বন্দুকটাকে বাগিয়ে ধরে করুণাসিন্ধু বললে, সাপ সাপ বলে খুব চিৎকার শুনলাম। ভাবলাম বন্দুকটা হয়তো কাজে লাগতে পারে, তাই এলাম। তা কোথায় সাপ?
সে আর নেই, বাইরে পালিয়েছে। ভূপতি জবাব দিলে, তবু আপনি যে কষ্ট করে এসেছেন, সেজন্যে অনেক ধন্যবাদ! বিভার দিকে তাকিয়ে অস্বস্তিভরে যোগ করল, তা এলেন যখন, বসুন-না একটু। দাঁড়িয়ে আছেন কেন?
এরপরে ভদ্রতার খাতিরেই করুণাসিন্ধু বিদায় নেবে এমনই একটা আশা ছিল ভূপতির। কিন্তু আশাটা ব্যর্থ হল। একটা চেয়ার নিয়ে জমিয়ে বসল করুণাসিন্ধু।
এই সময়টা বড়ো খারাপ, সাবধানে থাকবেন। কোনো দরকার পড়লেই ডাকবেন আমাকে। একটা সোনার সিগারেট কেস বের করে সেটা এগিয়ে দিলে ভূপতির দিকে। হ্যাভ ওয়ান?
নাঃ, বিড়ি নইলে আমাদের নেশা জমে না। বিভার কুন্ডলী-পাকানো চেহারার দিকে আবার আড়চোখে তাকিয়ে শুকনো গলায় ভূপতি জবাব দিলে।
তা বটে! আপনারা আবার কড়ার ভক্ত। বিড়ির দীনতাকে ভদ্রতার প্রলেপ দিয়ে ঢেকে দিলে করুণাসিন্ধু, যার যা।
আজ্ঞে হ্যাঁ।
করুণাসিন্ধু সিগারেট ধরিয়ে এক বার কাশল, যা বলব ভাবছিলাম। ভালো কথা ভূপতিবাবু, আপনার শালি বোধ হয় আইএ পড়ছেন আজকাল?
বিভা এক বার নড়ে উঠল। সভয়ে মাথা নাড়ল ভূপতি।
করুণাসিন্ধু বলে চলল, ক-দিন থেকেই বলব ভাবছি। আমাদের কলকাতার অফিসে শ দেড়েক টাকা মাইনের একটা ভ্যাকেন্সি হচ্ছে শিগগিরই। যদি বলেন, ঢুকিয়ে দিই ওকে। আমার হাতেই সব।
বলেন কী? দেড়শো টাকা! এ যে এমএ পাসের মাইনে! ও তো শুধু ম্যাট্রিক পাস!
আমি বাবাকে বললে সবই হয়ে যাবে। করুণাসিন্ধু করুণায় বিগলিত হয়ে পড়ল, আপনারা আমাদের প্রতিবেশী, যদি কিছু সাহায্য করতে পারি, নিজেকেই ধন্য মনে করব। করুণাসিন্ধু এবার ঠোঁট চাটল, কাল যদি আমার সঙ্গে এক বার ওকে কলকাতায় পাঠিয়ে
দেন…
বাইরে ছাইগাদার ওপরে ধপ ধপ করে আওয়াজ হল গোটা দুই। ভূপতি চমকে গেল, ও কী! কে ওখানে?
আমি আভা ভূপতিদা!
করুণাসিন্ধুর অস্তিত্ব ভুলে গিয়ে বিভা আর্তনাদ ছাড়ল, হতভাগী, এই অন্ধকারে ওখানে গেছিস কেন? চলে আয় শিগগির, চলে আয়।
আসছি। আবার ধপাধপ করে গোটা কয়েক আওয়াজ!
সর্বনাশ করবে, ও আমার সর্বনাশ করবে! বিভা কেঁদে ফেলল।
ডাকাতটা ওখানে এই অন্ধকারে সাপ খুঁজতে গেছে!
অ্যাঁ! সাপ খুঁজতে গেছেন? করুণাসিন্ধু লাফিয়ে উঠল, অসম সাহস ওঁর! বন্দুকটা তুলে নিয়ে বললে, যদি আমি ওঁকে সাহায্য করতে পারি।
আভা–আভা। ভূপতি হুংকার ছাড়ল!
