গজকেষ্টবাবু প্রাণধনকে ধরতে পারলেন না–তার বদলে একটা পাহারাওলাকে ধরতে গেলেন।
আরে বাপ-ই ক্যা হৈ বলে পাহারাওলা পালাতে গিয়ে একটা ষাঁড়ের ঘাড়ে উলটে পড়ল। গজকেষ্টবাবু ষাঁড়টাকেই কামড়াতে যাচ্ছিলেন–সেই সময় আমরা সবাই মিলে ওঁকে চ্যাংদোলা করে নিয়ে এসে গাড়িতে তুললম। তারই ভেতর গজকেষ্টবাবু খ্যাঁচ করে আমার ডান কানটা কামড়ে দিলেন।
ভাগ্যিস আমাদের মধ্যে হাবুল মোটর চালাতে জানে। সেই তাড়াতাড়ি গাড়ি চালিয়ে পালিয়ে এল ওখান থেকে। নইলে গজকেষ্টবাবুকে ঠিক পুলিশে ধরে নিয়ে যেত।
কিন্তু এই কদিন হল গজকেষ্টবাবুর হাসি একদম বন্ধ হয়ে গেছে। গজকেষ্টবাবু আর হাসেন না–হাসির কথা শুনলে আর তেড়ে গিয়ে কাউকে আক্রমণ করেন না। বরং কোনও হাসির কথা বললে ভয়ে মুখ শুকিয়ে যায়–যেন বাঘ দেখেছেন, এমনিভাবে ছুটে পালান সেখান থেকে।
এই অঘটন ঘটিয়েছেন প্রাণধনবাবু।
হাঁ–প্রাণধনই ঘটিয়েছেন। একেবারে নির্মম প্রতিশোধ নিয়েছেন যাকে বলে।
প্রাণধনকে আমরা সবাই নিরীহ ভালোমানযু বলেই জানতুম। তাঁর মনে যে এত তেজ, প্রতিহিংসা আছে তা কে জানত।
সেদিন দেখি, রাস্তার মাথায় প্রাণধনবাবু তাঁর ভাগনে কানাইকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। কানাই দারুণ পালোয়ান–গোবরবাবুর আখড়ায় কুস্তি লড়ে। দুজনে মিলে ফিসফিস করে আলাপ চলছে। প্রাণধনের হাতে দেখলুম লেবেল-মারা একটা শিশি। তার গায়ে লেখা কুইনিন মিকশ্চার।
জিজ্ঞেস করলুম, হাতে কুইনিন মিকশ্চার কেন প্রাণধনবাবু? কারও অসুখ নাকি?
প্রাণধনবাবু ঠোঁটে আঙুল দিলেন। আমি দেখলুম দুলতে-দুলতে গজকেষ্টবাবু আসছেন।
প্রাণধনবাবুর মতলবটা কী বোঝবার চেষ্টা করছি, ঠিক সেই সময় কানাই গলা ছেড়ে গর্দভ রাগিণীতে গান ধরল :
এক যে ছিল গাধা
পেন্টুলুন কিনবে বলে
আদায় করত চাঁদা
যেই গেয়েছে–মাঝপথে অমনি দাঁড়িয়ে পড়েছেন গজকেষ্টবাবু। কানাই আরও গলা চড়িয়ে গাইতে লাগল :
বলত সেই গাধা :
চার আনা করে সবাই আমায়
দিয়ে যাবেন দাদা—
–হৌ-হৌ–হৌ-হোয়া বলে গগনভেদী অট্টহাসি হাসলেন গজকেষ্টবাবু-তার পরই দমদম বুলেটের মতো তেড়ে এলেন কানাইয়ের দিকে।
কানাইও তৈরিই ছিল। হা-রে-রে-রে বলে হাঁক ছেড়ে সে তক্ষুনি ধপাক করে গজকেষ্টবাবুকে ধরে ফেলল, তারপর পাক্কা কুস্তিগিরের মতো একখানা ধোপিয়া পাটের পাঁচ লাগিয়ে সোজা ফেলে দিলে রাস্তার ওপর। গজকেষ্টবাবুকে একেবারে চিত করে ফেলে কানাই তাঁর ওপর চেপে বসল।
গজকেষ্টবাবু ভীষণ ভেবড়ে গেলেন। এতকাল হাসতে হাসতে তিনিই সকলকে আক্রমণ করেছেন, পালটা এমন বেয়াড়া কুস্তির প্যাঁচের জন্যে আদৌ তৈরি ছিলেন না। তাঁর হাসি বন্ধ হয়ে গেল।
কিন্তু তাঁর হাসি বন্ধ হলে কী হয়-কানাই ছাড়বার পাত্র নয়। সে গজকেষ্টবাবুর ভূঁড়িতে আর পাঁজরায় বেদম সুড়সুড়ি দিতে লাগল। গজকেষ্টবাবু প্রাণের দায়ে খ্যাঁ-খাঁ করে হাসতে লাগলেন–চোখ দুটো তাঁর কপালে চড়ে গেল।
আর তখন
ঠিক সেই মুহূর্তেই
কুইনিন মিকশ্চারের ছিপি খুলে তার সবটা গজকেষ্টবাবুর মুখের ঢেলে দিলেন প্রাণধন। গজকেষ্ট কেবল বলতে পারলেন : ওয়া ওয়াং।
তারপরই প্রাণধন আর কানাই দেখতে না-দেখতে একদৌড়ে হাওয়া! গজকেষ্ট রাস্তার মধ্যে পড়ে রইলেন গজকচ্ছপের মতো। আমি ছুটে গিয়ে গজকেষ্টবাবুকে তুলে বসালুম। গজকেষ্ট বিকট স্বরে বললেন, ওয়াফ-ওয়াফ। বাপরে কী তেতো! প্যালা–সিরাপ এক বোতল–কুইক। ওয়াফ-ওয়াফ।
.
