একটা পান খাওয়াতে পারিস খেতুর বউ?
না চাপা শক্ত গলায় ভোমরা জবাব দিলে, পান নেই।
হরিলাল মৃদু হাসল, চোখ দুটো ঝলক দিয়ে উঠল এক মুহূর্তের জন্যে। তৈলাক্ত গোলাকার গালের ওপর দুটো বৃত্ত ফুটে উঠেই মিলিয়ে গেল। মুখে সামনের পাটিতে একটা তীক্ষ্ণধার গজদন্ত চকিতের জন্যে আত্মপ্রকাশ করলে।
তবে থাক, পানের দরকার নেই।
হরিলালের হাতখানা কঠোরভাবে মুষ্টিবদ্ধ হয়ে উঠল। খেতুকে বলে দিস ঋণ সালিশির মামলাটায় ওর জন্যে বোধ হয় কিছু করা যাবে না।
ভোমরার বুকের ভেতর ধড়াস করে যেন ভারী একখানা পাথর এসে পড়ল। হরিলালের হাতে শানিত খঙ্গ হত্যার উল্লাসে ঝকঝক করে উঠেছে। রামসই ঋণ সালিশি বোর্ডের সে প্রতিপত্তিশালী সদস্য, চেয়ারম্যান তার খাতক। আর বলদ কিনবার জন্যে ইদ্রিস মিয়ার কাছ থেকে যে বাহান্ন টাকা ধার করেছিল খেতু, সে-মামলা এখনও ঝুলে রয়েছে রামসই ঋণ সালিশি বোর্ডেই। হরিলালের একটি মাত্র ইঙ্গিতে বলদ দুটি বিক্রি করে দিয়ে কালকেই হয়তো কিস্তি শোধ করতে হবে খেতুকে। আরও কত কী হতে পারে একমাত্র হরিলালই তা
জানে।
বসুন, পান দিচ্ছি।
হরিলাল আবার হাসল। বিনা শর্তে আত্মসমর্পণ, একটি মাত্র অস্ত্র দেখিয়েই জয়লাভ। এমন অসংখ্য অগণ্য অস্ত্র আছে হরিলালের, যা খেতু কোনোদিন কল্পনাও করতে পারে না।
নাঃ থাক। আমারও কাজ আছে, উঠতে হবে। খেতু বাড়ি আসবে কখন?
ভোররাতে।
হরিলাল এগিয়ে এল অসংকোচে এবং নির্ভয়ে। বিস্তারিত ভূমিকা বা ভণিতা সম্পূর্ণ অনাবশ্যক এখন—সে কাজের মানুষ। নীরব আর নির্জন বাড়ি। ঝাঁঝাঁ রোদে ঝিমিয়ে পড়েছে সমস্ত। পেছনের আম গাছে একটা পাখি ডাকছে, বউ কথা কও।
লোলুপ আর কঠিন মুষ্টি একখানা মাংসাশী থাবার মতো ভোমরার হাত আঁকড়ে ধরলে। মট করে উঠল একগাছা কাচের চুড়ি, দু-টুকরো হয়ে পড়ে গেল মাটিতে। চাপা রুদ্ধ গলায় হরিলাল বললে, সন্ধের পরে আমি আসব। কোনো ভয় নেই তোর।
ভোমরার সর্বাঙ্গে যেন একটা বিষধর সাপ পাকে পাকে জড়িয়ে জড়িয়ে ধরেছে। নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে, মুখ দিয়ে কথা ফুটতে চায় না। শুধু তার আতঙ্কবিহ্বল মুখের ওপর সাপের প্রসারিত ফণা দুলছে, লাল টকটকে চোখ দুটো জ্বলছে, যেন আগুনের বিন্দু। কিন্তু চোখ সাপের নয়, হরিলালের।
কোনো ভাবনা নেই। টাকাপয়সা-কাপড়-চুড়ি যা চাস। কিন্তু সন্ধের পরে আমি আসব।
ভোমরার মুখ দিয়ে কথা ফুটল না।
না-ফুটল, কী আসে-যায় তাতে। নিপুণ ঘাতক হরিলাল, তার অস্ত্রের আঘাত অব্যর্থ আর অনিবার্য। বাহান্ন টাকার মামলাটা ভুলে থাকা এত সহজ নয় খেতুর পক্ষে। আরও একটু প্যাঁচ কষালে খেতুই উপযাচক হয়ে ভোমরাকে তার ঘরে পৌঁছে দিয়ে যাবে। এমন সে অনেক দেখেছে। কিন্তু কী দরকার অতটা করে। হাঙ্গামা তার ভালো লাগে না। সকলের সঙ্গে যথাসম্ভব ভালো ব্যবহার করতেই সে ভালোবাসে—লোক একেবারে খারাপ নয় হরিলাল।
