কেউ কেউ পুরোটা সঙ্গে সঙ্গে দিয়ে দেয়, কেউ ছ-মাস ঘোরায়, কেউ কেউ একেবারেই ফাঁকি দেবার মতলব করে। তখন রাস্তার দাঁড়িয়ে মাজাভাঙা সাপের মতো ব্যর্থ আক্রোশে গর্জন করে হিমাংশু।
দেখে নেব, দেখে নেব। গলায় পা দিয়ে আমার পাওনা টাকা আদায় করে ছাড়ব, তবে আমার নাম…
পাওনা টাকা অনেকের কাছ থেকেই আদায় হয়নি, কিন্তু সেজন্যে নিজের নাম বদল করতে পারেনি হিমাংশু ঘোষাল। দিন কয়েক গালমন্দ করেছে, নিরুপায় অন্তর্জালায় বিড়ি পুড়িয়েছে একটার পর একটা, ব্যবহার করেছে অশ্লীলতম ভাষা, তারপর নিজেরই বিষযন্ত্রণায় নিতান্ত তুচ্ছ কারণেই গৌরীর গায়ে হাত তুলতে গিয়ে তার আশ্চর্য রূপের দিকে তাকিয়ে মন্ত্রশান্ত ভুজঙ্গের মতো স্তব্ধ হয়ে গেছে। পরক্ষণেই ছাতাটা তুলে নিয়ে বেরিয়ে গেছে বাড়ি থেকে। বেলেঘাটায় একটা নতুন পার্টির সন্ধান মিলেছে, নষ্ট করবার মতো সময় তার নেই।
সেই সকাল আটটায় বেরিয়ে কখনো বেলা বারোটা-একটায় এসে একমুঠো খেয়ে যাওয়া। কোনো কোনো দিন তাও নয়, একেবারে সেই রাত সাড়ে এগারোটায় বাড়ি ফেরা। দিনের খাওয়াটা সস্তার হোটেলে কিংবা ডালপুরির দোকানে।
শনি-রবিবার নেই, ছুটিছাটা নেই, পুজো-পার্বণ নেই। এক-আধদিন অসুখবিসুখে না পড়লে বাঁধনিয়মে কোথাও ছেদ পড়ে না। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, শীতে কুঁকড়ে কদাকার চেহারা আরও কদাকার হয়েছে হিমাংশুর। নাকটা ঠোঁটের মতো বাঁক নিয়েছে, উঁচু উঁচু দাঁতে পানের ছোপ কালো হয়ে বসেছে, বসন্তচিহ্নিত মুখটার দিকে তাকালে যে-কেউ সন্দেহ করে—এই লোকটা যখন খুশি খুন করতে পারে। নুয়ে-পড়া ঘাড়টাকে এখন নির্ভুল একটা কুঁজের মতো দেখায়।
এত খাটে, তবু সংসার চলে না।
মাঝে মাঝে হিমাংশু সামান্য নেশা করে আসে, কিন্তু তাকে মাতাল বলা যায় না। সেটা বড়ো খরচ নয়। হিমাংশুকে আর একটা রোগে ধরেছে, সেটা রেসের।
মাঠের ভিতরে যায় না, বাইরেই জুয়ো খেলে। তবু সামান্য আয়ের একটা বড়ো অংশ ওইখানেই নিবেদন করে আসে হিমাংশু। যেদিন বেশি হারে সেদিন ওর মুখের গন্ধেই টের পায় গৌরী। আর অনেক রাত পর্যন্ত হিমাংশু ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে— কতদিন মামাবাড়ি যাইনি, দাদুকে বড়ো দেখতে ইচ্ছে করে।
গৌরী সরে যায় সামনে থেকে। একতলা জীর্ণ বাড়িটার কাঠের সিঁড়ি বেয়ে ছোটো ছাতটায় উঠে আসে। খান তিনেক নীচু ছাতের পরেই সাদা রঙের বড়ো তেতলা বাড়ি একখানা। মল্লিকদের বাড়ি। দোতলার জানলায় আলো জ্বলছে। জানলার সামনে যে দাঁড়িয়ে, তাকে এখান থেকেও স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। তার সোনার চশমা চিকচিক করছে, সিগারেটের আগুনটা দীপিত হয়ে উঠছে থেকে থেকে।
