বেলা গড়িয়ে এল, সন্ধ্যার ঘন ছায়া নিঃশব্দে নামল মাটিতে। কালো রাত্রির ভেতরে গা ঢাকা দিয়ে হরিলাল খেতুর দরজায় এসে দাঁড়াল। হরিলাল জানে ভোমরা তাকে ফেরাতে পারবে না, নিজেকে বাঁচাতে পারবে না তার কঠিন মুষ্টির নিষ্ঠুর নিষ্পেষণ থেকে। তার হাতে যে-খড়ঙ্গ উদ্যত হয়ে আছে, খেতুকে বধ করতে তার একটি মাত্র আঘাতই যথেষ্ট।
অন্ধকারের বুক বিদীর্ণ করে বহু দূরে উত্তরের আকাশটা বিচিত্র রক্তিম ছটায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। যেন ছড়িয়ে পড়ল সদ্যোনিহত একটা মানুষের টাটকা রক্ত। কোথাও আগুন লেগেছে নিশ্চয়।
খাঁড়ামশাই
বংশীবদন খাঁড়ার ছেলে হংসবদন–যার ডাকনাম চিচিঙ্গে–সে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি এল।
ঝোলাগুড়ের ব্যবসায়ী বংশীবদন তখন নাকের নীচে চশমা নামিয়ে দুশো বত্রিশ মন গুড়ের হিসেব করছিলেন। বিরক্ত হয়ে বললেন, ক্যা হয়েছে রে চিচিঙ্গে? অমন করে শেয়ালের বাচ্চার মতো কাঁদছিস কেন?
শেয়ালের বাচ্চা নিশ্চয় ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদে না, কিন্তু বংশীবদন ওসব গ্রাহ্য করেন না। আর কী–কে–এগুলোকে তিনি ক্যা বলেন।
চিচিঙ্গে বললে, হেডমাস্টার কেলাসে তুলে দেয়নি।
-ক্যা বললি?
–হেডমাস্টার আমাকে
ঠাঁই করে বংশীবদন একটি চড় বসিয়ে দিলেন চিচিঙ্গের গালে। বললেন, পাঁঠার বাচ্চা কোথাকার! হেডমাস্টার! তোর গুরুজন না? বিদ্যের গুরু। বাপের চেয়েও বড়। কেন, মাস্টারমশাই–হেডস্যার এইসব বলতে পারিসনে? তুলে দেয়নি নয় তুলে দেননি। মনে থাকবে?
চড় খেয়ে চিচিঙ্গের কান্না বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। গোঁজ হয়ে, ঘাড় নেড়ে সে জানাল-মনে থাকবে
বংশীবদন বললেন, কিন্তু ক্যা হয়েছে? কেন দেননি ওপর-কেলাসে তুলে?
–আমি অঙ্ক আর ভূগোলে পাশ করতে পারিনি। সবাই বলছে, তুই পেসিডেনের ছেলে হয়ে
বংশীবদন রেগে আগুন হয়ে গেলেন : আমার বাপের নামে ইস্কুল, আমি জমি দিইছি, বাড়ি করে দিইছি–আর আমার ছেলেকেই ফেল করানো? আচ্ছা, তুই ভেতরে যা–আমি দেখছি।
চিচিঙ্গে ভেতরে চলে গেলে বংশীবদন তক্ষুনি একটা চিঠি লিখলেন হেডমাস্টার শ্রীনাথ আচার্যিকে। লিখলেন, মহাশয়, অবিলম্বে আমার সঙ্গে দেখা করিবেন। আর চিচিঙ্গির কেলাসের একখানা ভূগোল আর একখানা অঙ্কের প্রশ্নপত্র সঙ্গে লইয়া আসিবেন।
হেডমাস্টার আচার্যিমশাই তখন কেবল প্রমোশন দিয়ে, খুব ক্লান্ত হয়ে, নিজের ঘরে বসে হুঁকোয় টান দিয়েছেন। এমন সময় বংশীবদনের লোক ভূষণ মণ্ডল চিঠিটা এনে হাজির করল। বললে, বাবু আপনাকে এক্ষুনি যেতে বলেছেন।
–যাচ্ছি–তটস্থ হয়ে হেডমাস্টার বললেন, তুমি এগোও, আমি আসছি।
ভূষণ চলে গেল। তামাক খাওয়া মাথায় রইল, হুঁকো নামিয়ে হেডমাস্টার ডাকলেন, ওহে বিমল!
