শেয়াল নাহয় এগোয় না, কিন্তু আপাতত যা দেখা যাচ্ছে, না-এগিয়ে উপায় নেই শ্যামলালের। চোখ গিয়ে পড়ল মাঠের ওপারে প্রান্তরেখায়। সেখানে ম্লান হয়ে আসছে সূর্য। ছাড়া ছাড়া মেঘে রক্তাভ দীপ্তি। আর বেশি দেরি নেই। দেখতে দেখতে ধাঁ করে নেমে যাবে বেলাটা। তারপর মাঠের ওপরে ঘনাবে আলেয়া-জ্বলা কৃষ্ণপক্ষের অন্ধকার। সে-অন্ধকারে এই মাঠকে ভয় করতে থাকবে শ্যামলালের, নিজের লাঠির ওপরেও তার বিশ্বাস থাকবে না।
তবে আপাতত আকাশে সূর্য জেগে আছে এবং আস্থা আছে লাঠিখানার ওপরে। এক বার চোখাচোখি হয়ে গেলে যত জাঁদরেল আলাদ গোখুরই হোক, তাকে আর ট্যাঁ-ফোঁ করতে হবে না। অলক্ষ প্রতিদ্বন্দ্বীর সম্ভাবনা কল্পনা করতেই কাঁধের পেশিগুলো ফুলে উঠল শ্যামলালের। নীচের ঠোঁটটাকে এক বার সে শক্ত করে চেপে ধরলে দাঁত দিয়ে, তারপর নির্ভীক পায়ে এগিয়ে চলল জাঙ্গালের উদ্দেশে। ওর ওপর থেকে ভালো করে চারদিকটা এক বার দেখে নেওয়া দরকার।
সন্তর্পণে মাটির দিকে চোখ রেখে শ্যামলাল উঠল জাঙ্গালে। কাঁকরগাঁথা শক্ত মাটির গা দিয়ে বর্ষার জল গড়িয়ে গড়িয়ে নামে, তাই তার সর্বাঙ্গে কতকগুলো খাঁজের মতো সৃষ্টি হয়েছে। সেই খাঁজের ভেতরে লাঠি ফেলে ফেলে শ্যামলাল উঠতে লাগল।
একটা শিমুল গাছের নীচে এসে সে দাঁড়াল। তলায় মসৃণ তকতকে মাটি, যেন যত্ন করে নিকিয়ে রাখা। দুটি-চারটে শিমুলের ঝরাপাতা ছাড়া আর কিছুই নেই। এখানে আর যা-ই হোক, ফস করে সাপে এসে ছোবল মারতে পারবে না।
চারদিকে তাকাতে একটা আশ্চর্য আর অপরূপ পৃথিবী ধরা দিল শ্যামলালের চোখে। সবুজ আর সবুজ—ধান নয়, ঘাস। বর্ষার জল নেমে গেছে জলা থেকে, নরম মাটির ওপরে স্তবকে স্তবকে গুচ্ছে গুচ্ছে ঘন সবুজ ঘাস উঠেছে, মাটিকে ঢেকে দিয়েছে। যতদূর চোখ যায়, এর আর শেষ নেই, ছেদ নেই। কোথাও ঢেউ-খেলানো জমি নেমে গেছে, কোথাও আস্তে আস্তে উঠে গেছে পাহাড়ের মতো অনেকখানি, মাথার ওপর হাতছানি দিচ্ছে তালের গাছ। সবুজ আর শান্ত, বিকেলের পড়ন্ত বেলা নিবিড় হয়ে আসছে, পাখপাখালির শব্দ নেই, শুধু বাতাসে একটা শিরশির আর সোঁ সোঁ স্বনন বাজছে।
ওরই মাঝখানে সাদা সাপের মতো আঁকাবাঁকা একটা রেখা, ডুবে আসা রোদে এখন সোনার মতো ঝলমলে। এই নদীটা কাঞ্চন। ওর গায়ে খান কয়েক চালাঘরের আভাস, একটা লম্বা বাঁশের ওপর মহাবীরজির লালপতাকা। অস্ফুটস্বরে শ্যামলাল বললে, শালা!
