বাইরে বৃষ্টি। দগ্ধ মাঠে নতুন অঙ্কুর। ইদারায় নতুন জল। বুলুর চোখেও কি বর্ষা নেমেছে এখন?
আকাশ চিরে বিদ্যুৎ চমকাল—একটা রক্তাক্ত ক্ষতচিহ্নের মতো। আর তখনই দেখতে পেল সিতাংশু বুলুর জীবনের দিগদিগন্ত জুড়ে অমনি একটা ক্ষতের স্বাক্ষর এঁকে দিয়েছে সে।
খড়গ
পাঁচ সের চুনের বায়না। ভোমরার হাতখানা একটু বেশি পরিমাণে ছুঁয়েই এক টাকার নোটখানা গুঁজে দিয়েছে হরিলাল। চমকে ভোমরা তিন-পা পিছিয়ে গেছে, নোটখানা উড়ে গেছে হাওয়ায়। মৃদু হেসে সেখানা কুড়িয়ে এনে চালের বাতায় রেখে দিয়েছে হরিলাল। তির্যক কটাক্ষ হেসে বলেছে, মনে থাকে যেন, সাত দিন পরেই কিন্তু বিয়ে।
হরিলাল গ্রামের তালুকদার। জমি আছে, পয়সা আছে, কারবার তো আছেই। যুদ্ধের বাজারে আরও কতদূর কী করেছে ভগবানই জানেন। সুতরাং কুড়ি টাকার চালের দিনেও সে ভালো করেই মেয়ের বিয়ে দিতে চায়। অনেক বরযাত্রী আসবে, গাঁয়ের বহু লোকের পাত পড়বে তার বাড়িতে। পাঁচ সের চুনের কমে এত বড় একটা ক্রিয়াকান্ড হওয়া শক্ত। সেরপ্রতি আট আনা দর সে দিতে চায়, সুতরাং ভোমরাকে একটু বেশি করে স্পর্শ করবার অধিকার তার নিশ্চয় আছে।
কিন্তু ভোমরা ছেলেমানুষ। অধিকার অনধিকারের ব্যাপারগুলো এখনও সে ভালো করে বুঝতে পারে না। হরিলালের লোলুপ চোখ আর অনুভূতিপ্রখর স্পর্শে তার সমস্ত শরীর শিরশির করে শিউরে উঠল। খেতু বাড়িতে নেই, দূরের ইষ্টিশনে সওয়ারি নামিয়ে দিতে গেছে। এমনসময় হরিলালের আবির্ভাবটা তার ভালো লাগল না। সংকীর্ণ জীর্ণ কাপড়ের প্রান্ত আকর্ষণ করে ঘোমটা দেবার একটা ব্যর্থ চেষ্টা করল।
হরিলাল চেহারায় খাটো। হালে ঠিক ব্রহ্মতালুর ওপরে চিকচিকে একটা টাক নিশানা দিয়েছে। মোটা আর ছোটো ছোটো হাত-পা। আঙুলগুলো সবসময় চঞ্চল, কখনো স্থির থাকতে পারে না। মনে হয় তারা যেন সদাসর্বদা কী-একটা আঁকড়ে ধরবার চেষ্টায় আছে। এক বার পেলে আর ছাড়বে না, লোলুপ মুষ্টির ভেতরে নিঃশেষে সেটাকে নিষ্পেষিত করে ফেলবে। এক হিসাবে অনুমানটা নির্ভুল। হরিলালের হাতের ভেতর যা এক বার এসে পড়েছে তাকে আর কখনো সে ছাড়েনি—খত নয়, জমি নয়, নারীও নয়।
হরিলাল চলে গেলে ভোমরা আরও কিছুক্ষণ আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এ গাঁয়ের অন্যান্য ভুইমালী মেয়েদের মতো চুন সেও তৈরি করে কিন্তু আর-সকলের মতো কখনো হাটে বিক্রি করতে যায় না। খেতুই যেতে দেয় না তাকে। ভোমরাকে বিয়ে করেছে এই সেদিন, এখনও নেশা কাটেনি। একহাট লোকের ক্ষুধিত দৃষ্টির সামনে বসে সে বেচাকেনা করবে, ভুইমালীর ছেলে খেতুও এটাকে বরদাস্ত করতে পারে না।
