হিমাংশুর কুঁজের ওপর কিল বসিয়ে দিয়ে তিক্ত ক্রোধে সে গর্জন করে উঠল, কিচ্ছু নেই, সব গিলে খেয়েছে!
গলা টিপে বের করব। আর এক বার ঝাঁকুনি পড়ল।
হিমাংশু সমানে গোঁ-গোঁ করতে লাগল।
তার আগেই বেরিয়ে এসেছিল গৌরী। এসে দাঁড়িয়েছিল দরজার সামনে।
গলা থেকে এক টানে হারছড়া খুলে নিয়ে এগিয়ে এল এবারে।
আমার স্বামী কত টাকা ঠকিয়েছেন আপনাদের?
লোক তিনটে চমকে উঠল। ফিরে তাকাল একসঙ্গে। গ্যাসের মরা আলোয় এই মাঝরাতের নির্জন গলিতে এমন আশ্চর্য একটি রূপসি মেয়ের আবির্ভাব স্বপ্নের মতো মনে হল তাদের।
যে গলা চেপে ধরেছিল, তার হাতের মুঠো আলগা হয়ে গেল। ধুপ করে গলির স্যাঁতসেঁতে কালো মাটির উপরে বসে পড়ল হিমাংশু।
তিন জোড়া চোখ মন্ত্রমুগ্ধের মতো চেয়ে রইল গৌরীর দিকে।
কত টাকা নিয়েছেন উনি?
যে চড় বসিয়েছিল, সে একটা ঢোঁক গিলে বললে, একশো, একশো টাকা।
হারসুদ্ধ হাতখানা তার দিকে বাড়িয়ে ধরে গৌরী বললে, এটা নিয়ে ওঁকে ছেড়ে দিন। এর দাম একশো টাকার বেশিই হবে।
গৌরীর দিকে চোখ রেখেই হারছড়া নিলে লোকটা। তারপর আচ্ছন্নের মতই তিন জন। নিঃশব্দে গলি পার হয়ে রাস্তার দিকে এগিয়ে চলে গেল। একটা কথাও বলতে পারল না। হয়তো তখনও সমস্ত জিনিসটা ওরা বিশ্বাস করতে পারছিল না। এমন অপূর্ব, এমন অবিশ্বাস্য স্বপ্নের জালটাকে ছিড়তে চাইছিল না কথার আঘাত দিয়ে।
হিমাংশুকে মাটি থেকে টেনে তুলল গৌরী, একরকম ধরেই নিয়ে এল বাড়ির মধ্যে। হিমাংশুর গোঙানি থেমে গেছে তখন, চাপা গলায় কাঁদতে শুরু করে দিয়েছে।
হিমাংসুকে জোর করে বিছানায় শুইয়ে গৌরী তার মাথাটা টেনে নিলে কোলের মধ্যে।
ভয় নেই তোমার, ওরা চলে গেছে।
হিমাংশু অবরুদ্ধ গলায় বললে, আমার জন্যে তো তোর সব গেল গৌরী, গিলটির হারছড়াও গেল। কিন্তু ওরা তো অত কাঁচা নয়, একটু পরেই টের পাবে, তখন তো ফিরে আসবে আবার।
দাঁতে দাঁতে চেপে গৌরী আবার বললে, আসে তো দেখা যাবে। তোমার ভয় নেই, আমি আছি।
হিমাংশু ছেলেমানুষের মতো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। পিঠের কুঁজটা ওঠা-পড়া করতে লাগল ঢেউয়ের মতো।
তুই আমাকে এত ভালোবাসিস গৌরী, আমি তোকে কিছুই দিতে পারলুম না, কিছুই না! গৌরীর দাঁতের চাপ ঠোঁটে এসে পড়ল, রক্ত গড়িয়ে পড়তে চাইল ঠোঁট দিয়ে। হারটা গিলটির নয়, কিন্তু যে-ভালোবাসার ভিতরে নিজেকে অসহায় শিশুর মতো ছেড়ে দিয়ে। হিমাংশু এমন করে কাঁদছে, তার গিলটিকরা নিষ্ঠুরতার কথা ভেবে গৌরীর চোখের সামনে সব ঝাপসা হয়ে এল।
গুরুপ্রাপ্তি
বেলেঘাটা সি আই টির ওদিকটায় তৈরি হচ্ছে নতুননতুন বড় রাস্তা আর খুব সুন্দর সব পার্ক। এখনও লোকের ভিড় নেই ওদিকে, তাই সন্ধের পর কোনও কোনও পার্কে ভারি নিরিবিলিতে বসা যায়। যারা ওদিকটা দেখোনি, তারা ভাবতেও পারবে না, এখনও কলকাতার পার্কে কী চমৎকার নির্জনতা আছে কোথাও কোথাও।
তায় শীতের সন্ধ্যা। প্রকাণ্ড পার্কের এক ধারে একটা বেঞ্চিতে একা বসে আছি। এমন সময়
এমন সময় যেন ঝুপ করে আকাশ থেকে পড়ল লোকটা।
বেঁটে কালো-কোলো চেহারা, গায়ে হাফ শার্ট, পরনে সরু প্যান্ট। কোত্থেকে এসে আমার পাশে বসে পড়ল ঝুপ করে। ডাকল : দাদা!
