স্ত্রীকে তুই বলেই সম্ভাষণ করে হিমাংশু। ওরা দুজন একই গ্রামের। দশ বছরের গৌরীর সঙ্গে সতেরো বছরের হিমাংশুর বিয়ে হয়েছিল। বিয়ের আগেকার সম্ভাষণটাই চলছে এই চৌদ্দ বছর ধরে।
ভাতের হাঁড়ি নামিয়ে রেখে উনুনে কড়াই চাপিয়ে দিলে। হিমাংশুর চিৎকার আর শোনা যাচ্ছে না। হয়তো চাপা গলায় আলোচনা করছে, কী প্ল্যানে টাকাটা আদায় করা যায়। কিংবা হয়তো সঙ্গীর সঙ্গে কথা কইতে কইতে এগিয়ে গিয়েছে বড়ো রাস্তার দিকে।
কড়াই থেকে কয়েক বিন্দু গরম তেল হঠাৎ ছিটকে এসে হাতে লাগল। মুখ বিকৃত করে গৌরী নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে দেখল এক বার। রান্নার ধোঁয়ায় ঝাপসা হয়ে-যাওয়া ইলেকট্রিক বালবটার লালচে ম্লান আলোতেও নিজের বাহুর দিকে তাকিয়ে পোড়ার যন্ত্রণা ভুলে গেল গৌরী, মুগ্ধদৃষ্টি কিছুক্ষণ থমকে রইল সেখানে। নিয়মিত সাবান পড়ে না, তিরতিরে কলের জলে স্নান পর্যন্ত হয় না ভালো করে, তবু পুষ্ট নিটোল হাতখানার দুধ আলতা রঙে এতটুকু মলিনতার ছায়া পড়েনি। একগাছা লাল কাচের চুড়ি আর একটি শাঁখাতেই সেই হাতখানা রাজরানির হাতের মতো দেখাচ্ছে।
শুধু গৌরীর চোখেই যে তা ধরা পড়েছে তা নয়। হিমাংশু নিজেই বলেছে কত বার।
ভাগ্যিস দশ বছর বয়সেই তোকে বিয়ে করে ফেলেছিলুম। নইলে এই রূপ নিয়ে তুই কি ফিরেও তাকাতিস আমার দিকে? কপালে লাথি মেরে দিয়ে কোন জমিদারের ঘরে গিয়ে উঠতিস।
ঠিক কথা। সত্যিই কি দশ বছর বয়েসের গৌরীকে দেখে কেউ ভুলেও ভাবতে পারত যে, এই মেয়ের ভিতরে এত রূপ লুকিয়ে আছে? কেউ কি কল্পনাও করতে পারত লক্ষীছাড়া চেহারার একটা ছোট্ট পাড়াগেঁয়ে মেয়ের ভিতর থেকে একদিন বেরিয়ে আসবে ইন্দ্রাণী? এ যেন রূপকথার গল্পের ব্যাঙের হঠাৎ রাজকন্যা হয়ে যাওয়া। সেই রাজকন্যা, যে হাসলে মানিক ঝরে, কাঁদলে মুক্তো।
তখন গৌরী নিয়মিত বছরে চার মাস ম্যালেরিয়ায় ভুগত। কাঠির মতো হাত-পা, লালচে একরাশ জংলা চুল, মড়ার মাথার মতো মাংসহীন মুখ, কোটরে ডুবে-থাকা দুটো অন্ধকার চোখ, গায়ের ক্যাটকেটে সাদা রং দৃষ্টিকে যেন আঘাত করত। কুশ্রীতাকে সম্পূর্ণ করবার জন্যে গলায় দুলত ঘামের সবুজ কলঙ্ক-মাখানো দুটো আমার মাদুলি।
আর ইশকুল থেকে তাড়া-খাওয়া হিমাংশু তখন বাপের সঙ্গে যজমানির অ্যাপ্রেন্টিস খাটত।
একটু কুঁজো, সারা মুখে বসন্তের দাগ, নাকটা পাখির ঠোঁটের মতো লম্বা। মাথায় বেয়াড়া ধরনের টেড়ি, তারসঙ্গে আরও বিসদৃশ টিকি একটা। এমন বিকট বেসুরো গলায় গান গাইত যে, হরির লুটের কীর্তন থেকে পর্যন্ত তাকে বরবাদ করে দেওয়া হয়েছিল।
এই দুজনের যখন বিয়ে হল, তখন গ্রামের রসিকেরা মন্তব্য করেছিল, একেই বলে রাজযোটক। বাসরঘরে গৌরীর দূর-সম্পর্কের এক বউদি গান গেয়েছিলেন, আহা, কী-বা মানিয়েছে রে, যেন শ্যামের বামে রাইকিশোরী, আহা কী-বা মানিয়েছে রে!
