ইচ্ছে হল বলি, কালোবাজারি করে কয়েক লাখ টাকা তুমি জমিয়েছ, কাবলুকাকাই হচ্ছে তোমার আসল দাওয়াই। কিন্তু অনর্থক ঝগড়া করে কী হবে?
ঘণ্টাদা মুড়িঘণ্টর মতো মুখ করে বললে, তবে সেই দুর্ধর্ষ খাটখানা আছে, আর দুর্ধর্ষ ছারপোকা আছে। এখন ওরা যদি ম্যানেজ করতে পারে–তবেই।
–হ্যাঁ, আপাতত ওরাই তোমার ভরসা। বলে ঘণ্টাদার কাছ থেকে আমি বিদায় নিলুম।
সকালে উঠে সবে লজিকের বই খুলে বসেছি। কী যে মুস্কিল– ওই বারবারা সিলারেন্ট আমার কিছুতেই মনে থাকে না।
হঠাৎ দ্বারপ্রান্তে– ঘণ্টাদা।
ঘণ্টাদার মুখখানা তখন ডিমের কারির মতো হয়ে গেছে। কেঁদে ঘণ্টাদা বললে– প্যালা, সর্বনাশ হয়েছে। এবার আমার ফাঁসি হবে।
বলল কী? খাওয়ার বহর দেখে রেগেমেগে তুমি কাবলুকাকাকে খুন করে ফেলেছ নাকি?
–জানিস তো, আমি একটা আরশোলাও মারতে পারিনে।
তা হলে খামকা তোমার ফাঁসি হবে কেন?
বরাত প্যালা– স্রেফ বরাত। কাবলুকাকা মারা গেছেন।
–অ্যাঁ।
তা ছাড়া কী আর? ওই দু কোটি ছারপোকা, জানিস তো? ওদের হাতে কারও রক্ষা আছে? নির্ঘাত ওদের কামড়ে কাবলুকাকা পটল তুলে বসেছেন। এই দ্যাখ না– সকাল থেকে দুঘণ্টা দরজায় ধাক্কা দিয়েছি, জানলার ফাঁক দিয়ে পিচকিরি করে বরফ জল দিয়েছি। গায়ে, তবু নট নড়নচড়ন, কিসসু না।
–তবে পুলিশে খবর দাও!
–পুলিশ! ওরে বাবা! এমনিতেই ওরা দুবার আমার বাড়ি সার্চ করেছে, আমি নাকি চায়ের সঙ্গে চামড়ার কুঁচো মেশাই। এখনও ধরতে কিছু পারেনি বটে, কিন্তু নেকনজরটা তো আছে! নির্ঘাত বলবে, চক্রান্ত করে এই ভয়ঙ্কর খাটিয়ায় শুইয়ে আমি কাবলুকাকাকে খুন করিয়েছি। তখন ফাঁসি না হোক– বিশ বছর জেল আমার ঠেকায় কে?
তোমাকে জেলে রাখলে দুনিয়ার অনেক উপকার হবে আমি মনে-মনে বললুম। মুখে সাহস দিয়ে বললুম– চলো দেখি, যাই একবার। বুঝে আসি ব্যাপারটা।
যেতে যে আমার পা সরছে না, প্যালা।
–তবু যেতেই হবে। আমি কঠোর হয়ে বললুম- সেই ভয়াবহ খাটে শোয়াবার সময় মনে ছিল না? চলো বলছি– আমি প্রায় জোর করে ঘণ্টাদাকে টেনে নিয়ে গেলুম।
কিন্তু বসবার ঘরে ঢুকে আমরা ভূত দেখলুম।
ভূত নয়– সশরীরে কাবলুকাকা বসে। সামনে একটা কাচের গ্লাস– তাতে আধ সের আন্দাজ গাওয়া ঘি। একটু একটু করে পরম আরামে চুমুক দিচ্ছেন কাবলুকাকা।
আমাদের দেখেই তিনি হাসলেন। বললেন, এই যে ঘণ্টা–কোথায় গিয়েছিলি? আঃ কাল রাতে যা ঘুমিয়েছি– সুপার্ব। তাই উঠতে আজ একটু দেরিই হয়ে গেল।
ঘণ্টাদা একবার হাঁ করল। কিন্তু মুখ দিয়ে কোনও আওয়াজ বেরুল না তার।
কাবলুকাকা ঘিয়ের গেলাসে চুমুক দিয়ে বললেন– চর্বি একটু বেশি হয়েছে শরীরে রাত্তিরে তাই ভালো ঘুম হয় না। কেমন গা জ্বালা করে। কিন্তু কাল সারারাত কারা যেন মোলায়েমভাবে গা চুলকে দিয়েছে। সে কী আরাম। এক বছরের মধ্যেও আমার এমন নিটোল ঘুম হয়নি। তাই উঠতে একটু দেরিই হয়ে গেল আজ। আমি ভাবছি কী জানিস ঘণ্টা– তিন দিন কেন, মাসখানেকই থেকে যাব তোর এখানে।
হঠাৎ গোঁ-গোঁ করে আওয়াজ। ঘণ্টাদা পপাত ধরণীতলে।
–কী হল? ঘণ্টার আবার মৃগী আছে নাকি?
