পেলি চামড়া?
নাঃ! নীলাইয়ের বুকের ভেতর থেকে ঝোড়ো হাওয়ার মতো শব্দ করে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল, আজ এল না ব্যাপারীরা। এবার কপালে কী আছে কে জানে। সকালে ঘোষগাঁয়ে ঢোল বাজিয়ে এলাম, আট গন্ডা পয়সা দিলে। কিন্তু এভাবে ক-দিন চলবে। আচ্ছা, যুদ্ধ কবে থামবে বলতে পারিস?
মহুয়ার ঝিরঝিরে হাওয়াটা বড়ো আরাম বুলিয়ে দিচ্ছে শরীরে। চোখে যেন ঘুম জড়িয়ে ধরে। কিন্তু নীলাইয়ের কথাগুলো এই নিশ্চিন্ত প্রশান্তির মাঝখানে সাঁওতালি তিরের মতো এসে বেঁধে, বিষ বর্ষণ করে। মনে পড়ে যায় ওর মামাতো ভাই বিষ্ণুকে বুনো শুয়োরে গুতিয়ে মেরেছিল, পেটের চামড়া ছিঁড়ে নাড়িভুড়িগুলো ঝুলে পড়েছিল বাইরে। চৌকিদার আলি মহম্মদকে ডাকাতেরা ধরে জবাই করে দিয়েছিল, রক্তাক্ত গলাটা আধ হাত ফাঁক হয়েছিল একটা রাক্ষুসে হাঁ-এর মতো। নীলাইয়ের সর্বাঙ্গ ঘিরে যেন যত অপঘাত, যত অপমৃত্যু আর যত অভিশাপ এসে প্রেতের মতো ছায়া ফেলেছে।
যুদ্ধ কবে থামবে ভগবান জানেন!
তা বটে। ভগবান জানেন— ভগবান! হিংস্রভাবে কথাটার প্রতিধ্বনি করলে নীলাই। ঘরের ভেতর থেকে তামাক সেজে নিয়ে এল ওর বউ। চকিতের জন্যে মিতানের সরু সরু পা দুটো চোখে পড়ল খেতুর। কী অসম্ভব রোগা, এত রোগা হয়ে গেছে বউটা! মুখের দিকে তাকাতে ভরসা হয় না, অকারণে চেতনাকে চমকে দিয়ে মনে হল মুখে হয়তো সেই মড়ার খুলিটার সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যাবে। ভোমরা এখনও তাজা আছে, এখনও যৌবনের ঐশ্বর্যে টলমল করছে সে। কিন্তু…
দা-কাটা তামাকের উগ্র গন্ধটা লোভনীয়। কিন্তু হুকোতে একটা টান দিয়েই খেতু সেটা বাড়িয়ে দিলে নীলাইয়ের দিকে।
না মিতা, খা তুই। কিছু ভালো লাগছে না আমার।
ভালো লাগছে না কারোরই। ভালো লাগবার কথাও নয়। অন্যমনস্কভাবে নীলাই কলকেটাকে উবুড় করে দিলে। তারপর তাকিয়ে রইল দূরে খেতুর অস্থিসার বলদ দুটোর দিকে। যা চেহারা ওদের, বেশিদিন আর বাঁচবে না। ওই দুটো গোরুর চামড়া পেলে…
খেতু বললে, নাঃ, উঠি এবার। চার ক্রোশ ঘাঁটা যেতে হবে।
বস, মিতা, বস। এত তাড়া কীসের? তুই তো সুখী মানুষ, একদন্ড নয় এখানে বসেই যা। ঘরে ঠাণ্ডা আছে, গলাটা একটু ভিজিয়ে যাবি নাকি?
