এখন আবার চান করলি যে? এই অবেলায়?
ঝিনুক কুড়তে গিয়েছিলাম।
ঝিনুক কুড়তে! খেতুর কপাল উঠল রেখাসংকুল হয়ে, আরও বেশি অস্বস্তিতে মনটা আচ্ছন্ন হয়ে গেল। আজকে ঝিনুক দিয়ে কী হবে?
হরিলাল টাকা দিয়ে গেছে। পাঁচ সের চুনের বায়না।
হরিলাল। সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত বিরক্তি ঝিমিয়ে পড়ল, ধুলোপড়া-খাওয়া সাপের মতো মাথা নত করল যা-কিছু উত্তেজনা। নামটার যাদু আছে। হরিলাল দাস এ গ্রামের শুধু মোড়ল নয়, মন্ডলেশ্বর; মহারাজ চক্রবর্তী বললেও অত্যুক্তি হবে না কথাটা। উপকার কী করে বলা শক্ত, তবে অপকারের ক্ষমতা যে তার সীমানাহীন এ সম্বন্ধে কোনো প্রমাণপ্রয়োগই দরকার হয় না। এহেন হরিলাল ঘটা করে মেয়ের বিয়ে দেবে, উপচার অনুষ্ঠানে এতটুকুও ফাঁক রাখবে না কোথাও। পাঁচ সের চুনের বায়না না নিয়ে উপায় কী।
ও। কিন্তু তুই যে খেটে মরে যাবি বউ।
ভোমরা মৃদু হাসল, বিস্বাদ নিরানন্দ হাসি। তারপর কাপড় ছাড়বার জন্যে চলে গেল ঘরের ভেতর। অসীম ক্লান্তিতে দাওয়ার একটা খুঁটিতে হেলান দিয়ে বসে পড়ল খেতু।
খিদেয় মরে যাচ্ছি। তাড়াতাড়ি দুটি খেতে দে ভোমরা।
একটা মাটির ঘটিতে করে জল আর কচুপাতায় খানিকটা নুন এনে ভোমরা রাখল খেতুর পাশে। সেদিকে তাকিয়ে আপনা থেকেই খেতুর দীর্ঘশ্বাস পড়ল। কাঁসা আর পিতল যা ছিল সব বন্ধক গেছে, ঘরের লক্ষী আর কোনোদিন ঘরে ফিরবে না।
ওদিকে রান্নাঘরের ঝাঁপ খুলেই ভোমরা থেমে দাঁড়াল, আর নড়ে না।
কী রে, হল কী?
কী জবাব দেবে ভোমরা? পেছন দিকের জিরজিরে বেড়া ফাঁক করে কখন ঘরে ঢুকেছিল কুকুর। হাঁড়ি-কলসি সব ভেঙে একাকার করে দিয়েছে, রাশি রাশি ভাত আর ডাল ছড়িয়ে রয়েছে ঘরময়। ডাল-মেশানো কর্দমাক্ত মাটিতে এখনও ফুটে রয়েছে কুকুরের নোংরা পায়ের এলোমেলো থাবার দাগ। ঝিনুক আনতে যখন সে বিলের দিকে গিয়েছিল, সেই ফাঁকেই কখন…
ব্যাপারটা দেখে খেতুও স্তব্ধ হয়ে রইল। দোষ নেই কারোরই—পাঁচ সের চুনের বায়না দিয়ে গেছে হরিলাল। ভোমরাকে কষে একটা লাথি মারবার জন্যে হিংস্র একটা পা তুলেই নামিয়ে নিলে খেতু। এক মুহূর্ত জ্বলন্ত চোখে তাকিয়ে থেকে বললে, বেশ।
বিবর্ণ পাড়ুর মুখে ভোমরা বললে, তুমি বসো, আমি আবার চারটি…
থাক থাক, চাল সস্তা নয় অত। কত লোক না খেয়ে মরে যাচ্ছে, খবর রাখিস তার?
মনের সামনে নীলাই এসে দেখা দিল। মড়ার মতো দুটো দৃষ্টিহীন চোখ, অথচ অদ্ভুত দূরপ্রসারী দৃষ্টি মেলে যেন কিছু-একটা বলার চেষ্টা করছে। যেন তার সর্বাঙ্গ ঘিরে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে একটা অশুভ অভিশাপের ইঙ্গিত। এ কি সেইজন্যেই?
