নেশা-জড়ানো চোখ তুলে সমর্থনের আসায় গৌরীর দিকে তাকাল হিমাংশু, আর দেখতে পেল এতক্ষণ পরে।
শুক্লপক্ষ ঘুরে এসেছে আবার। সেদিনের মতো চাঁদ উঁকি দিয়েছে এই জীর্ণ বিবর্ণ বাড়ির কয়েক ইঞ্চি আকাশে-ত্রয়োদশীর চাঁদ। আর গৌরীর শঙ্খগ্রীবায় কী যেন ঝিকমিক করে জ্বলছে, চাঁদমালার মতো জ্বলছে।
গলায় ওটা কী পরেছিস তুই? হার পেলি কোথায়?
মুহূর্তের জন্যে চুপ করে রইল গৌরী, মুহূর্তের জন্যে তাকে পাথরের একটা মূর্তির মতো দেখাল। তারপর একটা চাপা নিশ্বাস ফেলে বললে, ফেরিওয়ালার কাছ থেকে কিনেছি পাঁচ সিকে দিয়ে!
ওঃ, নকল সোনার গয়না? গিলটির? হিমাংশু উঠে দাঁড়াল, দেখি?
গৌরী স্তব্ধ হয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। হিমাংশুর কদাকার হাতের আঙুলগুলো তার গলা স্পর্শ করল, ভয়ে শিউরে উঠল গৌরী; এক বারের জন্যে মনে হল ওই আঙুলগুলো এখুনি তার গলার নরম মাংসের মধ্যে সাঁড়াশির মতো চেপে বসবে। চোখের পাতাদুটো তার বন্ধ হয়ে এল।
হিমাংশু বললে, বেড়ে মানিয়েছে হারছড়া। দূর থেকে বোঝাই যায় না, তবে হাত দিয়ে দেখলে টের পাওয়া যায় বই কী। খাঁটি সোনা লালচে হয় না, আর একটু সাদাটে হয়।
গৌরী প্রায় নিঃশব্দ গলায় বললে, খাঁটি সোনা বুঝি তুমি হাত দিয়ে দেখলেই টের পাও?
গৌরীর মুখের ওপর একরাশ অল্প গন্ধ ছড়িয়ে হা-হা করে হেসে উঠল হিমাংশু, পাই বই কী। নাহয় তোকে সোনাদানা কিনেই দিতে পারি না, তাই বলে খাঁটি-নকল চিনতে পারব না? আজ বারো বছর ধরে কলকাতা শহর চরিয়ে খাচ্ছি রে, হিমাংশু ঘোষালের অত সহজে ভুল হয় না।
গৌরী বললে, থাক ওসব, খাবে এসো।
গৌরী ঘুমিয়ে পড়লেও আজ রাত্রে হিমাংশুর ঘুম এল না। নেশাটা যতই ফিকে হয়ে আসতে লাগল, ততই তার প্রতিক্রিয়াটা তীব্র তীক্ষ্ণবেদনার মতো তাকে যন্ত্রণা দিতে লাগল। ওই গিলটির নকল হারছড়াই কী আশ্চর্য মানিয়েছে গৌরীর গলায়! বালিশের পাশে একখানা হাত এলিয়ে আছে, একগাছা লাল চুড়িতে কী দীনতা ফুটে উঠেছে তাতে! ভারি অন্যায় হয়ে গেছে হিমাংশু ভাবল। যে-করেই হোক কয়েকখানা গয়না গৌরীকে তার গুড়িয়ে দেওয়া উচিত ছিল। সোনা ছাড়া এমন সোনার প্রতিমাকে কি মানায়!
