কিন্তু সাত দিন। অত দেরি হবে না স্যার, কাল ভোরে যদি এসে পৌঁছে যান–আসবেনই-তা হলে সকাল সাতটার মধ্যেই আমার আত্মার উন্নতি কমপ্লিট প্রাণ দেহ ছেড়ে লাফিয়ে বেরিয়ে যাবে। একবার ভেবেছিলাম বাসা বদলাই, কিন্তু গুরুদেবের যে রোখ দেখলুম কলকাতার যেখানে যাব, সেখানেই খুঁজে বের করবেন, আর বলতে থাকবেন : জীবাত্মার পর পরমাত্মা-কিনা ব্ৰহ্ম! না স্যার, আর নয়–আজ রাত্রেই আমি চলে যাব আসানসোলে, কাল থেকে মামার দোকানে কাটলেটই ভাজব।
শুনে আমি বললাম, তা ভেবে দেখতে গেলে উনি তো ভালোই চান। এই সব পকেট-মারা চুরি-চামারি-এতে করে তোমার আত্মা তো
আত্মা পর্যন্ত বলার ওয়াস্তা। চোখ দুটো গোল করে তড়াক করে লাফিয়ে উঠল তখুনি।
–অ্যাঁ দাদা, আপনিও। আর আপনাকে আমি সদাশয় ভেবেছিলাম।
বলেই টেনে দৌড়। প্রায় ত্রিশ মাইল স্পিডে। একলাফে পার্কের রেলিং পেরিয়ে হাওয়া।
তা মন্দ না–আমি ভাবলুম। এই রেটে যদি ছুটতে পারে, তা হলে ট্রেনের দরকার হবে আর, ঘণ্টা পাঁচেকের মধ্যেই পৌঁছে যাবে আসানসোলে।
গোখরো
চেঁচিয়ে উঠল বিভা। সজোরে ভূপতিকে ধাক্কা দিয়ে বললে, শুনছ, সাপ!
ওভারটাইম খেটে ভূপতি ফিরেছে রাত সাড়ে দশটায়। ঘুমে আর ক্লান্তিতে ধসে-পড়া বাড়ির মতো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ শিথিল হয়ে আছে তার। তুলোয়-গিট-ধরা চ্যাপটা বালিশটা থেকে মাথা বেকায়দায় সরে গিয়ে এক-আধটু নাক ডাকছিল বটে, তবু অচেতনার একেবারে গভীর অতলে নিমগ্ন হয়ে ছিল সে। সাপ তো সাপ, এই সময়ে একটা রয়াল-বেঙ্গল তাকে মুখে করে তুলে নিয়ে গেলেও জানবার সম্ভাবনা ছিল না ভূপতির।
কিন্তু বিভা রয়াল-বেঙ্গলের চাইতেও মারাত্মক। তারপর গত বছর আট মাসের ছেলেটা মরে যাওয়ার পর থেকে অদ্ভুত হিংস্র হয়ে আছে সে। কিছুদিন আগেও মিষ্টি মিনমিনে বউ বিভাকে যারা দেখেছে, আজ আর তারা তাকে চিনতেও পারবে না। বাঁশির মতো গলা এখন কাঁসির মতো প্রখর এবং প্রবল, শান্ত ঠাণ্ডা মেজাজ এখন যেন বিস্ফোরক দিয়ে তৈরি। অতএব অতলান্ত বিরাম থেকে আস্তে আস্তে ভূপতি চেতনার সীমান্তে ভেসে উঠতে লাগল।
ঘরে যে সাপ ঢুকেছে, শুনছ না? মরেছ নাকি? বিভার গলা ঝনঝন করে বেজে উঠল। জোরে ধাক্কা দিতে গিয়ে হাতের নোয়াটার একটা মোলায়েম আঘাত লাগল ভূপতির পিঠে।
উ-হু-হুঁ! মরলে তো বেঁচে যেতাম! ভূপতি ধড়মড়িয়ে উঠে বসল, কই সাপ?
