শেষপর্যন্ত বিরাজবাবু উঠলেন।
একটা লোকই তাহলে রাখা যাক, কী বলেন? দু-বেলা টিউব-ওয়েল থেকে আমাদের দু বাসায় জল দেবে। টাকাটা দেওয়া যাবে ভাগাভাগি করে।
সে তো বেশ কথা!
দেখি তবে চেষ্টা করে। দরজার দিকে পা বাড়িয়েছেন বিরাজবাবু, সেই মুহূর্তেই প্রায় মুখ ফসকে প্রশ্নটা বেরিয়ে এল সিতাংশুর।
আপনার ভাইঝি কাল পড়ে গিয়েছিলেন, কেমন আছেন আজ?
অদ্ভুত দৃষ্টিতে বিরাজবাবু সিতাংশুর দিকে তাকালেন। লণ্ঠনের আলোয় মেক-আপ করা অভিনেতার মতো দেখাল তাঁকে।
কে, বুলু? বুলু ঠিক আছে। সাংঘাতিক মেয়ে মশাই, অল্পে ওর কিছু হয় না। মাটিতে পুঁতে দিলে কাঁটাগাছ হয়ে বেরুবে।
বিরাজবাবু বেরিয়ে গেলেন।
আজও রাত বারোটা পর্যন্ত একা ঘরে ছটফট করল সিতাংশু। সেই বাংলা উপন্যাসখানার পাতা ওলটাল, রসিক পাঠকদের টীকাটিপ্পনীগুলো পড়বার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু আজ আর অক্ষম বিরক্তিতে নয়—সেই অসম্ভব দুরাশায় সে কান পেতে বসে রইল। কয়েক বার উঠে গেল জ্যোৎস্নার জাফরিকাটা পিপুল গাছটার তলায়। বুলু আজ আর আসবে না সে জানে; তবু এই রাত, এই গরম আর উত্তেজিত স্নায়ুর একটা বিচিত্র কুহকে সিতাংশু রাত আড়াইটে পর্যন্ত প্রতীক্ষায় জেগে রইল। তারপর বাতাস ঠাণ্ডা হয়ে গেল, ক্লান্ত অবসাদে ঝিমিয়ে এল শরীর, আর ঘুমের ঘোরে সিতাংশু স্বপ্ন দেখল… মেঘনার কালো জলের ওপর দিয়ে গেরিমাটির বন্যা ছুটে চলেছে।
বুলু এল না।
সে-রাতে নয়, তার পরের রাতে নয়, তার পরের রাতেও নয়। সিতাংশু কেমন একটা দুর্বোধ্য যন্ত্রণায় পীড়িত হতে লাগল। আশ্চর্যভাবে লুকিয়ে গিয়েছে মেয়েটা। যখন তাকে দেখার কোনো কৌতূহল ছিল না, তখন কত বার পিছনের বাড়ির বারান্দায়, খোলা জমিটুকুতে কতভাবে তাকে সে দেখেছে। সেদিন সে বুলুকে মনে রাখতে চেষ্টা করেনি— দরকারও ছিল না। সেই আধখানা দেখা, ঝিলিমিলি জ্যোৎস্নায় এক টুকরো দেখা আর বিরাজবাবুর টর্চের আলোয় রক্তের সিঁদুর-মাখানো একটুখানি শুভ্র ললাট, এর বেশি আর কিছু মনে আনতে পারে না সিতাংশু। সে শুধু এক বার দিনের আলোয় দেখতে চায় বুলুকে, দেখতে চায় তার কপালে…
দেখা হয় বিরাজবাবুর সঙ্গে। বাজারে, অফিসের পথে।
জল পাচ্ছেন ঠিকমতো?
