সামনে তালদিঘি। আমের বন, মহুয়ার গাছ, তালের সারি। এতক্ষণে যেন চোখ জুড়িয়ে গেল। তালদিঘির কালো জল অপরিসীম স্নিগ্ধতায় যেন ডাকছে হাতছানি দিয়ে; ঠিক যেন ভোমরার শান্ত দুটি কালো চোখের মতো। জল আর ছায়ার ছোঁয়ায় বাতাসের স্পর্শও মধুর আর শীতল হয়ে উঠেছে। এইখানে গাড়িটাকে খানিকক্ষণ জিরেন দিলে মন্দ হয় না। অন্তত বলদ দুটোকে একটু জল খাওয়ানো দরকার।
একপাশে মুচি পাড়া। এখানে এসে খেতু মাঝে মাঝে আড্ডা দিয়ে যায়, নীলাই মুচির সঙ্গে তার বন্ধুত্ব বহুকালের। এখানে এসে গাড়ি থামানোর পিছনে সে-আকর্ষণটাও আছে, অন্তত এক ছিলিম তামাক টেনে যাওয়া চলবে।
জোয়াল নামিয়ে প্রথমে বলদ দুটোকে ছেড়ে দিলে খেতু। তারপর বালতি করে জল নিয়ে এল তালদিঘি থেকে। গোরুগুলো এক নিশ্বাসে সে-জল নিঃশেষ করে দিলে। বুকের ভেতরটা তৃষ্ণায় যেন শুকিয়ে পাথর হয়ে গেছে ওদের। ততক্ষণ গাড়ির পেছন থেকে কয়েক আঁটি পোয়াল টেনে নামিয়েছে খেতু, কৃতজ্ঞ এবং বেদনার্ত চোখে তার দিকে এক বার চেয়ে অনিচ্ছুকভাবে ওরা চিবুতে শুরু করে দিলে। ভাবটা এই— শুকনো খড় যে এখন গলা দিয়ে নামতে চায় না।
একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল খেতুর। খইল, ভুসি, কলাই ডালের খিচুড়ি, সেসব এখন গতজন্মের স্বপ্ন ছাড়া আর কিছুই নয়। মানুষই না-খেয়ে মরে যাচ্ছে তো গোরু। আস্তে আস্তে সে এসে মুচিপাড়ায় পা দিলে।
ঘরের দাওয়াতেই নীলাই বসে আছে। মাথার চুলগুলো বড়ো বড়ো, চোখের দৃষ্টি উদভ্রান্ত। বললে, মিতা যে, আয় আয়। তালদিঘির পাড়ে দেখলাম গাড়ি থামল একখানা। তোর গাড়ি যে বুঝতে পারিনি।
আশ্চর্য নিরুৎসুক কণ্ঠ নীলাইয়ের। কথা বলছে যেন নিজের সঙ্গে নিজের মনে মনেই। তার কথার কোনো লক্ষ্য বা উপলক্ষ্য নেই। সে খেতুর দিকে তাকিয়ে আছে কিংবা তার পেছনে তালদিঘির দিকে অথবা তারও পেছনে রৌদ্রঝকিত দিগন্তের দিকে, কিছুই স্পষ্ট করে বোঝা যায় না যেন।
সবিস্ময়ে খেতু বললে, তোর কী হয়েছে মিতা?
আমার? অত্যন্ত শূন্য খানিকটা হাসি হাসল নীলাই, আমার কিছু হয়নি।
কিছু হয়নি তো অমন করে বসে আছিস কেন?