কিন্তু বছর দুয়েকের মধ্যেই গৌরী একটু একটু করে ফুটে উঠতে লাগল। তখন দু একজনের মনে হল, মেয়েটা একেবারে ধূমাবতী নয়—একটু ছিরিছাঁদও আছে ওর ভিতরে। আর এরমধ্যে একদিন বাপের সঙ্গে ঝগড়া করল হিমাংশু; মাথার টিকিটাকে গোড়া থেকে ক্যাঁচ করে কেটে দিয়ে পৈতৃক উত্তরাধিকারের মূলোচ্ছেদ করল, তারপর স্ত্রীকে নিয়ে রওনা হল কলকাতায়। দূর-সম্পর্কের এক আত্মীয়ের বাড়ির সমস্ত বিরক্তি আর বিতৃষ্ণার মধ্যেও জোর করে মাত্র আট মাস কাটিয়ে দিলে, তারপর আত্মীয়টির দৃষ্টান্তে ব্যবসায়ে নেমে পড়ল।
ব্যাবসা আর কিছু নয়, বিনা মূলধনে যা করা যায় তাই—দালালি। বাড়ি আর জমির দালালি।
খাটতে হয় বই কী। সকালেই বেরুতে হয় ছাতাটাকে বগলদাবা করে। তারপর মেটেবুরুজ থেকে বরানগর, বালি থেকে ব্যারাকপুর। কোথায় বাড়ি বিক্রি হচ্ছে, কোথায় তিন কাঠা দক্ষিণমুখো জমি সস্তায় পাওয়া যাবে, কোথায় তিনখানা নতুন ফ্ল্যাট তৈরি হচ্ছে, সব কিছু খবর রাখতে হয় হিমাংশুকে।
বলতে গেলে, কলকাতা আর আশপাশের কুড়ি মাইলের মধ্যে যত জমি আর ঘরবাড়ি আছে, হিমাংশু তার জীবন্ত এনসাইক্লোপিডিয়া।
কী বললেন স্যার? হাজরা রোডের জমি? ওই যে ব্যারিস্টার ঘোষের লালরঙের বাড়িটার লাগোয়া? নেবেন না স্যার, কখনো নেবেন না। আপনি ভালোমানুষ বলেই বলছি, ও-জমিতে বিস্তর ফ্যাঁকড়া আছে, গাঁটের কড়ি দিয়ে কিনে শেষে বিশ্রী লিটিগেশনে পড়ে যাবেন। কী বললেন? সার্চ করবেন? অনর্থক আবার অ্যাটর্নিকে এককাঁড়ি পয়সা দেবেন তো? আমি বলছি… শুনুন, উনিশশো পঁয়ত্রিশ সালে জেঠামল ভোজমল মাড়োয়ারি…
কিংবা—
জানি, জানি স্যার, ছাতু চক্কোত্তি লেনের নতুন ফ্ল্যাট দুটোর কথা বলছেন তো? ওর আদত মালিক হচ্ছে হরেরাম গায়েন, ক্যানিং-এ মাছের আড়ত আছে। বাড়ির চার্জে আছে ওদের ম্যানেজার কিষ্টপদ সাউ। সে স্যার সাংঘাতিক লোক, একটি রাঘববোয়াল, তাকে বাগানো আপনার কাজ নয়। দেখাই করবে না হয়তো। তবে আমাকে ভার দিন, দেখবেন সব ম্যানেজ করে দেব। একটা সিগারেট এগিয়ে দিয়ে বলব, কিষ্টদা ওবাড়ি আমার চাই-ই; ব্যাস, আর বলতে হবে না। আপনাদের আশীর্বাদে স্যার এই হিমাংশু ঘোষালের…।
সকলের এই আশীর্বাদ কুড়িয়ে বেড়ানো সহজ কাজ নয়। পার্টির বাড়িতে বাড়িতে ঘোরা আছে, অ্যাটর্নি আর উকিলের অফিসে দৌড়োদৌড়ি আছে। যে-পার্টির মন দ্বিধা-সন্দেহে দুলছে, দু-ঘণ্টা বক্তৃতা দিয়ে তার মন-ভেজানোর দায়িত্ব আছে। একটা ট্রানজাকশনের সময় দুটো পার্টিকে অ্যাটর্নির অফিসে হাজির করা কিংবা সময়মতো কোর্টে এনে জড়ো করা— এসবও যেন হিমাংশুর পিতৃদায়ের মধ্যে পড়ে। এমনকী ঠিকমতো কোর্ট-ফি কেনা হয়েছে কি না, সেদিকেও তার লক্ষ রাখতে হয়। কাজ তাতেও ফুরোয় না, তারপর সর্বশেষে আছে কমিশনের টাকা আদায় করা।