পাচ্ছি।
জষ্টি মাস পার হয়ে গেল মশাই, এখনও বৃষ্টি নেই এক ফোঁটা। কী করা যায় বলুন তো।
কী আর করা যেতে পারে। আকাশের উদ্দেশে বৃষ্টির জন্যে একখানা দরখাস্ত লেখা যেতে পারে—এমনই একটা জবাব আসে ঠোঁটের কোনায়। কিন্তু বিরাজবাবুকে সত্যিই ও-কথা বলা যায় না।
আর জিজ্ঞাসা করা যায় না বুলুর কথা। খবরের কাগজ চাইবার কিংবা বাড়িতে ডিকশনারি আছে কি না জানবার যেকোনো একটা উপলক্ষ্য নিয়ে বিরাজবাবুর বাসায় এক বার যে যাওয়া যায় না তা-ও নয়। কিন্তু কিছুতেই পেরে ওঠে না সিতাংশু। নিজের এই ছেলেমানুষি কৌতূহলের উগ্রতা তাকে যত বেশি পীড়ন করে, ততখানিই লজ্জা দেয়।
কেন যে বুলুর ক্ষতচিহ্নিত কপালটাকে এক বার দেখবার জন্যে এই পাগলামি তাকে পেয়ে বসেছে, সিতাংশু নিজের কাছেই তার কোনো কৈফিয়ত খুঁজে পায় না। বুলুর কাছে ক্ষমা চাইবে এক বার? বলবে, আমাকে যত বড়ো পাষন্ড ভেবেছেন আমি তা নই। কোনো মেয়ের গায়ে হাত তোলা দূরে থাক, ছেলেবেলার সীমা পার হয়ে নিজের ছোটোভাইকে পর্যন্ত কোনোদিন একটা চড়চাপড়ও মারিনি। আর বুলুর কপালের দিকে তাকিয়ে নিজের অপরাধের সে পরিমাপ করতে চায়। জেনে নিতে চায় কোনো বড়ো ক্ষতি সে করেনি, ছোট্ট একটুখানি দাগ, দু-দিন পরেই মিলিয়ে যাবে?
ঠিক কী বলতে চায় সিতাংশু জানে না। কেবল অর্থহীন মনোযন্ত্রণার পীড়ন। ভূতের মতো ভাবনাটা তার ওপর চেপে বসেছে, নিজেকে কিছুতেই ছাড়াতে পারে না তার হাত থেকে।
কিন্তু শেষপর্যন্ত বুলুও এল।
আজও ঠিক তেমনি উত্তপ্ত সন্ধ্যা। লণ্ঠনের আলোয় নিজের বিকৃত ছায়া দেখতে দেখতে খেপে গিয়ে সিতাংশু বাতিটা নিবিয়ে দিয়েছিল। তারপর ইজিচেয়ার পেতে চুপ করে বসে ছিল জানলার কাছে। বাইরে কঙ্কালের মতো দাঁড়িয়ে ছিল বল্কলবিহীন ইউক্যালিপ্টাসের সারি, যেন কোনো নিভন্ত চিতা থেকে উঠে আসা বাতাস ঝরঝরিয়ে তাদের পাতা ঝরাচ্ছিল।
আসব?
দরজার ফ্রেমে একটি মেয়ের ছায়াশরীর। সিতাংশুর সমস্ত সত্তা একটা নিঃশব্দ চিৎকারে ভরে উঠল। বুলু! বুলু ছাড়া আর কেউ নয়—কেউ হতেই পারে না। তবু জিজ্ঞাসা করলে, কে?
আমি বুলু। একটা চাপা হাসির আওয়াজ পাওয়া গেল, আপনার জল চুরি করতে এসেছিলুম।
আর লজ্জা দেবেন না। উদগ্র আহ্বানে সিতাংশুর শিরাগুলো টান টান হয়ে উঠল। বসুন আলোটা জ্বালি।
আলো জ্বালবার দরকার নেই, খামোখা রাস্তার লোকের চোখে পড়বে। শুধু একটা কথা বলতে এলুম। বলেই চলে যাব।
চেষ্টা করেও সিতাংশু গলার কাঁপন থামাতে পারল না। বললে, কিন্তু আপনাকে আমারও বলবার কিছু আছে। সেদিন যে অন্যায় আমি করে ফেলেছি…
অন্যায় আপনি করেননি। আমার যা পাওনা তাই-ই পেয়েছি। আমি সত্যি সত্যিই চোর।
ছি ছি, কী যে বলেন! আবছা অন্ধকারেও হাতজোড় করল সিতাংশু, আপনি জানেন না, আমি যে সেই থেকে কী লজ্জায়…
দরজার গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়াল ছায়ারূপিণী বুলু। যেন অনেক দূর থেকে অথচ স্পষ্ট সুরেলা গলায় বললে, আগে আমার কয়েকটা কথা শুনুন, তারপরে লজ্জা পাবেন। আমি আজ আপনার কাছে কেন এসেছি জানেন? আমার মাথা ফাটিয়ে দিয়ে যে-দুঃখ আপনি পেয়েছেন, সেই দুঃখ থেকে আপনাকে মুক্তি দেব বলে। এ ছাড়া কাল আমি চলে যাব এখান থেকে, যাওয়ার আগে আপনাকে সামনে রেখে নিজের কথাগুলো বলে যাব। ইচ্ছে হলে শুনতে পারেন, নাও শুনতে পারেন।