নীলাই আবার তেমনিভাবে তাকাল খেতুর দিকে, অথবা খেতুর ভেতর দিয়ে লক্ষ্যহীন সীমাহীন অনিশ্চিত কোনো একটা দিগন্তের দিকে। বললে, ঘরে একরত্তি চামড়া নেই, কাল থেকে হাঁড়ি চড়েনি। বউকে পাড়ায় পাঠিয়েছি চালের চেষ্টায়, আর বসে বসে ভাবছি মানুষ না হয়ে যদি গোরু ঘোড়া হতাম তাহলে মাঠের ঘাসপাতা খেয়েও বেঁচে থাকা চলত।
এক ছিলিম তামাক চাইবার কথা খেতুর আর মনে পড়ল না। তার ঘরে আজও খাবার আছে, কিন্তু দু-দিন পরে তার অবস্থাও যে এমন দাঁড়াবে না কে বলতে পারে! ধানের দর তো বেড়েই চলেছে। নীলাইয়ের পাশে বসতে তার ভয় করতে লাগল। কী অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে আছে নীলাই, যেন মরা মানুষের চোখ। সে-চোখ দুটো ক্রমাগত বলছে…
খেতু দাঁড়িয়ে উঠল। কোনো কথা তার মনে এল না—একটা সান্ত্বনা নয়, একটা আশ্বাসের বাণীও নয়। অত্যন্ত অসংলগ্নভাবে বললে, আমি যাই।
যাবি? দুটো টাকা দিয়ে যা মিতা। সওয়ারি বয়ে এলি, ভাড়ার টাকা নিশ্চয় পেয়েছিস। কাল শোধ দিয়ে দেব, আজই কিছু চামড়া আসবার কথা আছে।
চামড়া আসবে কি না অথবা কাল টাকা সে সত্যিই শোধ দেবে কি না সে-জিজ্ঞাসা খেতুর মনে হল না। আপাতত যেন এই লোকটার হাত থেকে সে নিষ্কৃতি চায়। ট্যাঁক থেকে দুটো টাকা বের করে নীলাইয়ের হাতে তুলে দিলে খেতু।
কালো কালো ময়লা দাঁত বের করে নীলাই খানিকটা নির্জীব হাসি হাসল। বললে, বাঁচালি মিতা। কাল ঠিক শোধ দিয়ে দেব কিন্তু।
দিঘির পাড়ে দুটো বলদ কার? তোর বুঝি?
হ্যাঁ, আমার।
ইস, কী চেহারা ও-দুটোর! নীলাইয়ের ধোঁয়াটে মৃত চোখ দুটো যেন পলকে জীবন্ত হয়ে উঠল। ওরা তো আর বেশিদিন বাঁচবে না। যদি মরে যায়, চামড়া দুটো আমাকে দিস তাহলে। ভুলে যাসনি যেন। দিবি তো?
মুহূর্তের মধ্যে ক্রোধে আর আতঙ্কে খেতুর সমস্ত শরীরটা শক্ত হয়ে উঠল। ইচ্ছে হল, যে টাকা দুটো দিয়েছিল, থাবা দিয়ে তা নীলাইয়ের হাত থেকে কেড়ে নেয় আর শাঁটা দিয়ে সপসপ করে ঘা-কতক বসিয়ে দেয় অলক্ষুণে লোকটার মুখের ওপর।
কিন্তু খেতু কিছুই করল না। সোজা শনশন করে হেঁটে এল, জোয়ালে জুড়ে দিল গোরু। নীলাইয়ের চোখের আওতা থেকে পালাতে হবে, যত তাড়াতাড়ি হোক, যেমন করে হোক। বলদ দুটো হাঁটতে চায় না, থেমে থেমে দাঁড়ায়। কাঁচা মাটির পথের ধারে যে অপরিপূর্ণ বিবর্ণ ঘাস উঠেছে, কালো কালো শীর্ণ আর লম্বা জিভ মেলে সেগুলো খাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু খেতুর এবার আর রাগ হল না, বিরক্তি হল না এতটুকুও। কী চেহারা হয়ে গেছে এমন নতুন আর জোয়ান গোরুর, ওদের দিকে তাকাতেও ভয় করে এখন। হয়তো এক বার হাঁটু ভেঙে পড়লে আর উঠতেই পারবে না। হাতের উদ্যত শাঁটা পাশে নামিয়ে সে পরমযত্নে গোরুর পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল, কোমল শান্ত গলায় আদর করতে লাগল, লক্ষী আমার, সোনা আমার।
যেমন করে হোক মন খানেক খইল এবার জোগাড় করতেই হবে।
বাড়ির দরজায় ফিরে সে শিকপায়া মেরে গাড়ি থামাল। আর ওদিকের ডোবার ঘাট থেকে ভিজে কাপড়ে সামনে এসে দাঁড়াল ভোমরা।
অপ্রসন্নতায় ভারী হয়ে উঠল খেতুর মন। বিশ্বাস নেই ভোমরার রূপকে। ভিজে কাপড়ের নেপথ্যে পরিস্ফুট হয়ে উঠেছে অপরূপ দেহকান্তি—যার চোখে পড়বে, সঙ্গে সঙ্গে তারই নেশা ধরে যাবে।