কিন্তু পাঁচ সের চুনের বায়না তাকে নিতেই হবে। ধানের দর এবারেও গত বৎসরের মতো বেড়ে চলেছে ধাপে ধাপে। এ জেলাটা পুরোপুরি দুর্ভিক্ষের এলাকায় পড়ে না, তবু ঘটিবাটি আর রুপোর খাড় বিক্রি করে গতবছর পেটের দাবি মেটাতে হয়েছে। খেতুর জমি নেই, আধিও নেই, সওয়ারি বয়ে দিন কাটে। গাড়িভাড়া পাঁচ থেকে দশ টাকায় উঠেছে বটে কিন্তু জিনিসপত্রের দামও বেড়েছে পাঁচগুণ। যথাসর্বস্ব বিক্রি করে দিয়ে গেল বছর ওর বর্ষা কালের ধকল সামলে নিয়েছে, কিন্তু সে-দুর্দিন যদি এবারেও দেখা দেয় তাহলে প্রাণ বাঁচানোর কোনো পথই খুঁজে পাওয়া যাবে না।
সওয়ারি বয়ে খেতু যখন গ্রামের কাছাকাছি এসে পৌঁছোল, বেলা তখন দুপুর। শান দেওয়া ছুরির মতো রোদ ঝলকাচ্ছে মাথার ওপর। নির্মল আকাশে প্রখর রোদ যেন সমস্ত পুড়িয়ে নিঃশেষ করে দিচ্ছে—হঠাৎ তাকালে চোখে ধাঁধা লেগে যায়, মনে হয় পূর্ব থেকে পশ্চিম অবধি সবটা যেন জ্বলন্ত একটা কাঁসার পাত দিয়ে মোড়া। জ্যৈষ্ঠ শেষ হয়ে যায় অথচ মেঘের চিহ্ন নেই কোথাও। দূরে বাবলা গাছগুলোর অপ্রচুর পাতা রোদের তাপে ঝলসে ঝরে পড়েছে, যেন আগুনে পোড়া কতগুলো এলোমেলো ডালপালা শস্যহীন মাঠের মরুভূমির মাঝখানে দাঁড়িয়ে।
ময়লা গামছায় কপালের ঘাম মুছে প্রাণপণে শাটা হাঁকড়ালে খেতু। ডাঁ-ডাঁ-ডাঁহিন। অস্থিসার গোরুর পাতলা চামড়ার ওপর শাঁটার দগদগে রক্তচিহ্ন ফুটে উঠেছে একটার পর একটা। বাঁ-দিকের গোরুটার কাঁধের ওপর জোয়ালের ঘষায় অনেকখানি জায়গা নিয়ে ঘা হয়ে গেছে, সেখান থেকে এখন ফোঁটায় ফোঁটায় পড়ছে রক্ত। ডাঁশের দল সেখানে পরমানন্দে ভোজের আসর বসিয়েছে, আর মর্মান্তিক যন্ত্রণায় গোরুটা এক-এক বার থমকে থেমে দাঁড়িয়ে পড়বার চেষ্টা করছে।
কিন্তু গোরর প্রতি দরদের চাইতে প্রয়োজনের তাগিদ অনেক বেশি। ভোর বেলা সওয়ারিকে ইংরেজবাজারের রেলগাড়িতে তুলে দিয়ে খেয়েছে চার পয়সার লাহরি, আর খেয়েছে টাঙ্গন নদীর একপেট জল। অসহ্য খিদেয় নাড়িভুড়িগুলো জড়াজড়ি করছে একসঙ্গে। রাত্রিজাগরণক্লান্ত চোখের পাতাদুটো অস্বাভাবিক ভারী হয়ে উঠেছে। আড়ষ্ট একটা আচ্ছন্নতায় শরীর ঢুলে পড়তে চাইছে, কিন্তু ডাঁশ তাড়াবার জন্যে ব্যর্থকাতর গোরুর লেজের ঘা চটাস চটাস করে চাবুকের মতো পায়ে লাগতেই চটকা ভেঙে যাচ্ছে। স্বপ্নের মতো মনে পড়ছে ঘরে ভোমরা ভাত বেড়ে নিয়ে তার প্রতীক্ষায় পথের দিকে তাকিয়ে বসে আছে।
ডাঁ-ডাঁ-ড্ডাঁহিন মহামাই—শাঁটা উদ্যত করেই খেতুর হাত নেমে এল আপনা থেকে। সত্যিই কষ্ট হয় গোরু দুটোর দিকে তাকালে, দু-বছর আগে কী চেহারা ছিল ওদের, আর কী হয়ে গেছে। খেতে পায় না। যে-গোরু আগে এক দমে পনেরো ক্রোশ পথ অক্লেশে পাড়ি দিয়ে যেত, তারা আজকাল তিন ক্রোশ রাস্তা না হাঁটতেই এমন করে ঝিমিয়ে আসে কেন তার খবর খেতুর চাইতে বেশি করে আর কে জানে!