কিন্তু মহিষটার কোনো চিহ্নই তো দেখা যাচ্ছে না।
হঠাৎ গলা ফুলিয়ে একটা বিশ্রী আওয়াজ তুলল শ্যামলাল। তার কর্কশ আওয়াজটা চারপাশের শান্ত স্তব্ধতাকে বিদীর্ণ করে দিলে। বাতাসের তরঙ্গে তরঙ্গে ছড়িয়ে ছড়িয়ে পড়তে লাগল লহরে লহরে। শিমুল গাছের মাথার ওপর থেকে ভয়ার্ত দুটো বক ডানা মেলে দিলে আকাশে।
শ্যামলাল ডাকলে, আঃ আঃ আঃ–আঃ ইঃ–।
এক বার, দু-বার, তিন বার। কিন্তু দিগন্তবিস্তার ঘাসের বনে কোনোখানে এতটুকু সাড়া পাওয়া গেল না। শুনতে পাওয়া গেল না পরিচিত গম্ভীর গলার মৃদু প্রত্যুত্তর। এমন তো হয় না। শ্যামলালের মন আশঙ্কায় আচ্ছন্ন হয়ে উঠল। বাথানের সবচাইতে দুধেল মহিষ, খোয়া গেলে সর্বনাশ। কিন্তু গেল কোথায়?
শালা। মহিষটার বাপ-মা তুলে একটা অশ্লীল গাল দিলে শ্যামলাল। তারপরে আবার তারস্বরে ডাকলে, আঃ আঃ আঃ…
এবার ডাকটা শেষ করবার আগেই শ্যামলাল চমকে থেমে গেল। সাড়া পেয়ে গেছে; কিন্তু মহিষটার নয়। একটা অপ্রত্যাশিত শব্দ-কাছাকাছি কোথায় কে যেন খিলখিল হাসিতে ভেঙে পড়ল।
পাথরের মতো শক্ত জোয়ান, বাইশ বছরের নির্ভীক গোঁয়ার মানুষটার বুকের ভেতর ধক করে চমক লাগল। এই নির্জন মাঠের ভেতরে এমন করে কে হাসল? সন্ধ্যা হয়ে আসছে, শ্যামলাল দাঁড়িয়ে আছে ভূতের জাঙ্গালের ওপরে। চারদিকে জনপ্রাণীর সাড়া নেই, এমন সময় কে হাসতে পারে?
সারা শরীরটা নিজের অজ্ঞাতেই শিউরে উঠল এক বার। শক্ত মুঠোয় শ্যামলাল আঁকড়ে ধরলে লাঠিগাছকে। ভূত হোক, অপদেবতা হোক, বিনা যুদ্ধে কাউকে আমল দেওয়া হবে না। দু-চার ঘা লাঠি আগে হাঁকড়াতে হবে। তারপরে যা হওয়ার হোক।
আবার হাসির শব্দ শোনা গেল, খিলখিল করে মিষ্টি হাসি। একটু আগেই যে কর্কশ শব্দ তুলে সমস্ত মাঠখানাকে ভরিয়ে তুলেছিল শ্যামলাল, এরসঙ্গে তার কোনো মিল নেই। এ যেন শান্ত স্তব্ধ পৃথিবীকে গানে আর সুরে উল্লসিত করে দিলে। শ্যামলালের মন বললে, ভয় পাওয়ানোর হাসি এ নয়, খুশি করে তোলার; এমন হাসি আর যে-ই হাসুক, ভূতে হাসতে পারে না।
অনুমান নির্ভুল। এতক্ষণ দূরে দূরে দৃষ্টিটাকে ছড়িয়ে রেখেছিল বলেই কি এত কাছের জিনিসটা দেখতে পায়নি শ্যামলাল? জাঙ্গাল থেকে কয়েক-পা এগিয়েই ঘাসবনের ভেতর একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে। হিন্দুস্থানি মেয়ে, কানের বড়ো বড়ো রুপোর গয়না দুটো দেখেই তা বুঝতে পারা গেল। মাথায় লালশাড়ির ঘোমটা তোলা, কালো সুছাঁদ মুখোনা সকৌতুক মিষ্টি হাসিতে উজ্জ্বল। তার পাশেই লটপটে-কান একটা রামছাগলের মুখ চোখে পড়ছে। সেটাও যেন শ্যামলালের দিকে তাকিয়ে আছে কৌতুকভরা ভঙ্গিতে।
গোঁয়ার শ্যামলালের ব্রহ্মরন্ধ্র পর্যন্ত রাগে জ্বলে উঠল। মহিষটা পাওয়া যাচ্ছে না, তারজন্যে একেই মেজাজ বিগড়ে আছে, তার ওপরে এইরকম মর্মান্তিক ঠাট্টা! কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে পড়বার মতো অনুভূতি হল শ্যামলালের। তা ছাড়া আচমকা ভয় পাইয়ে মেয়েটা যেভাবে তাকে অপদস্থ করে দিয়েছে, সেটাও ক্ষমাযোগ্য অপরাধ নয়।