ভীষণ চমকে গেলুম আমি। গুণ্ডা-টুণ্ডা নয় তো? কাছাকাছি লোকজন তো কেউই নেই, ফস করে একখানা ছোরা বার করলেই তো গেছি।
বললুম, কোনও মতলব আছে নাকি? কিন্তু আমার পকেটে আছে নগদ বেয়াল্লিশ পয়সা আর হাতে এই যে ঘড়িটা রয়েছে, এটা ঠাকুর্দার আমলের। দিনে পাঁচ বার দম দিতে হয়, রোজ কুড়ি মিনিট করে শ্লো হয়, আর মাসে একবার করে অয়েল করাতে হয়।
লোকটা জিভ কাটল।
–ছি ছি দাদা, কী বলছেন? আমি ও-লাইনের লোক নই। আমি যা রোজগার করি, ট্রামে বাসে, টুক করে না জানিয়ে পকেট থেকে তুলে নিই। আপনার পকেটই যদি মারব, তা হলে আর পাশে এসে বসে ভাব জমাতে চাইব কেন?
বললুম, তা ঠিক। কিন্তু আমার পকেটে হাত ঢোকালে যা পাবে সে তো বলেই দিয়েছি। নিট বেয়াল্লিশ পয়সা, কয়েকটা সুপুরির কুচি আর একখানা ময়লা রুমাল। তোমার মজুরি পোষাবে না।
–দাদা, ভীষণ মনোকষ্ট হয়েছে। ও-লাইন ছেড়ে দেব।
–কেন, লোকে ধরে খুব ঠেঙিয়েছে নাকি?
আহা, ধরা পড়লে পিটুনি তো খেতেই হয়। ওতে কিছু লাগে না দাদা, গায়ের চামড়া পুরু হয়ে গেছে। আর দু-এক মাস জেল? সে তো নস্যি। বিনি পয়সায় একটু চেঞ্জে যাওয়া আর কী! মন্দ লাগে না, কী বলেন?
বললুম, ঠিক বলতে পারছি না। ওরকম চেঞ্জে আমি কখনও যাইনি, যেতেও চাই না। কিন্তু তোমার এত ব্যথা হল কেন হঠাৎ!
–দাদা, জীবনে অনেক দুঃখু আছে, যা একেবারে হৃদয় ভেঙে দেয়। প্রাণ নিয়ে টানাটানি পড়ে। না, আর এসব নয়। আমার মামার একটা রেস্টুরেন্ট আছে আসানসোলে, সেখানে গিয়েই বরং চপ কাটলেট আর পরোটা ভাজব।
–ভাজতে জানো নাকি ওসব?
জানতে আর কতক্ষণ? চক্ষের নিমেষে কলম ব্যাগ লোপাট করতে পারি, আর কাটলেট ভাজতে পারব না?
–আলবাত পারবে। চক্ষের পলকে খেয়েও ফেলতে পারবে খান কয়েক, তোমার মামা টেরও পাবে না।
-ঠাট্টা করবেন না দাদা, মনে বড় ব্যথা। আজ কী হয়েছে জানেন?
পকেট থেকে একটা সুপুরির কুচি বের করে মুখে পুরে বললুম, বেশ–বলো।
বিকেল থেকে অসম্ভব কষ্টে আছি। ভাবছি কাকে প্রাণের কথা বলি। এই পার্কে এসে আপনাকে দেখলুম, বেশ সদাশয় ভদ্রলোক মনে হল। তাই এলুম আপনার কাছেই।
