যেতে লাগল ঘাসবনের শিরশির আর সোঁ সোঁ শব্দ।
পশ্চিম আকাশে তালবনের মাথার ওপর দিয়ে ডুবছে সূর্য। আর দেরি করা চলে না, লম্বা লম্বা পা ফেলে ঘাসবন ঠেলে ঠেলে এগোতে লাগল শ্যামলাল। সমস্ত ক্রোধ, বিদ্বেষ, ক্লান্তি আর হতাশা ছাপিয়েও কী আশ্চর্য! সেই খিলখিল মিষ্টি হাসিটা অপূর্ব মাদকতার মতো ছড়িয়ে রইল তার চেতনার মধ্যে।
খেয়াঘাটের ঘাটোয়ালের ওপর জাতক্রোধ শ্যামলালের। ঘাটোয়ালকে এক বার কায়দামতো হাতের কাছে পেলে লাঠির মুখে তার মাথাটা গুঁড়িয়ে দেবে, পুঁতে দেবে জলার পানা আর গুঁড়ি কচুরির ভেতর, এইরকম একটা সাধু সংকল্প মনে মনে পুষে আসছে অনেক দিন থেকে। কিন্তু ঘাটোয়াল শ্যামলালের চাইতেও চালাক, সুতরাং এ-পর্যন্ত সুযোগটা আর ঘটে ওঠেনি।
এই নীরব নির্জন মাঠের মাঝখানে উল্লেখযোগ্য মানুষ বলতে এরা দুজন। সুতরাং শত্রুতার চেয়ে মিত্রতা হওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল বেশি, কিন্তু হয়নি।
ডুবা জলাজমি-বর্ষায় সমুদ্র। বর্ষার পরে ঘাসের জমি। সেও সমুদ্র, কিন্তু নীলচে ঘোলাজলের নয়, সবুজ ঘাসের। আদি অন্তহীন এমন একটা গোচারণভূমি সারা উত্তরবাংলার কোথাও নেই। এর একপ্রান্তে ছ-মাইল দূরে গ্রাম, আর একপ্রান্তে চার মাইল। মাঝখানে এই দশ মাইল জায়গাজুড়ে বিস্তীর্ণ প্রকৃতি-প্রাথমিক পৃথিবী। আর এরই ভেতরে প্রক্ষেপের মতো ঘাটোয়ালের ঘাট আর শ্যামলারের মহিষের বাথান।
চার-পাঁচ পুরুষ আগে হিন্দুস্থানি ছিল শ্যামলালেরা। কিন্তু সে-কৌলীন্য আর নেই এখন। মাতৃভাষার জায়গা দখল করেছে প্রাদেশিক বাংলা, কখনো কখনো তার ভেতরে বালিয়া জেলার এক-একটা বেখাপ্পা শব্দ উত্তরাধিকারসূত্রে অর্জিত। পিতৃপুরুষের ভাষা আর নেই, রুচিরীতিও বদলেছে, কিন্তু বদলায়নি পেশাটা।
এই দিগবিস্তার মাঠের ভেতরে মহিষের বাথান। মহিষের সংখ্যা কম নয়, ছোটো-বড়ো বাছুরগুলোসুদ্ধ প্রায় আঠারোটি। আগে আরও ছিল, তবে দু-বছর আগে মড়ক লাগাতে অনেকগুলো শেষ হয়ে গেছে। সেজন্যে শোকবোধটাও পুরোনো হয়ে গেছে। আপাতত ওই আঠারোটিকে নিয়েই খুশি আর পরিতৃপ্ত আছে শ্যামলাল।
প্রায় তিন মাইল এগিয়ে উঁচু টিলার ওপরে শ্যামলালের ঘর, চাকরদের আস্তানা, মহিষের গোয়াল। আপনার বলতে কেউ নেই, একান্তভাবে একা। কিন্তু ক্ষোভ নেই এই একাকিত্ববোধের জন্যে, বেদনাও নেই। এই মহিষগুলোকে নিয়েই তার দিন কাটে। বড়ো ভালো লাগে অতিকায় চেহারার অবোলা প্রাণীগুলিকে। জলার ঘাস খেয়ে নধর মসৃণ দেহ তাদের তৈলাক্ত স্বাস্থ্যে চকচক করে, তাদের স্নেহস্নিগ্ধ পরিতৃপ্ত চোখগুলির দিকে তাকিয়ে ভারি তৃপ্তি বোধ হয় শ্যামলালের। মায়ের মতো আদর করে সে, মহিষগুলোর গলার নীচে হাত বুলিয়ে দেয়, আরামে চোখ বুজে আসে তাদের। এত বড়ড়া বড়ো বিশালকায় পশুগুলোকে শিশুর মতো অসহায় বলে বোধ হতে থাকে।
আবার বর্ষায় আর একরকম। মাঠে তখন থইথই করে জল, মহিষগুলোর স্বেচ্ছাভোজনের পথ বন্ধ। বছরের সঞ্চিত পোয়ালগুলো দিয়ে ক্ষুন্নিবৃত্তি করতে হয়। কিন্তু অত বড়ো বড়ো পেট তাতে ভরে না, খড়ি-ওঠা চামড়ার নীচে দেখা যায় পাঁজরের হাড়, সারা গায়ে ডাঁশ আর এঁটুলি, পিঠের হাড়টা উঁচু হয়ে ওঠে তলোয়ারের ফলার মতো। ভারি কষ্ট হয় শ্যামলালের।