গজকেষ্টবাবু আর হাসেন না। তাঁর সেই মারাত্মক হাসি একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে।
এমন ভয়ঙ্কর দাওয়াইয়ের পর আর কি হাসি আসে কারও? তোমরাই বলো।
গিলটি
গলির মুখ থেকেই হিমাংশু ঘোষালের গলার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছিল। রান্নাঘরে ভাতের হাঁড়ি থেকে ফেন গালতে গালতে সব কথাই স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিল গৌরী। ওই একটা গুণ আছে হিমাংশুর, কখনো আস্তে কথা বলতে পারে না। অত্যন্ত খুশি হয়ে যখন সে ঘরোয়া আলাপ শুরু করে, তখন এপাড়ার কোনো নতুন লোক তা শুনলে সন্দেহ করে একটা নরহত্যার জন্যেই বুঝি তৈরি হচ্ছে হিমাংশু।
রান্নাঘর থেকেও গৌরী বুঝতে পারল, গলির মুখে কানা চোখের মতো ঘষা আলোর গ্যাস পোস্টটার নীচে দাঁড়িয়ে পড়েছে হিমাংশু। চিৎকার করে আলাপ করছে কারও সঙ্গে।
আমার টাকা মেরে দেবে? হক্কের পাওনা ঠকিয়ে নেবে আমার? গলায় গামছা দিয়ে সব টাকা আদায় করে ছাড়ব, তবে আমার নাম হিমাংশু ঘোষাল।
গৌরী জাকুটি করল। রান্নাঘরের মেজেয় ছোটো-বড়ো অসংখ্য গর্ত। হাঁড়ি থেকে গড়িয়ে পড়া ফেন জমা হচ্ছে তাদের মধ্যে। এই দিনদুপুরেই প্রায়ান্ধকার ঘরের এখান-ওখান থেকে কয়েকটা আরশোলা উঁকি মারছিল। অর্থহীন বিদ্বেষে একটা খুন্তির ডগায় খানিক গরম ফেন তুলে নিয়ে গৌরী ছিটিয়ে দিলে তাদের দিকে। একটা আরশোলা চিত হয়ে পড়ল সঙ্গে সঙ্গে, অন্তিম যন্ত্রণায় পা ছুঁড়তে লাগল।
হাজার টাকা মাইনে পান। মোটরে চড়ে ঘুরে বেড়ান! ওঃ, ওরকম বড়ো সায়েব বিস্তর দেখা আছে আমার! আজ বারো বছর লোক চরিয়ে খাচ্ছি এই কলকাতা শহরে, ঘাড়ে ধরে যদি ও-টাকা আদায় করতে না পারি তাহলে…
তাহলে একটা ভয়ংকর কিছু করে ফেলবে হিমাংশু। কিন্তু কী করবে? গৌরী জানে হিমাংশুর দৌড় কতখানি। দাওয়ায় বসে বিড়ি টানতে টানতে গজগজ করবে, গালাগাল করবে, অশ্লীলতম ভাষা ব্যবহার করবে, তারপর একদিন সম্পূর্ণ ভুলে যাবে। ছাতাটা বগলে নিয়ে বেরুবার সময় গৌরীকে আশ্বাস দিয়ে বলবে, আড়াইশো টাকার ফ্ল্যাট, এক মাসের ভাড়া আমার কমিশন। যদি বাগাতে পারি, একটা মাস পায়ের উপর পা তুলে দিয়ে চলে যাবে–কী বলিস?
