আস্তে আস্তে এগিয়ে টেবিলের পাশটিতে বসে পড়ল বুলু। আর কেমন থমকে গেল সিতাংশু, মুহূর্তে বুলু যেন তাকে অনেকখানি দূরে ঠেলে সরিয়ে দিয়েছে। বিহ্বলভাবে বললে, আপনি যে কী বলছেন, আমি…
এখুনি বুঝতে পারবেন। আপনার ইদারা থেকে দু-বালতি জল নিতে এসেছিলুম, সেটা বড়ো কথা নয়। শুনুন, আমি চোর হয়েই জন্মেছি। হাতের সামনে কোনো জিনিস দেখলে আমি আর লোভ সামলাতে পারি না। সে টাকা হোক, পেনসিল হোক, একটা ফুলই হোক। ছেলেবেলা থেকে পাড়ার কোনো মেয়ে আমার সঙ্গে খেলত না, কোনো বাড়িতে ঢুকলেই আমাকে তারা তাড়িয়ে দিত। মেয়েদের বইখাতা চুরির জন্যে ইশকুল থেকে বার বার আমাকে ওয়ার্নিং দিয়েছে, শেষে অসহ্য হয়ে বিদায় করেছে। আমার দু-বছর বয়েসে মা মারা যান। দেবীর মতো পবিত্র ছিলেন তিনি। বাবা ছিলেন স্কুলের হেডমাস্টার, সারাজীবন সততারই সাধনা করেছেন। অথচ আমি…
বুলু থামল, কান্নায় ভারী হয়ে উঠছে গলা। সান্ত্বনা দেওয়া উচিত ছিল সিতাংশুর, ভাষা খুঁজে পেল না।
বুলু বলে চলল, দশ বছর বয়সে বাবা আমায় ছেড়ে গেলেন, এলুম কাকার কাছে। কাকা আমার স্বভাব বদলাবার অনেক চেষ্টা করেছেন, চাবুক দিয়ে মেরেছেন, সারা পিঠে আমার দাগ পড়ে গিয়েছে, অথচ কিছুতেই আমি পারি না। না খেতে দিয়ে ঘরে বন্ধ করে রেখেছেন, বেরিয়েই আমি তখুনি ফেরিওয়ালার ঝুড়ি থেকে কমলালেবু চুরি করেছি।
সিতাংশু একটা অস্ফুট আর্তনাদ করল। বুলু উঠে দাঁড়াল, সরে গিয়ে সিলুয়েত ছবির মতো ঠাঁই নিলে দরজার ফ্রেমে।
ভয় পাচ্ছেন, না? কান্না-মেশানো হাসির আওয়াজ এল বুলুর, সত্যি ভয় আপনি পেতে পারেন। আমি এক্ষুনি আপনার টেবিল থেকে ঘড়ি কিংবা কলম যাহোক একটা তুলে নিতে পারি। হাত আমার এমনই রপ্ত হয়ে গেছে যে, আপনি টেরও পাবেন না।
নার্ভাসভাবে গলাটা এক বার পরিষ্কার করে নিলে সিতাংশু। ছেলেমানুষের মতো বললে, কিন্তু আমি তবুও কিছুতেই…
বিশ্বাস করতে পারেন না, না? অনেকেই পারে না। ভালো করে আমাকে যদি দেখেন আপনি, স্বীকার করবেন আমি সুন্দরী। রূপটা আমার গুড কণ্ডাক্টের সার্টিফিকেট। কিন্তু আমাকে যারা চিনেছে, তারা কখনো ভুল করবে না।
সিতাংশু আবার গলাটা পরিষ্কার করে নিলে। কিন্তু এবার আর কথা বেরুল না মুখ দিয়ে।
বুলু বলে চলল, আমি জানি এ আমার রোগ। কাকাকে কত বার বলেছি আমার চিকিৎসা করাও আমি সেরে যাব, এ আমি আর সইতে পারছি না। কাকা বলেন, মারই হচ্ছে এ রোগের ওষুধ। তোর বিয়ে দিতে পারব বলে আশা নেই, তবে কোনোদিন যদি দিতেই পারি, শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে বেশ করে ঠ্যাঙানি খেলেই রোগ পালাতে পথ পাবে না।
