শুধু আপনার ব্যাগ নিয়েছে? জান্তব চিৎকারে বিরাজবাবু ফেটে পড়লেন, আমার কী সর্বনাশ করেছে জানেন? গিন্নির চার ভরির হার, ছ-গাছা চুড়ি, সব নিয়ে শেষরাত্রে সরে পড়েছে।
সংশয়ের শেষটুকুও মুছে গেল।
কী করা যায় বিরাজবাবু?
থানায় চলুন। আর কী করবার আছে? বেঁটে ভারী চেহারার বিরাজবাবুকে নরখাদকের মতো দেখাতে লাগল। ক্রিমিনাল মশাই-বর্ন ক্রিমিনাল! ওই লজ্জাতেই দাদা অসময়ে মারা গেলেন। বিস্তর শাসন করেছি মশাই, চাবকে চামড়া তুলে দিয়েছি, দেওয়ালে ঠুকে ঠুকে মাথা ফাটিয়ে দিয়েছি, তবু স্বভাব ছাড়ানো গেল না। মেয়েছেলে, তায় আমাদের বংশের। কী করে যে এমন হল ভাবতেই পারা যায় না। চলুন থানায়, ও-মেয়ের জেলখাটাই দরকার।
ঘরের ভিতর বিরাজবাবুর স্ত্রীর ইনিয়েবিনিয়ে কান্না, দুধ দিয়ে আমি কালসাপ পুষেছিলুম! আমার সর্বনাশ করে গেল…
বিরাজবাবু আরও খেপে গেলেন। হাত ধরে টানতে লাগলেন সিতাংশুর।
চলুন চলুন, আর দেরি করবেন না। এখনও বোধ হয় জসিডি পেরুতে পারেনি।
বুলু ফিরল সন্ধার পর। পুলিশ তাকে ফিরিয়ে এনেছে আসানসোল থেকে।
কিন্তু ততক্ষণে সিতাংশুর মনের আগুনটা নিবে গিয়েছে। সারাদিনের অশ্রান্ত বৃষ্টিতে পৃথিবীর মাটি স্নিগ্ধ হয়েছে, সুগন্ধ শীতল ভিজে বাতাস শরীর জুড়িয়ে দিয়েছে। আর চুপচাপ বসে বসে সিতাংশু ভাবছিল, কী দরকার ছিল দু-শো পঁচিশ টাকার জন্যে অতখানি পাগলামি করবার? বাড়ি থেকে টাকা আনিয়ে যাহোক করে এ মাসটা তার চলে যেত। কিছু ধারও হয়তো হত, সেটা শোধ দেওয়া যেত আস্তে আস্তে। কেন সে করতে গেল এসব? হয়তো বুলু সত্যিই যাবে সাইকোলজিস্টের কাছে, এই টাকাটা দিয়ে নিজের চিকিৎসা করাবে, সুস্থ স্বাভাবিক-সুন্দর হয়ে উঠবে। বুলুকে মেরে যে-পাপ করেছিল, এই টাকায় তার প্রায়শ্চিত্ত হবে খানিকটা। কেন এতটা হীন হয়ে গেল সিতাংশু, কালকের সেই অভিশপ্ত বুলুকে সে ভুলে গেল কী করে?
এমন সময় প্রায় নাচতে নাচতে এলেন বিরাজবাবু।
চলুন, চলুন। শ্রীমতী পৌঁছেছেন।
ধড়ফড় করে উঠে বসল সিতাংশু, কোথায়?
