ভূপতির দৌলতখানা এর মধ্যে আবার একটু একটেরে। রাস্তার ওধারে হঠাৎ-বড়োলোক ঘোষবাবুদের নতুন লালবাড়িটা ছাড়া নিকট প্রতিবেশী কেউ নেই আর। ঘোষবাবুদের ছোটোছেলে করুণাসিন্ধু অবশ্য মাঝে মাঝে করুণাবৃষ্টি করতে চায়। কিন্তু নানা কারণে সেটা পছন্দ করতে পারে না ভূপতি, তার স্ত্রী বিভা এবং বিভার ছোটোবোন প্রাইভেটে আইএ পরীক্ষার্থিনী আভা।
পড়শিকে হাঁকডাক করতে হলে অবশ্য করুণাসিন্ধুকেই ডাকতে হয়। কিন্তু… ডাকলে তারও কি এখন সাড়া মিলবে? খানিকক্ষণ কান পেতে শুনল ভূপতি। টিনের চালের ওপর বৃষ্টির ঝিমঝিমে আওয়াজ। বাইরের আমলকী গাছটার শিরশিরানি। পেছনের ডোবায় ব্যাঙের আনন্দধ্বনি।
ঘর ছেড়ে ওই মোটা মোটা কোলা ব্যাংগুলোর সন্ধানে কেন যায় না সাপটা? ভূপতির মনে কূট জিজ্ঞাসা উদিত হল। বিভা চেঁচিয়ে উঠল, কী আশ্চর্য, একেবারে পাথর হয়ে বসে রইলে যে! কিছু-একটা করো। মারা যাব নাকি সাপের কামড়ে?
কী হয়েছে দিদি? তখন থেকে সমানে চেঁচামেচি করছিস কেন? দরজার বাইরে আর গলা পাওয়া গেল। পাশের ঘর থেকে এতক্ষণে টের পেয়েছে আভা—উঠে এসেছে।
বিভা আর্তস্বরে বললে, ঘরে সাপ!
কী সাপ?
ভূপতিই জবাব দিলে। নিজের অজ্ঞাতেই এক পোঁচ রং চড়িয়ে ফেলল বিভার বর্ণনায়। মস্ত খরিশ। পাঁচ হাত লম্বা।
তাতে কী হয়েছে? দাঁড়াও আমি লাঠি নিয়ে আসছি।
দুপ দুপ করে আভার চলে যাওয়ার আওয়াজ শোনা গেল।
গরিব বোনের গলগ্রহ, দু-বেলা খেতেও পায় না পেটপুরে। তারপরে আছে একটা এম ই স্কুলের হাড়ভাঙা চাকরি। তবু আশ্চর্য সতেজ আর সুস্থ এই আঠারো-উনিশ বছরের মেয়েটা। আরও আশ্চর্য, আভা রূপবতী। এই বিবর্ণ বিষণ্ণ আনন্দ থেকে কেমন করে এমন প্রাণ আর স্বাস্থ্যকে আহরণ করে, কে বলবে
একটু পরেই দরজায় বাঁশ ঠোকার শব্দ। আভা অস্ত্র সংগ্রহ করে এসেছে।
দরজা খোল দিদি।
খাট থেকে নামতে পারছি না যে! বিভার হতাশ আর্তনাদ, তলাতেই কুন্ডলী পাকিয়ে আছে। নীচে পা দিলেই যদি ছোবল মারে?