আমার পায়ের ওপর দিয়ে নেমে গেল। হিম ঠাণ্ডা! খাটের তলায় ঢুকেছে বোধ হয়।
গৌরবে খাট, আসলে মাঝে মাঝে তক্তার জোড় খুলে-যাওয়া, নড়লে-চড়লে শব্দমুখর পুরোনো একটি তক্তাপোশ। আর তলায় টিনের তোরঙ্গ, থালাবাটি আর খুঁটিনাটি গৃহস্থালির একটি বিশুদ্ধ সুন্দরবন। মশা, আরশোলা আর নেংটি ইঁদুরের মনোরম উপনিবেশ। তার ভেতর সাপ যদি আশ্রয় নিয়ে থাকে, তা হলে তাকে খুঁজে বের করা আস্তিকেরও অসাধ্য।
কিন্তু সমস্যাটা অন্যত্র।
হাত বাড়িয়ে পাশের ছোটো টিপয়ের ওপর রাখা লণ্ঠনটাকে উজলে দিলে ভূপতি। ম্লান। মুখে বললে, খাটের তলায়? কী হবে তাহলে?
বের করে পিটিয়ে মারো! নইলে অন্তত হুড়োতাড়া দাও, পালিয়ে যাক। খাটের নীচে সাপ নিয়ে বসে থাকব, বলো কী গো! মাঝরাত্তিরে যদি ফোঁস করে অলক্ষুণে কথা আর শেষ করতে পারল না বিভা। অ্যানিমিয়ায় হলদে শীর্ণ মুখে পাঁশুটে ঠোঁট দুটো কাঁপতে লাগল একটু একটু।
ভয়ে এতক্ষণে ভূপতিও কাঠ হয়ে গেছে। চোখভরা ঘুম ঊর্ধ্বশ্বাসে প্রায় আসানসোল পার। ফিসফিস করে বললে, কী সাপ?
আতঙ্কের মধ্যেও বিরক্তিতে বিভা খিচিয়ে উঠল, কী সাপ আমি দেখেছি নাকি? খরিশ টরিশ হবে বোধ হয়। শোল মাছের মতো মোটা, লম্বাও হবে হয়তো হাত চারেক।
হাত চারেক! খরিশ!
কই, কী করবে? অধৈর্য বিভার জিজ্ঞাসা।
নিরুপায় ভূপতির এইবার খেঁকিয়ে ওঠার পালা।
কী করব? খাট থেকে নামতে যাই আর তলা থেকে বসিয়ে দিক আমার পায়ে! তখন?
তাইতো, একথাটা বিভার মনে হয়নি। এবারে কান্না এল তার গলায়।
ওগো, তবে কী হবে? সারারাত এমন সাপ কোলে নিয়ে বসে থাকব?
উপায় তো কিছু দেখছি না। সকাল হোক, আপনিই বেরিয়ে যাবে ঘর থেকে। এটুকু সময় নয় বসে বসেই কাটানো যাক।
এটুকু সময়! সবে গোটা বারো এখন। অসুস্থ দুর্বল শরীর নিয়ে সারাদিন সংসার ঠেলেছে বিভা, ওভারটাইম খেটে প্রায় অ্যাম্বুলেন্সে চেপে ঘরে ফিরেছে ভূপতি। এই অবস্থায় দুজনে ঠায় বসে ঘণ্টা পাঁচেক জেগে থাকা খুব লোভনীয় প্রস্তাব নিশ্চয়!
বিভা আকুল হয়ে বললে, না না, সে হবে না। তলায় আছে, ওপরে উঠে আসতে কতক্ষণ? আমি পাগল হয়ে যাব। হাঁকডাক করো, লোকজন জড়ো হোক।
হাঁকডাক করলেই-বা শুনছে কে এখন? এই বাদলার এমন রাত্তিরে খুন হয়ে গেলেও কেউ সাড়া দেবে না। এ তো আর কলকাতা শহর নয়!
তা নয়। কলকাতা থেকে বারো মাইল দূরে শহরের উচ্ছিষ্ট অঞ্চল এটা। পাড়াগাঁয়ের কণ্ঠরোধ করা হয়েছে আশপাশে গোটা কয়েক কারখানা তৈরি করে, কিন্তু নগরলক্ষীর দাক্ষিণ্যও ছড়িয়ে পড়েনি। দূরে দূরে বিজলি আলো যেন অনুকম্পার কৌতুকে চোখ মিটমিট করে। ভাঙাচুরো বাড়ি, মুখ-থুবড়ানো বস্তি, একটা পিচের রাস্তায় সম্প্রতি বোমার ক্রেটারের মতো অসংখ্য গর্ত। এদিক-ওদিকে দু-একটা পোড়ো ইটের পাঁজা থাকায় সাপের বংশবৃদ্ধির সুযোগ হয়েছে। এলোমেলো ঝোপ-জঙ্গল, ন্যাড়াটে গাছগুলোর প্রাণহীন পাতায় আধ ইঞ্চি পুরু কালির আস্তরণ।