চমৎকার দেখাচ্ছে হারছড়া। তবুও গিলটির হার। দু-দিন পরেই ময়লা হয়ে যাবে, বিবর্ণ পিতলের রং ধরবে। ও শুধু গৌরীর আত্মবঞ্চনাই নয়, ওর মধ্যে কেবল গৌরীর ব্যর্থ আকাঙ্ক্ষার বেদনাই মিশে নেই, ও হিমাংশুরও চরম লজ্জা, তার অক্ষম পৌরুষের অবমাননা।
হারটার দিকে তাকিয়ে দেখতে দেখতে হিমাংশুর রক্তে সাপের জ্বালা ধরল। একে একে মনে পড়তে লাগল কারা তাকে ঠকিয়েছে তার দালালির পাওনায়, কার কাছ থেকে এখনও পর্যন্ত নিজের পুরো টাকাটা সে আদায় করতে পারেনি। হিংস্রচিত্তে হিমাংশু ভাবতে লাগল। এবার তারও সময় এসেছে। তাকেও বাঁকা রাস্তাই ধরতে হবে। সোজা পথে চলবার চেষ্টা করে সবাই ফাঁকি দিয়েছে, সেও অন্য উপায় দেখবে।
বারো বছর কলকাতা শহরে দালালি করছে হিমাংশু ঘোষাল। কিছুই তার অজানা নয়।
গৌরীর গলার হারছড়া ঝিকমিক করে জ্বলছে, একরাশ আলোর কাঁটা এসে তার চোখকে বিদ্ধ করে লাগল। হিমাংশু উঠে পড়ল, নিবিয়ে দিলে ঘরের আলোটা।
আর একরাশ স্তব্ধ অপরিচ্ছন্ন অন্ধকারে হিমাংশুর উত্তপ্ত উত্তেজিত মস্তিষ্কের মধ্যে কতগুলো সরীসৃপ কিলবিল করে ঘুরে বেড়াতে লাগল। ওই গিলটির হারটা যেন এক মুহূর্তে তার মনের ভেতরে একটা সাপের ঝাঁপির ঢাকনা খুলে দিয়েছে।
কিন্তু সাপের ঝাঁপির ঢাকনা খুললে কী হয়, সবাই ওস্তাদ সাপুড়ে নয়। অন্তত হিমাংশু ঘোষাল তো নয়ই। সাপ খেলাতে গিয়ে প্রথম চোটে তার নিজের হাতেই ছোবল লাগল।
টাকা পেয়েছিল বই কী হিমাংশু—একশো টাকা। কিন্তু একশো টাকাতেই কি আর এক ছড়া হার হয়? আর হলেও সরু সুতোর মতো হারে গৌরীকে কি মানাতে পারে? হাতেও কিছু চাই, অন্তত চারগাছা চুড়ি।
তার উপরে দিনটা শনিবার ছিল। অভ্যাসের সঙ্গে সঙ্গে দুর্জয় দুরাশা হিমাংশুকে আকর্ষণ করতে লাগল। জাদুকরের হাতের ছোঁয়ায় যেখানে একশো টাকা কয়েক মিনিটে তিনশো টাকায় পরিণত হয়ে যায়—হিমাংশু সেই ঐন্দ্রজালিক জগতের দিকেই পা বাড়াল।
কিন্তু একশো টাকা তিনশো হল না। বনমানুষের হাড়ের উলটো ভেলকিতে পকেটে সাত আনা পয়সা নিয়ে রাত বারোটায় গলিতে পা দিলে হিমাংশু।
ওরা ওঁত পেতেই ছিল। তিন জন লোক, তাদের দুজন গুণ্ডা গোছের।
বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল হিমাংশুর ওপরে। নিশ্বাস একেবারে আটকে না দিয়ে যতখানি গলা টিপে ধরা যায়, সেই নিপুণ কৌশলে হিমাংশুকে তারা আয়ত্ত করল। তারপর আত্মীয়তার সম্ভাষণ জানিয়ে বললে, ফোর টুয়েন্টির আর জায়গা পাসনি? টাকা বার কর।
চোখের তারা কপালে তুলে হিমাংশু গোঁ-গোঁ করতে লাগল। ওই অবস্থাতেই হিমাংশুর গালে আর একজন প্রচন্ড একটা চড় বসিয়ে দিল।
জাল মালিক সাজিয়ে ভুয়ো ফ্ল্যাটের টাকা আগাম নেবে? আমার টাকাটা হজম করা এত সোজা?
যে গলা টিপে ধরেছিল সে গোটা কয়েক ঝাঁকুনি দিলে হিমাংশুকে–যেমন করে বেড়াল মুখের দুরকে ঝাঁকুনি দেয়। টাকা বের কর বলছি, খুন করে ফেলব নইলে।
তৃতীয় জন ততক্ষণে পকেট হাতড়ে যা-কিছু সব বের করে ফেলেছে। খুচরো পয়সা ক-টা, ময়লা রুমাল, পুরোনো নোটবই আর ক্লিপ-লাগানো পেনসিলটা ছুড়ে ফেলে দিয়েছে মাটিতে।
