তারপর…
বড়োলোক! ওঃ! অমন বড়োলোক ঢের দেখেছে এই হিমাংশু ঘোষাল। নিজের মুখে বললে, টু পারসেন্ট। এখন কাজ মিটে গেলে বলছে এই একশো টাকা বকশিশ দিচ্ছি, মিষ্টি কিনে খাও। বখশিশ, আমি চাকর না দারোয়ান যে বখশিশ নেব? ওঃ, বড়োলোক!
বিড়িতে একটা হিংস্র টান দিয়ে পর পর কয়েকটা কদর্য কথা আউড়ে গেল হিমাংশু।
রান্নাঘরের দিকে এগোচ্ছিল গৌরী, কী মনে ফিরে এল।
একটা কথা বলব?
স্বগতোক্তিতে ছেদ পড়ায় হিমাংশু বিরক্ত হল। ভুরু কুঁচকে বললে, তোর আবার কী হল?
পরকে তো এত বাড়ি আর জমির ব্যবস্থা করে দিচ্ছ, নিজের জন্যে কিছু করতে পার না?
হিমাংশু হাতের বিড়িটা ছুড়ে দিলে। সেটা চৌবাচ্চার জলের মধ্যে গিয়ে পড়ল। কর্কশ স্বরে বলল, আরে, চেষ্টা কি আর করছি না? ঝোপ বুঝে একখানা কোপ যখন মারব, তখন বুঝতে পারবি। নিউ আলিপুরে কিংবা পার্ক সার্কাসে…
ছুরির ধারের মতো খানিকটা তীক্ষ্ণ বঙ্কিম হাসি গৌরীর ঠোঁটের ওপর দিয়ে খেলে গেল।
রাজপ্রাসাদের কথা এখন থাক, একটা ভালো বাসার ব্যবস্থাও কি করতে পার না?
কেন, এ বাসাটাই-বা এমন মন্দ কী? তোর বুঝি দোতলার ঘর নইলে ঘুম হচ্ছে না? বাড়িটা একতলা, পুরোনোও বটে, কিন্তু সুবিধেটা দেখছিস না? একেবার সব আলাদা—মায় ছাত পর্যন্ত। কোথাও কোনো ঝক্কিঝামেলা নেই, অন্য ভাড়াটের সঙ্গে জল-চানের ঘর নিয়ে ঝগড়া করতে হয় না। এসব বুঝি তোর পছন্দ নয়? সাময়িকভাবে মনের তিক্ত যন্ত্রণাটাকে ভুলে গিয়ে রসিকতার চেষ্টা করল হিমাংশু, মেয়েমানুষ তো—স্বভাব যাবে কোথায়? ব্যাঙের মতো গলা ফুলিয়ে কারুর সঙ্গে ঝগড়া করতে না পারলে ভাত হজম হবে কেন?
সেজন্যে নয়। গৌরী আস্তে আস্তে বললে, ছাতগুলো সব গায়ে-লাগা, যেকোনো সময় চোর আসতে পারে।
চোর! হিমাংশু আরও সরস হয়ে উঠল, আরে আমার বাসায় একাদশী করতে আসবে এমন বেকুব চোর কলকাতা শহরে নেই। তোর গায়ে তো কয়েক গাছা গালার চুড়ি আছে— বোধ হয় পয়সা চারেক দাম হবে। তবে হ্যাঁ… হিমাংশু হা-হা করে হেসে উঠল। তোকে যদি কেউ চুরি করতে আসে সেটা আলাদা কথা। লাখ টাকাতেও তোর দাম হয় না। দালালির কাজে কলকাতা শহরে কত বড়লোকের বাড়িতেই তো যাই… লুব্ধ চোখ মেলে স্ত্রীকে লেহন করতে লাগল হিমাংশু, সত্যি বলছি, তোর মতো রূপসি বউ কারুর ঘরে দেখিনে।
অকারণে একরাশ রক্ত জমা হল গৌরীর মুখে, খানিকটা তপ্ত বাষ্পের মতো কী যেন কুন্ডলী পাকিয়ে উঠতে লাগল মাথার ভেতরে। নিজের হৃৎপিন্ডে ঝড়ের আওয়াজ শুনতে পেল গৌরী।
মুখ ফিরিয়ে চলে যাচ্ছিল রান্নাঘরের দিকে, হিমাংশু তাকে ডাকল, শোন!