ট্যাঁকে টাকা আছে তিনটে, তাড়ির দোকানও ভোলা আছে এখনও—যেখানে সমস্ত ক্ষুধা তৃষ্ণার নির্বাণ, যেখানে অনায়াসে সমস্ত শ্রান্তি-ক্লান্তিকে ভুলে থাকা চলে। হনহন করে খেতু বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে।
ঘরের খুঁটি ধরে আড়ষ্টভাবে দাঁড়িয়ে রইল ভোমরা। সারাদিন তার পেটেও কিছুই পড়েনি। নদীর ধারের গরম বালিতে পায়ের নীচে ফোসকা পড়ে যায়, বিলের ওপরে রৌদ্রতপ্ত আকাশ যেন হাড়-মাংস একসঙ্গে সেদ্ধ করতে থাকে। খেতুর জন্যে নাহয় তাড়ির দোকান খোলা আছে, কিন্তু তার? ভোমরার চোখ ফেটে জল নয়— মনে হল টপ টপ করে কয়েক বিন্দু টাটকা রক্ত গড়িয়ে পড়বে।
উঠোনে স্তুপাকার ঝিনুক। খানিকটা স্যাঁৎসেঁতে আঁশটে গন্ধ খালি ভেসে বেড়াচ্ছে বাতাসে।
রাত্রেই আবার সব সহজ হয়ে গেল। তাড়ির নেশা অদ্ভুতভাবে বদলে দিয়েছে খেতুকে। স্নেহ আর আবেগে সমস্ত মনটা কোমল আর আবেশবিহ্বল হয়ে উঠেছে। সোহাগে সোহাগে ভোমরাকে অস্থির করে দিয়ে জড়িত গলায় বললে, রাগ করিসনি বউ, রাগ করিসনি। তোকে কত ভালোবাসি আমি।
পরের দিন বেলা উঠবার আগেই বাড়ি থেকে খাওয়া-দাওয়া করে বেরোল খেতু। রোহনপুরের হাটে কিছু মাল পৌঁছে দিতে হবে। মনপ্রতি বারো আনা দর ধরে দিয়েছে মহাজন। আধ সের চালের ভাত খেয়ে পরম পরিতৃপ্তিতে একটা বিড়ি ধরাল, তারপর অনেকক্ষণ ধরে সপ্রেম চোখে তাকিয়ে দেখল ভোমরাকে।
তোর জন্যে হাট থেকে কাপড় কিনে আনব বউ।
ভোমরা মৃদু ক্লান্ত রেখায় হাসল। কালকের জের আজও শরীরের ওপর থেকে মেটেনি।
কোনোখানে যেন আনন্দ নেই, উৎসাহ নেই এতটুকুও।
ফিরবে কখন?
ভোরের আগেই। সাঁঝ রাত্তিতে ওখান থেকে গাড়ি জুড়ে দিলে এই ক-কোশ হাঁটা আর কতক্ষণ। তুই কিন্তু তাই বলে রাত জেগে বসে থাকিসনে।
খেতু গাড়ি নিয়ে চলে গেল। রান্নাঘরের ভাঙা জায়গাটা পিঁড়ি আর ইট দিয়ে বন্ধ করে ভাতের হাঁড়িটা শিকেয় তুলে রেখে ভোমরাও উঠোনে এসে দাঁড়াল। আরও অন্তত দু-তিন সাজি ঝিনুক দরকার। কাল থেকেই পোড়ানো শুরু করতে হবে।
খেতু বাড়িতে আছিস?
হরিলালের গলা। ভোমরা ত্রস্ত হয়ে ঘোমটা টেনে দেওয়ার আগেই হরিলাল বাড়ির ভেতরে এসে দাঁড়িয়েছে। খেতু নেই বাড়িতে?
ভোমরা মাথা নেড়ে জানালে, না। হরিলাল কিন্তু চলে গেল না। নিজেই একটা চৌপাই টেনে নিয়ে জাঁকিয়ে বসল ঘরের দাওয়াতে। চুনের কথা ভুলে যাসনি তো?
না।
ভুলিসনি। তোর ওপর ভরসা করে বসে আছি। বিয়ের দিনে যাবি কিন্তু আমার বাড়িতে। খেটেখুটে আর খেয়ে-দেয়ে আসবি।
ভয় আর অস্বস্তিতে ভোমরা চঞ্চল হয়ে উঠল। হরিলাল বড়ো বেশি তীব্র আর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে ওর দিকে। গলার স্বরে বড়ো বেশি কোমলতার আমেজ লেগেছে। পুরুষের ওই চোখ আর কণ্ঠস্বরের অর্থ বুঝতে এক মূহূর্তের বেশি সময় লাগে না মেয়েদের। সঙ্গে সঙ্গে কী-একটা বোগাযোগে ভোমরার অপাঙ্গ চোখ গিয়ে পড়ল হরিলালের হাতের ওপর। মোটা মোটাআঙুলগুলো যেন কিছু একটাকে আঁকড়ে ধরতে চায়, নির্মমভাবে নিষ্পেষিত করে ফেলতে চায় তাকে।