আমি বললুম- মৃগী নয়। আপনি একমাস ওর কাছে থাকবেন জেনে আনন্দে মূর্ছা গেছে।
ঘাসবন
হাতের লম্বা লাঠিটার ওপর ভর দিয়ে শরীরটাকে ঝুঁকিয়ে দিলে সামনের দিকে; তারপর সেই অবস্থাতেই একটা লাফ দিলে শ্যামলাল। সঙ্গে সঙ্গে লাঠির মাথা আর শরীরটার একটা নির্ভুল সমকোণ রচনা করে শূন্যে উড়ন্ত একটা পাখির মতো ছোটো নালাটা সে পার হয়ে গেল। লাঠির নীচেটা গিয়ে পড়েছিল জলের মধ্যে, সেটাকে তুলে নিতে বেশি সময় লাগল না।
কোমর সমান নরম ঘাসের ভেতর দাঁড়িয়ে সে উৎকর্ণভাবে তাকাতে লাগল চারদিকে। হাতের একটা মুঠোকে চোঙার মতো গোল করে ধরলে চোখের সামনে, যেন ওতে আরও বেশি করে দেখতে পাবে। কিন্তু দিগদিগন্তজোড়া ঘন শ্যামল ঘাসবনের মধ্যে কোথাও দেখা গেল না আকাশের কোণে আঁকা গাঢ় নীলরঙা তিন পাহাড়ের রেখার মতো একটা পিঠের আভাস কিংবা শিংওয়ালা অতিকায় মাথাটা।
একটু দূরেই সবুজ তৃণপ্রান্তরের মাঝখানে আকস্মিক ব্যতিক্রমের মতো খানিকটা রাঙামাটির জাঙ্গাল বিকীর্ণ হয়ে আছে। হঠাৎ দেখলে মনে হয় কেউ যেন মস্ত উঁচু করে একটা রাস্তা তৈরি করতে চেয়েছিল এখানে, কিন্তু যে-কারণেই হোক তার ইচ্ছাটা সম্পূর্ণ হয়নি। প্রাকৃতিক হোক আর ভুলে-যাওয়া কোনো মানুষের হাতের কাজেই হোক, এখন ওর নাম ভূতের জাঙ্গাল। কঠিন লালমাটি, ছোটো-বড়ো অসংখ্য কাঁকরে একেবারে বোঝাই। কেউ যেন আগুনে পুড়িয়ে মাটিটাকে লোহার মতো শক্ত আর নীরস করে দিয়েছে; তাই গোটা দুই শিমুল ছাড়া আর কিছু গাছগাছালি গজাতে পারেনি, হাঁ হাঁ করছে ন্যাড়া জাঙ্গাল। শুধু সর্বাঙ্গে জলার হিংস্রতম সাপ আলাদ গোখুরের ফোকর নিয়ে পড়ে আছে অতিকায় একটা কঙ্কালের মতো, আর তারই চারপাশে সবুজের ঐশ্বর্য ঢেউয়ে ঢেউয়ে দোলা খাচ্ছে।
কপাল কুঁচকে এক বার জাঙ্গালটার দিকে তাকাল শ্যামলাল। উঠবে নাকি ওর ওপরে? সুবিধে হয় তাহলে, চারদিকের অনেকটা ভালো করে দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু উঠতেও ভরসা হয় না। সবাই জানে জাঙ্গালটা গোখরো সাপের আস্তানা, তাদের ভয়ে একটা শেয়াল পর্যন্ত এগোয় না জাঙ্গালের দিকে।