একখানা বড়ো মাঠ পেরোলেই সামনে মুচিপাড়া। আকাশের রোদ যেন আগুনের মতো গলে গলে পড়ছে। ময়লা গামছায় খেতু কপালটা মুছে ফেললে। চারিদিকের মাঠে-ঘাটে চলেছে অদৃশ্য অগ্নিযজ্ঞ। এখনও মেঘ দেখা দিল না, বৃষ্টি নামল না এক পশলা! কবে যে লাঙল পড়বে মাঠে! ধান রোয়ার সময় চলে গেল, অসময়ে বৃষ্টি পড়লে ফসল বুনেই-বা কী লাভ। ধানে ঝুলন লাগবে না, হাজা ধরে শুকিয়ে যাবে সমস্ত।
কেমন একটা অশুভ আশঙ্কায় মনটা ভারী হয়ে উঠল খেতুর। পথের পাশে আলের ওপর সাদা ধবধবে একটা নরকঙ্কাল; দৃষ্টিহীন চোখের কালো গহ্বরের ভেতর দিয়ে ওর দিকে যেন প্যাটপ্যাট করে তাকিয়ে আছে। কোনো গোরস্থান থেকে শেয়াল টেনে এনেছে নিশ্চয়ই।
ডাঁ-ডাঁ-ড্ডাঁহিন।
গোরুর লেজে মোচড় লাগল, আকস্মিকভাবে ছুটতে শুরু করলে গাড়িটা। বাঁ-দিকের বলদটার রক্তাক্ত কাঁধের ওপর ডাঁশগুলো ভনভন করে উড়তে লাগল।
মুচিপাড়ার সামনে আসতেই মনে পড়ে গেল টাকা দুটোর কথা। আজকেই শোধ দেবার কথা বলেছিল নীলাই। কিন্তু নীলাইয়ের সেই মুখোনা কল্পনা করতেই গায়ের মধ্যে কেমন করে উঠল। কালকের দিনটা কি সেইজন্যই কাটল অনাহারে।
হাঁক দিতেই নীলাই বেরিয়ে এল ঘর থেকে। খুশি হয়ে বললে, মিতা যে! কোথায় চললি আবার?
মাল নামাতে যাব, রোহনপুরে। টাকা দুটো দিবি বলেছিলি।
টাকা? সে হবে। আয় বোস, তামাক টেনে যা এক ছিলিম।
নীলাইয়ের চেহারায় অনেক পরিবর্তন চোখে পড়ছে আজকে। কথার ভঙ্গিতে আবার যেন পুরোনো মিতাকে খুঁজে পাওয়া গেল। হয়তো চামড়া পেয়েছে কিছু অথবা সেই দুটো টাকাই এমন রূপান্তর ঘটিয়েছে তার। কিন্তু কারণ যা-ই হোক, মনের ওপর থেকে মস্ত একটা ভার যেন নেমে গেল খেতুর।
কিন্তু এখন গাড়ি বাঁধতে পারব না। মাল আছে সঙ্গে।
রেখে দে তোর মাল। নীলাই ভঙ্গি করলে, আধ ঘণ্টা বসে গেলে এমন কী হবে! যা রোদ্দুর, গোরু দুটোকেও একটু জিরোন দে বরং। কালকে তুই এলি অথচ তোকে একটু তামাক খাওয়াতে পারলাম না, ভারি খুঁতখুঁত করছে মনটা।
সত্যিই অসম্ভব রোদ। বেলাটা একটু ঠাণ্ডা না হলে গাড়ি হাঁকানো শক্ত। বলদগুলোর ভারী ভারী নিশ্বাস পড়ছে, দেখলেও কষ্ট হয়। তা ছাড়া কী চমৎকার নীলাইয়ের ঘরের দাওয়াটা। মহুয়া গাছের ছায়া পড়েছে, ঝিরঝির করে গান গাইছে পাতা। তালদিঘি থেকে ভিজে হাওয়া উঠে আসছে। শুধু বসা নয়, খানিকটা গড়িয়ে নিতেও ইচ্ছে করে। বলদ দুটোকে ছেড়ে দিয়ে খেতু এসে বসল।