আসছি ভূপতিদা।
করুণাসিন্ধু আভার উদ্দেশেই বেরিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু দরজার কাছে গিয়েই আতঙ্কে পিছু হটে এল। এক হাতে টর্চ আর এক হাতে লাঠির মাথায় কালো কুচকুচে গোখরোটার মৃতদেহ ঝুলিয়ে নিয়ে ঘরে ঢুকেছে আভা। সাপটার ঝুলে-পড়া থ্যাঁতলানো মুখ থেকে সুতোর মতো আঠালো লালা গলে পড়ছে।
সুন্দর গালে কাদার ছিটে, ভিজে চুল বেয়ে জলের ফোঁটা নামছে, একটা অদ্ভুত বন্য আলোয় জ্বলছে আভার চোখ। তীক্ষ্ণ হাসি হেসে বললে, কেমন দিদি, তুই যে বলেছিলি সাপটা আমি মারতে পারব না। পাথরের মতো দৃষ্টি মেলে স্তম্ভিত ভূপতি আর বিভা যেখানে ছিল, ঠিক সেইখানেই বসে রইল। আর আভার চোখের বন্য আলোয় কী ছিল কে জানে—হঠাৎ পাংশু হয়ে নিবে গেল করুণাসিন্ধুর মুখ! বিনা সম্ভাষণেই সে দ্রুতবেগে ঘরের বাইরে ছিটকে পড়ল, ক্ষিপ্রগতিতে নেমে যেতে যেতে ডাক দিয়ে বললে, চলি ভূপতিবাবু, আপনারা তাহলে বিশ্রাম করুন।
ঘণ্টাদার কাবলুকাকা
ঘণ্টাদা বললে, ভীষণ প্যাঁচে পড়ে গেছি রে, প্যালা। চোখে সর্ষের ফুল দেখছি আমি।
কী হল তোমার? সর্ষের চাষ করছ নাকি আজকাল? আমি উৎসাহিত হয়ে বললুম, তোমার অসাধ্য কাজ নেই। তুমি পাটের দালালি করেছ, ঝোলা গুড়ের ব্যবসা করছ, সিনেমার জনতার দৃশ্যে অভিনয় করেছ বাজি রেখে কাঁচা ডিম খেতে গিয়ে বমি করেছ, পোড়ো বাড়িতে ভূত দেখতে গিয়ে ভিরমি খেয়েছ। শেষকালে কি সর্ষের চাষ আরম্ভ করে দিলে?
–থাম, মেলা বকিসনি! নাকটাকে পান্তুয়ার মতো করে ঘণ্টাদা বললে, আমি মরছি নিজের জ্বালায়– উনি ইদিকে এলেন ইয়ার্কি দিতে। হয়েছে কী, জানিস? আজই খবর পেলুম, বিকেলের গাড়িতে কাশীর কালুকাকা আসছেন।
–সে তো খুবই ভালো কথা! আমি আরও উৎসাহ বোধ করলুম; কাশী থেকে যখন আসছেন, তখন নিশ্চয়ই কিছু চমচম আর গজা নিয়ে আসছেন। আমিও খাব, বিকেলে।
-সে গুড়ে বালি, বুঝলি, সে জ্যাগারিতে স্রেফ স্যাণ্ড।–ঘণ্টাদা কথাটার ইংরেজী অনুবাদ করে নিলে : কাশী থেকে গজা-চমচম নিশ্চয়ই আনবেন, কিন্তু সে আর হাওড়া পর্যন্ত পৌঁছবে না। মোগলসরাইয়ের আগেই কাবলুকাকা ওগুলোকে সাবাড় করে ফেলবেন। …গলা নামিয়ে ঘন্টাদা বললে, কাবলুকাকা ভীষণ খেতে ভালোবাসেন, জানিস? একটা আস্ত পাঁঠা খেয়ে নেন একেবারে।
ল্যাজ-ট্যাজ, শিং-টিং সুব্ধ?–আমি জানতে চাইলুম।
–চুপ কর বাজে বকিসনি।…আমাকে একটা ধমক দিয়ে ঘণ্টাদা বললে, তা কথাটা যে একেবারে মন্দ বলেছিস তা-ও নয়। কাবলুকাকা যা খাদক- পাঁঠার শিং তো দূরে থাক, বেঁধে দিলে গলার দড়িগাছটাও খান বোধ হয়। বিশ্বখাদক বুঝলি, প্যালা– বিশ্বখাদক। তিন দিন থাকবেন। আর এই তিন দিনের মধ্যে আমাকেও খেয়ে যাবেন এই তোকে বলে দিলাম।