গৌরী ফিরে দাঁড়াল। বারান্দার মিটমিটে আলোটা নয়, গৌরীর চোখে-মুখে, তার সর্বাঙ্গে আরও কিছু ছড়িয়ে পড়েছে। এই কানাগলির ভেতরেও এক টুকরো আকাশ আছে, চাঁদ উঠেছে সেখানে। তারই জ্যোৎস্নায় গৌরী স্নান করছে। ডুরে শাড়ির আবরণে ঢাকা রুপোর মূর্তির মতো দেখাল গৌরীকে, তার নিখুঁত সুন্দর কপালের উপর যেন মণির মতো কী-একটা জ্বলছে বলে মনে হল। কিছুক্ষণ হিমাংশুর চোখের পলক পড়ল না।
গা-ভরতি গয়না নইলে তোকে মানায় না গৌরী—একেবারে মানায় না! অভিভূত বিহ্বল-গলায় হিমাংশু বললে, গয়না পরবার জন্যেই যেন জন্মেছিলি তুই। সামনের ট্রানজাকশনের টাকাটা যদি পাই, সত্যি বলছি…
জ্যোৎস্নার আলোয় হিমাংশু গৌরীকে এক চোখ দিয়ে দেখছিল, হিমাংশুকে গৌরী দেখছিল আর এক চোখে। পিঠে কুঁজ নিয়ে বসে থাকা হিমাংশুকে অদ্ভুত জান্তব দেখাচ্ছে। এখন। আরও কুৎসিত, আরও কদাকার মনে হচ্ছে।
হিমাংশুর কথার শেষটুকু শোনবার জন্যে গৌরী আর অপেক্ষা করল না। এগিয়ে গেল রান্নাঘরে।
সেদিন অনেক রাত্রে, সারাদিনের অসহ্য ক্লান্তির পরে হিমাংশু মড়ার মতো ঘুমিয়ে পড়লে গৌরী দরজা খুলে ছাদে উঠে এল। তখন চাঁদ আরও আশ্চর্য রূপ নিয়েছে, জ্যোৎস্না আরও উজ্জ্বল হয়ে রেণু রেণু সোনা বৃষ্টি করে চলেছে। গৌরীর শরীরে সেই সোনা ঝরে পড়তে লাগল। গালার চুড়িপরা নিরাভরণ হাত দুটির উপর বার বার গৌরীর চোখ পড়তে লাগল, না দেখেও সে অনুভব করতে লাগল—তার দীর্ঘ শুভ্র গ্রীবাকে এই আলোয় কী করুণ আর নিরাভরণ মনে হচ্ছে!
দোতলা বাড়ির জানলায় আবার সিগারেটের আগুন জ্বলল। জ্যোৎস্নার ভিতরে অস্বাভাবিক লাল দেখাল সেটাকে, আলোর শরীরে দপ দপ করতে লাগল রক্তবিন্দুর মতো।
আর হিমাংশু স্বপ্ন দেখতে লাগল, রেসকোর্সের মাঠে একটা কালো ঘোড়া সকলকে পিছনে ফেলে তিরের মতো ছুটে চলেছে, তার পিঠে জকি হয়ে বসে আছে সেই নতুন পার্টিটা, যে তাকে তিন পার্সেন্ট কমিশন দিতে রাজি হয়েছে।
ইদানীং ফিরতে প্রায়ই বেশি রাত হয়। তার উপরে আজ শনিবার ছিল, বিকেলে রেসের
মাঠে গিয়েছিল হিমাংশু। গোটা চল্লিশেক টাকা ছিল সঙ্গে, তার প্রায় সবটাই গেছে। বিস্বাদ বিরক্ত মনটাকে সামান্য একটু রাঙা করে অল্প অল্প টলতে টলতে হিমাংশু যখন বাড়ি ফিরল, রাত তখন একটার কাছাকাছি।
গৌরী জেগেই ছিল। দরজা খুলে দিলে কড়ায় হাত পড়তেই। হিমাংশু হাতের ছাতাটা উঠোনেই ছুড়ে দিয়ে রকের উপর বসে পড়ল।
দুত্তোর, দিনটাই খারাপ। রাস্তায় বেরিয়ে যে কার মুখ দেখেছিলুম প্রথমে!
গৌরী বললে, ওঠো, হাত-মুখ ধুয়ে খেয়ে নাও।
খেতে ইচ্ছে করছে না, একরাশ তেলেভাজা এখনও যেন আটকে আছে গলায়। হিমাংশু হেঁচকি তুলল একটা, তা ছাড়া সমস্ত মনমেজাজই খিচড়ে রয়েছে। কী যে বাজে টিপস দিলে—টাকাগুলো একেবারে বরবাদ হয়ে গেল। সব জোচ্চোর বুঝলি? সব জোচ্চোর। দুনিয়ায় ভালো লোকের জায়গা নেই!