বিমলবাবু ইস্কুলের জুনিয়ার টিচার। কিন্তু ছেলেমানুষ হলে কী হয়, যেমন বুদ্ধিমান, তেমনি চটপটে। খুব ভালো পড়ান। সব কাজেই হেডমাস্টার তাঁর পরামর্শ নেন।
বিমলবাবু আসতেই হেডমাস্টার বললেন, দ্যাখো কাণ্ড। খাঁড়ামশাই ডেকে পাঠিয়েছেন। তখনই তোমায় বললুম, প্রেসিডেন্টের ছেলে দিয়ে দিই প্রমোশন কী হবে ঝামেলা করে। কিন্তু তোমার কথায় ওকে আটকে দিলুম, এখন
বিমলবাবু বললেন, স্যার, স্কুলের একটা নিয়ম তো আছে। প্রেসিডেন্টের ছেলে তো কী হয়েছে, ফেল করলেও প্রমোশন দিতে হবে? তাহলে গরিবের ছেলেরা আর কী দোষ করল–সব্বাইকে তো পাশ করিয়ে দেওয়া উচিত।
–আরে, উচিত-অনুচিত আর মানছে কে। যার টাকা আছে ওসব তার বেলায় খাটে না। এখন খাঁড়ামশাই যদি খেপে যান, তাহলে আমাদের অবস্থাটা ভাবো। তাঁর টাকায় স্কুল, তিনি প্রেসিডেন্ট। এদিকে সায়েন্স ব্লকের জন্যে সামনের মাসে পনেরো হ্যাজার টাকা দেবেন কথা আছে। এখন যদি বিগড়ে যান, আমরা মারা পড়ে যাব।
বিমলবাবু মাথা নেড়ে বললেন, আমার তা মনে হয় না স্যার। খাঁড়ামশাই অত অবিবেচক নন। টাকা অনেকেরই আছে, কিন্তু এরকম মহৎ মানুষ দুজন দেখা যায় না। স্কুল করেছেন, হেলথ সেন্টার খুলিয়েছেন, দুমাইল রাস্তা করেছেন। নিজেদের খরচে গ্রামের লোকের জন্যে তিনটে টিউবওয়েল করে দিয়েছেন। কত লোককে যে দুহাতে দান করেন তার হিসেব নেই। তিনি নিশ্চয় বুঝবেন।
ব্যাজার মুখে হেডমাস্টারমশাই বললেন, কে জানে! সেকেলে লোক, মেজাজের থই পাওয়া শক্ত। যা হোক, তুমিও চলে। তুমি সঙ্গে থাকলে একটু ভরসা পাব।
আচ্ছা, চলুন—
দুজনে গিয়ে হাজির হলেন খাঁড়ামশাইয়ের বাড়িতে।
বংশীবদন দুশো বত্রিশ মন ঝোলা গুড়ের কতটা ইঁদুর খেয়েছে, নাগরি ফুটো হয়ে কতটা নষ্ট হয়েছে, কতটাই বা আরশোলা-পিঁপড়ের পেটে গেছে–এইসব লোকসানের হিসেবের মধ্যে তলিয়ে ছিলেন। হেডমাস্টার আর বিমলবাবুকে দেখে প্রথমটায় বললেন, ক্যা ব্যাপার, আপনারা বলতে বলতেই তাঁর চিচিঙ্গের কথাটা মনে পড়ে গেল।
বসুন, বসুন। তারপরেই বিনা ভূমিকায় তাঁর সোজা জিজ্ঞাসা : চিচিঙ্গে ওপরের কেলাসে উঠতে পায়নি কেন?
হেডমাস্টামশাই একটা ঢোক গিলে বললেন, আজ্ঞে, ও অঙ্কে আর ভূগোলে ফেল করেছে।
কত পেয়েছে?—
অঙ্কে সাত। ভূগোলে বারো।
–হুঁম।–বংশীবদন গম্ভীর হয়ে গেলেন। তারপর বললেন, ওদের কেলাসের যে দুটো কোশ্চেন আনতে বলেছিলুম, এনেছেন?
আজ্ঞে এনেছি–বিমলবাবু তক্ষনি দুখানা প্রশ্নপত্র এগিয়ে দিলেন খাঁড়ামশাইয়ের হাতে।