আচ্ছন্নভাবে বসে রইল সিতাংশু। বাইরে মাঠের ভিতর থেকে হাওয়ার গোঙানি ভেসে এল।
বাইশ বছর বয়স হল আমার, এ যন্ত্রণা আমি আর বইতে পারব না। তাই ভেবেছি কাল ভোরের ট্রেনে কলকাতায় চলে যাব। কাকা যেতে দেবেন না, টাকাও দেবেন না, পালিয়েই যেতে হবে আমাকে। গিয়ে আমি ডাক্তার দেখাব, ভালো হতে, বাঁচতে চেষ্টা করব। শুধু যাওয়ার আগে আপনাকে বলতে এসেছি, অন্যায় আপনি করেননি, চোরকে তার পাওনা শাস্তিই দিয়েছিলেন।
পরক্ষণেই দরজার ফ্রেম থেকে মিলিয়ে গেল বুলু। একটা লঘু পায়ের শব্দ নেমে গেল অন্ধকারে।
স্বপ্ন, মায়া, মতিভ্রম! চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠতে চেষ্টা করল সিতাংশু-পারল না, কিছুতেই পারল না। কে যেন হিপনোটাইজ করে তাকে নিশ্চল স্থবিরে পরিণত করে দিয়েছে।
একটা দমকা হাওয়ায় ইউক্যালিপ্টাসের কয়েকটা ঝরা পাতা এসে সিতাংশুর গায়ে-মাথায় ছড়িয়ে পড়ল।
সিতাংশুর ঘোর ভাঙল পরদিন।
আজ আর উজ্জ্বলন্ত সকাল নয়। এতদিনের অগ্নিদহনের পর পৃথিবীর প্রার্থনা পূর্ণ হয়েছে। আকাশ মেঘে অন্ধকার—বায়ু বহত পুরবৈয়া। ঝিমঝিম বৃষ্টি নেমেছে বাইরে। নামুক, আকাশ উজাড় করে নেমে আসুক। মরা মাটিতে নতুন অঙ্কুর মাথা তুলুক, শুকনো ইদারাগুলো জলে ভরে উঠুক, আর বুলু…
আর বুলু। স্বপ্ন-মায়া-মতিভ্রম। একটা অবিশ্বাস্য কাহিনি। বিচিত্র বিকৃতির নাগপাশে পাকে পাকে জড়ানো—তিলে তিলে মরে যাচ্ছে সে। আজ সকালের ট্রেনেই তার কলকাতা পালিয়ে যাওয়ার কথা। বাঁচুক, বেঁচে উঠুক বুলু। প্রার্থনার মতো উচ্চারণ করল সিতাংশু, এই বন্ধন থেকে সে মুক্তি পাক, এই অভিশাপের গন্ডি পার হয়ে সূর্যস্নাত জীবনের মধ্যে তার উত্তরণ ঘটুক।
ভয় পাচ্ছেন? জানেন, এক্ষুনি আপনার টেবিল থেকে ঘড়ি, কলম যাহোক কিছু… কথাটা কানের মধ্যে বেজে ওঠবার সঙ্গে সঙ্গে টেবিলের দিকে তাকাল সিতাংশু। ঘড়ি, কলম, চশমা সব ঠিক আছে। কিন্তু ব্যাগ? মানিব্যাগটা?
কালকে পাওয়া মাইনের দু-শো পঁচিশ টাকা আছে ব্যাগে। পুরো দু-শো পঁচিশ টাকা। একটা পয়সাও খরচ হয়নি।
পাঞ্জাবির পকেটে হাত দিল সিতাংশু। নেই। টেবিলের টানায়? সেখানেও নেই। না, বালিশের নীচেও না।
মুহূর্তে চোখে অন্ধকার। একটু আগেকার প্রার্থনা বীভৎস অভিসম্পাত হয়ে এগিয়ে এল গলায়। হিপনোটিজম-ই বটে। সেইজন্যে বুলু আলো জ্বালাতে বারণ করেছিল আর উত্তপ্ত বিচিত্র সন্ধ্যার বিহ্বলতার সুযোগে সিতাংশুর নির্বোধ আচ্ছন্নতাকে আরও ঘনীভূত করে দিয়ে ব্যাগটা তুলে নিয়ে সে সরে পড়েছে। সিতাংশু ছুটল বিরাজবাবুর বাসায়।