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হিমাংশুর কথা ভাবে গৌরী। দিনের পর দিন আরও স্থূল, আরও কর্কশ হয়ে উঠছে হিমাংশু। মধ্যে মধ্যে যখন সোহাগ করবার চেষ্টা করে, তখন ওর হাতের ছোঁয়ায় শরীর জ্বালা করতে থাকে। হিমাংশুর আঙুলগুলোকে একটা বিরাট মাকড়সার কতগুলো ক্লেদাক্ত পায়ের মতো মনে হয়। অন্ধকারেই নিজের নিটোল শুভ্র হাত দুখানি সে দেখতে পায়, সেই হাত দিয়ে তার নিজের গলাই জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করে। কাঠের রেলিঙে ভর দিয়ে গৌরী দাঁড়িয়ে থাকে, বুকের ভেতর নিজের রক্তের কলধ্বনি শুনতে পায়।
দোতলার জানলায় আগুনের একটা ঝলক ফুটে ওঠে কয়েক মুহূর্তের জন্য। আর একটা সিগারেট ধরিয়েছে লোকটা। হঠাৎ গৌরীর মনে হয়–আলোর বিন্দু-ছড়ানো এই অন্ধকারটা একটা বিরাট জালের মতো তাকে জড়িয়ে ধরছে। অসহ্য গরম লাগতে থাকে, হাওয়া বন্ধ হয়ে যায়, গৌরীর নিশ্বাস আটকে আসে। চঞ্চল হয়ে ফিরে আসে সিঁড়ির দিকে। নামতে নামতে মনে হয়–শ্যাওলায় শ্যাওলায় সিঁড়িটা ভরে গেছে, যেকোনো সময় পা পিছলে যেতে পারে।
ঘরের মেঝেতে তখন কুন্ডলী-পাকানো একটা কুকুরের মতো পড়ে আছে হিমাংশু। কোটরে-বসা চোখের কোনায় জলের দাগ। যে-দাদুকে সাত বছর বয়েসে শেষ বার দেখেছিল, তারই জন্যে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছে।
বেশ আছি, গৌরী ভাবে। তক্তপোশের কোনায় বসে কিছুক্ষণ বিস্বাদ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে হিমাংশুর দিকে। পুরু কালো ঠোঁটের ফাঁকে পানের রংধরা দাঁতগুলো ভ্যাংচানির ভঙ্গিতে বেরিয়ে আছে। বেশ আছি, বার বার কথাটা মাথার ভিতরে ঘুরতে থাকে গৌরীর। নিজের হাতের মুঠো চোখের সামনে মেলে ধরে যেন ভাগ্যরেখাটাকে পরীক্ষা করে দেখতে চায়। কিন্তু পরক্ষণেই সব গোলমাল হয়ে যায়। নরম গোল হাতখানিকে একটা ফুটন্ত পদ্মের মতো মনে হয়। দু-চোখ ভরে মুগ্ধতা নেমে আসে।
হিমাংশু নাক ডাকতে থাকে। মুখটা আরও খানিক ফাঁক হয়ে গেছে।
গৌরী চমকে উঠল। তরকারিটা প্রায় ধরে আসবার জো হয়েছে। আর দরজার কড়ায় পাগলের মতো ঝাঁকানি দিচ্ছে হিমাংশু। আধমরা আরশোলাটা চিত হয়ে পা নাড়তে নাড়তে অনেকখানি এগিয়ে এসেছে সামনের দিকে।
উঠে গিয়ে গৌরী দরজা খুলে দিল।
ভিতরে পা দিয়েই খিচিয়ে উঠল হিমাংশু।
ঘুমিয়ে পড়েছিলি নাকি এই সন্ধে বেলায়। সেই কখন থেকে কড়া নাড়ছি, শুনতে পাসনি?
ঘুমিয়ে পড়ব কী করে? রাস্তা থেকেই তো চ্যাঁচানি শুনছি।
হাতের ছাতাটা ধপাস করে ছুড়ে দিয়ে হিমাংশু দাওয়ার উপরে বসে পড়ল। বিড়ি ধরাল।