হাজতে।
বুকের ভিতর হাতুড়ি পড়ল একটা। কালো হয়ে গেল মুখ।
মাপ করবেন, আমি পারব না।
পারবেন না কী? যেতেই হবে। খবর পাঠিয়েছে থানা থেকে।
আমার শরীর খারাপ।
নিষ্ঠুর হাসি হাসলেন বিরাজবাবু।
আপনি ইয়ং ম্যান, ওসব সেন্টিমেন্ট আমি বুঝি। কিন্তু আমার অনেক বয়েস হয়েছে মশাই। উঠুন, চলুন শিগগির।
একটা মৃতদেহের মতো সিতাংশুকে টেনে তুললেন রিকশায়। তারপর থানাতে।
থানাসুদ্ধ লোকের কৌতুকভরা চোখের সামনে একটা টুলে বসে আছে বুলু। রুক্ষ চুল, ভাষাহীন চোখ। সামনের দেওয়ালের দিকে স্থিরদৃষ্টি। আজ সারাদিন সে স্নান করেনি, খেতে পায়নি।
চোরের মতো এক বার বুলুর দিকে তাকিয়ে তৎক্ষণাৎ পিছনে সরে গেল সিতাংশু, লুকিয়ে পড়তে চাইল। এইবার বুলুকে সে সম্পূর্ণ দেখছে—দেখছে কপালে এক ইঞ্চি লম্বা কাটা দাগটা এখনও শুকোয়নি। সিতাংশুর স্বাক্ষর।
কিন্তু সম্পূর্ণ কি দেখেছে সিতাংশু? না, দেখবার সাহস নেই। সাহস নেই বুলুর আরক্ত ভাষাহীন চোখের দিকে সে তাকায়।
দারোগা বললেন, এই দেখুন গয়না। হার, চুড়ি…
বিরাজবাবু প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইলেন সেগুলোর উপর। বললেন, হ্যাঁ হ্যাঁ, এ সবই আমার স্ত্রীর।
বুলু কথা বললে এইবার। সেই শান্ত সুরেলা গলা। যেন অনেক দূর থেকে ভেসে আসছে।
না, কাকিমার গয়না আমি নিইনি। ওসব আমার মায়ের জিনিস। কাকিমার কাছে ছিল।
মায়ের জিনিস? বীভৎসভাবে বিরাজবাবু ভেংচে উঠলেন, চোপরাও হারামজাদি। চোর!
বুলু আবার শান্ত গলায় বললে, আমি জানি, ওসবই আমার মায়ের। কাকিমার কোনো জিনিসই আমি ছুঁইনি।
বিরাজবাবু বুলুর উদ্দেশে প্রকান্ড একটা চড় তুলেছিলেন, দারোগা তাঁকে ধমক দিলেন, থামুন, আপনার স্ত্রী এসে গয়না শনাক্ত করবেন, আপনি গন্ডগোল করবেন না। তারপর সিতাংশুর দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন, শ-খানেক ক্যাশ টাকা পেয়েছি, কিন্তু আপনার ব্যাগ পাওয়া যায়নি।
বিরাজবাবু বললেন, ব্যাগটা রেখে দেবে ওকি অমন কাঁচা চোর নাকি? আপনি ওকে চেনেন না স্যার! ও যে…
আঃ। দারোগা আবার ধমক দিলেন একটা।
বুলুর উদাস বিষণ্ণ স্বর শোনা গেল, আমি ওঁর ব্যাগ নিইনি। আমার নিজের চুড়ি বিক্রি করে…
বিরাজবাবু আবার ভেংচে উঠলেন, ওরে আমার সত্যবাদী যুধিষ্ঠির রে! নিজের চুড়ি বেচে উনি…
আর নয়। এর পরে আর কোনোমতেই দাঁড়ানো চলে না। চোরের মতো নিঃশব্দে পালিয়ে এল সিতাংশু। শুধু পথে আসতে আসতে বার বার মনে হল, আজ সারাদিন বুলুর খাওয়া হয়নি।
ব্যাগটা কিন্তু পাওয়া গেল। অফিসের ড্রয়ারেই রেখে এসেছিল।
এ সন্দেহও সিতাংশুর মনে জাগতে পারত। কিন্তু সন্ধ্যায় এসে যদি অমনভাবে নিজের কথা না বলত বুলু, যদি বিরাজবাবুর বাড়ি থেকে গয়নাগুলো সে না নিত, যদি সত্যিই সে কলকাতায় পালাতে না চাইত, তাহলে…
ব্যাগটাকে তৎক্ষণাৎ পকেটে লুকিয়ে ফেলল সিতাংশু। এখন থানায় যাওয়া যায়? বলা যায়, বুলু তার টাকা নেয়নি? ভুল করে সে মিথ্যে এজাহার দিয়েছিল?
কিন্তু আর কি সম্ভব? তাতে নিজের ওপরেই বিপদ টেনে আনা হবে। কেন তুমি এমন কাজ করলে? কেন একজন নির্দোষকে মিথ্যে নালিশ করে…।
নাঃ, সে মনের জোর নেই সিতাংশুর। তা ছাড়া এই হয়তো ভালো হল। জেলেই যাক বুলু। পাক দুঃখ, পাক লজ্জা। হয়তো এ থেকেই বুলু ভালো হয়ে উঠবে। যে সহজ-স্বাভাবিক সুন্দর জীবনের মধ্যে সে যেতে চেয়েছিল, হয়তো তারই প্রস্তুতি হবে এখান থেকে।