বুঝেছি।
ওপাশ থেকে ধাক্কা দিতেই কপাটের জোড় একটু ফাঁক হয়ে গেল মাঝখানে। তার ভেতরে আঙুল চলিয়ে ভেতরের খিলটা খুলে ফেলল আভা। এবাড়ির ঘর-দরজা সবই তার নাড়িনক্ষত্রে জানা।
এবারে নড়েচড়ে উঠল ভূপতি।
এই আভা, কী হচ্ছে ওসব পাগলামি। মস্তবড় সাপ। বরং পাড়ার লোকজন ডেকে…
একটা সাপ মারবার জন্যে সাত পাড়া জড়ো করতে হবে! তুমি পুরুষ মানুষের নাম। ডোবালে ভূপতিদা।
দরজা ঠেলে সদর্পে আভা ঢুকল। গাছকোমর বাঁধা, হাতে একটা বাঁশের টুকরো।
আভা, মুখপুড়ি, সর্বনাশ করবি তুই! তারপরে বিভা ককিয়ে উঠল বেরো, বেরিয়ে যা ঘর থেকে।
কিন্তু সেসব শোনবার পাত্রী আভা নয়। ততক্ষণে সে উবু হয়ে খোঁচা দিয়েছে খাটের তলায়। বিভার একরাশ হাঁড়িকুড়ি ঝনঝনিয়ে উঠল, তারপরেই ফোঁস করে একটা হিংস্র আওয়াজ।
বিভা পৈশাচিক আর্তনাদ তুলল, ভূপতির গলা দিয়ে বেরুল খানিক অর্থহীন জান্তব ধ্বনি। তারপরেই তক্তাপোশের আরেক প্রান্তে খোলা জানালা বেয়ে আবির্ভূত হল একটি নিকষ কালো গোখরো সাপ। লণ্ঠনের আলোয় তার চক্রাঙ্কিত ভয়ংকর সুন্দর দেহটা ঝিকমিকিয়ে উঠল।
মাঝখানে চৌকির ব্যবধান, আর তার ওপরে বসে সমানে চিৎকার করছে স্বামী-স্ত্রী। আভা খানিকক্ষণ যেন হতভম্ব হয়ে রইল, তারপর চৌকির পাশ ঘুরে সাপের গায়ে আঘাত করার আগেই জানালার বাইরে সেটা নেমে গেল আগাছা-ভরা ছাইগাদার ভেতরে।
আভা ক্ষুব্ধ হয়ে বললে, পালাল। চেঁচিয়েই তোমরা সব মাটি করে দিলে। নইলে…
এতক্ষণে ধড়ে প্রাণ এসেছে বিভার। সশব্দে জানালাটা বন্ধ করে দিয়ে বললে, খুব হয়েছে—থাম! মেয়ের কী দুঃসাহস বাবা! যে-সাপের চেহারা দেখে জোয়ান মানুষের বুক কাঁপে, একটা ভাঙা বাঁশ নিয়ে উনি তাই মারতে গেছেন। যদি ফসকে যেত তাহলে?
ফসকাত না।
নাঃ, ফসকাত না। মস্ত এক লাঠিয়াল এসেছেন উনি! যা, এখন ঘরে গিয়ে শো, খুব বাহাদুরি দেখানো হয়েছে।
ও, ভালো করলাম কিনা? নিজেরা তো ভয়ে হার্টফেল করার দাখিল হয়েছিলে! ক্ষুন্ন। বিষণ্ণ মুখে আভা বেরিয়ে গেল।
একটা বুকচাপা নিশ্বাস ছেড়ে ভূপতি এতক্ষণে বিড়ি ধরাতে পারল ধীরেসুস্থে।
উঃ, এক নম্বরের ডাকাত হয়েছে মেয়েটা!
ডাকাত বলে ডাকাত। ও দরকার হলে মানুষ মারতে পারে! বিভা সায় দিলে। তারপর পড়ল ভূপতিকে নিয়ে। তবু তো ও-ই এসে সাপটা বের করে দিলে ঘর থেকে। আর তুমি পুরুষ মানুষ হয়ে…
বা রে, আমি কী করব! ঘরের বাইরে থাকলে আমিও…
ঢের হয়েছে, চুপ করো! আর তোমাকে আমি বার বার বলিনি আস্তাকুঁড়ের ওদিককার জানালাটা খুলে রেখো না? খানাখন্দল ঝোপঝাড় আছে, চাই কী চোরে হাত বাড়িয়ে গলার হারটারও টেনে নিতে পারে। তা বাবুর গরম লাগে! এখন হল তো? বাদলা পেয়ে সাপ এসে ঢুকেছিল, যদি আমি ঠিক সময়মতো টের না পেতাম তাহলে…।
বিভার আত্মস্তুতি শেষ হল না। তার আগেই বাইরের বারান্দায় জুতোর শব্দ শোনা গেল, আর তার সঙ্গে এল ভরাট গলার ডাক, ভূপতিবাবু, ভূপতিবাবু।
বিভা ফিসফিসিয়ে বললে, করুণাসিন্ধু।
এস্ত উঠে পড়ল ভূপতি, কাপড়ের কষিটা বেঁধে নিয়ে সসম্রমে বাইরের দিকের দরজা খুলে দিলে।
আসুন আসুন। গায়ে বর্ষাতি ফেলা, হাতে বন্দুক, নাটকীয়ভাবে করুণাসিন্ধু প্রবেশ করলে। ঘোমটা টেনে মুখ ফিরিয়ে বসল বিভা। লোকটার চাউনি ভালো নয়, মদও খায় এক-আধটু, গায়ে পড়ে আলাপ করতে চায়। কিছুদিন থেকে কারণে-অকারণে বড়ো বেশি খোঁজ করছে সে। বিভার মনে একটা গভীর সন্দেহ জেগেছে, অত্যন্ত বিব্রত হয়ে উঠেছে ভূপতিও।