ঠাণ্ডা? তাড়ি? মুহূর্তে সমস্ত মনটা নেচে উঠল। কিন্তু তাড়ির নেশায় ধরলে সব কাজ একেবারে পন্ড। বহু টাকার মাল রয়েছে গাড়িতে। রাতবিরেতে সাঁওতাল পাড়ার পথঘাট আজকাল একেবারেই ভালো নয়। অভাবের তাড়নায় লোকগুলো খেপে রয়েছে হন্যে কুকুরের মতো। কায়দায় পেলে লুটেপুটে নেওয়া আদৌ অসম্ভব নয়।
এত গরমে একটুখানি ঠাণ্ডা পেলে তো বেঁচে যাই। কিন্তু নেশা ধরে গেলে সব মাটি হয়ে যাবে রে। পথ ভারি খারাপ আজকাল।
একটুখানি গলা ভিজিয়ে যাবি, নেশা হবে কেন।
তা, তা মন্দ নয় কথাটা। সলোভে খেতু চাটল ঠোঁট দুটো।
মাটির ভাঁড়ে করে এল গাঁজিয়ে-ওঠা তালের রস। আর কটুগন্ধী সেই অম্লমধুর অমৃত পেটে পড়তেই খেতু ভুলে গেল সমস্ত। রোহনপুরের ইস্টিশন, মাল বোঝাই গাড়ি, রাত্রির অন্ধকারে শঙ্কাসংকুল সাঁওতাল পাড়া-কোনো কিছুই আর মনে রইল না। ভাঁড়ের পর ভাঁড় উজাড় করে নেশায় আর ক্লান্তিতে খেতুর সর্বাঙ্গ ঝিমিয়ে এল অতি গভীর অবসাদে। কী ঠাণ্ডা ছায়া পড়েছে নীলাইয়ের দাওয়ায়, আর কী মিষ্টি হাওয়া দিচ্ছে মহুয়ার কচি কোমল পাতাগুলো।
তারপরে বেলা গড়িয়ে এল, সূর্য নামল পশ্চিমের দিগন্তে। মহুয়া পাতার ফাঁক দিয়ে বিকেলের রাঙা আলো বাঁকা হয়ে খেতুর মুখের ওপরে এসে পড়তেই যেন আচমকা ভেঙে গেল ঘুমটা। ধড়মড় করে উঠে বসল খেতু। তাই তো, বেলা একেবারে নেমে পড়েছে যে। রাতদুপুরের আগে আর ইস্টিশনে পৌঁছোনো চলবে না।
সামনে বসে নির্বিকার মুখে বিড়ি খাচ্ছে নীলাই।
ইস! কী ঘুমটাই ঘুমোলি মিতা। বেলা একবারে কাবার।
হাত-পা কাঁপছে, মাথাটার ভার যেন বইতে পারা যায় না। হঠাৎ নীলাইয়ের ওপর একটা বিজাতীয় ক্রোধে খেতুর মনটা বিষাক্ত হয়ে উঠল।
তুই তো আমাকে এই ফ্যাসাদে ফেললি। কতদূরে যেতে হবে এই রাত্তিরে—দ্যাখ তো। ও কী!
ভয়ে বিস্ময়ে খেতুর চোখ বিস্ফারিত হয়ে উঠল আর পাথরের মতো শক্ত হয়ে উঠল নীলাইয়ের মুখ—বলদ দুটো এমন করছে কেন?
দ্রুত পায়ে খেতু ছুটে এল বলদের কাছে। একটা তখন হাত-পা ছড়িয়ে নিঃসাড় হয়ে পড়ে আছে, দুটো চোখের ওপর নেমেছে সাদা পর্দা। সারা গায়ে ভনভন করে উড়ছে মাছি। আর একটা অন্তিম চেষ্টায় আকাশের দিকে মুখ তুলে নিশ্বাস টানছে, জিভ বেরিয়ে এসেছে, কালো দীর্ঘায়ত চোখের কোনায় টলমল করছে অশ্রুর বিন্দু।
আমার বলদ মরে গেল! আর্ত কণ্ঠে চিৎকার করে খেতু আছড়ে পড়ল বলদের গায়ে। চর্মসার প্রকান্ড পাঁজরার হাড়গুলো মটমট করে উঠল বুকের চাপে।
নীলাই নিরাসক্ত গলায় বললে, যে গরম, সর্দি-গরমি…
সর্দি-গরমি? ছিলে-ছেড়া ধনুকের মতো খেতু বিদ্যুদবেগে দাঁড়াল সোজা হয়ে।
সামনে একটা মাটির পাত্রে ভুসি-মেশানো হলুদ রঙের খানিকটা দুর্গন্ধ জল। এই জল কে খেতে দিয়েছিল বলদকে, কে দিয়েছিল!
সর্দি-গরমি? শালা, চামড়ার লোভে আমার গোরুকে বিষ খাইয়েছিস, বিষ খাইয়েছিস তুই। শালা গো-হত্যাকারী, আমি খুন করব, খুন করে ফেলব তোকে। খেতুর গলা চিরে আকাশের বাজ গর্জে উঠল, আজ যদি তোর রক্ত না দেখি তা হলে ভুইমালীর বাচ্চা নই আমি।
