সব শ্রীহীন, সব কিছু আগুন দিয়ে ঝলসানো। মেঘনা-পাড়ের সিতাংশু বিরস বিতৃষ্ণ মুখে চেয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর মনে পড়ল, একদিনের ছুটি নিয়ে তার ছোকরা চাকর ধনিয়া নিজের গাঁওমে গিয়েছিল, আজ চতুর্থ দিনেও সে ফেরেনি। গ্রামে যাওয়া খুবসম্ভব বাজে কথা —বেশি মাইনেতে আর কোথাও কাজে লেগেছে। ওর দোষ নেই। ভদ্রলোকেই যদি জল চুরি করতে পারে…
মেঘনা-পাড়ের সিতাংশু সেনগুপ্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সাহারা মরুভূমি নয়, বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে একশো মাইলের মধ্যেই যে জল চুরি করবার দরকার হয়, মেঘনার কালো অথই জলের দিকে তাকিয়ে সেকথা কে ভাবতে পারত!
কিন্তু ও-সব তত্ত্বচিন্তা এখন থাক। আপাতত সিতাংশুকে নিজের হাতে চা করতে হবে, রান্নার ব্যবস্থা করে নিতে হবে। তবু তো আজ বাজারে যাওয়ার সমস্যা নেই, কাল অফিস থেকে ফেরবার সময় বুদ্ধি করে আলু আর ডিম নিয়ে এসেছিল। নাঃ, আর দেরি করা চলে না।
মুখ ধুতে ইদারার পাড়ে আসতেই চোখে পড়ল তিন-চার ফোঁটা রক্ত শুকিয়ে কালো হয়ে আছে। আত্মগ্লানিতে সিতাংশু সেদিকে আর তাকাতে পারল না। মেয়েটিকে এক বার একা পাওয়া দরকার, ভালো করে ক্ষমা চাইতে হবে। হাঁটতে হাঁটতে একসময় যাবে নাকি ও বাড়িতে? কিন্তু আলাপ-পরিচয়টাই যখন হয়ে ওঠেনি এ পর্যন্ত, তখন…।
অন্যমনস্কভাবে ইদারায় বালতি নামিয়েছিল, অন্যমনস্ক হয়েই টেনে তুলল। আর তৎক্ষণাৎ সমস্ত অনুতাপ মুছে গেল, পা থেকে জ্বলে উঠল মাথা পর্যন্ত। অর্ধেক জল, অর্ধেক বালি।
আরও অর্ধেক শুকিয়ে গিয়েছে ইদারা, কাল ওভাবে চুরি না-হলে আজকের দিনটা কুলিয়ে যেত। চাকরটা থাকলেও-বা কথা ছিল, এখন তাকেই গিয়ে সিকি মাইল দূরের টিউবওয়েল থেকে জল আনতে হবে। আর যা ভিড় সেখানে!
দুত্তোর!
কুঁজোর জলে চা খাওয়া কোনোরকমে চলতে পারে। স্নানের আশা নেই। অফিস যাওয়ার পথে খাওয়ার জন্যে ঢুকতে হবে হোটেলে। সিতাংশুর মনে হতে লাগল, মশারির স্ট্যাণ্ড দিয়ে ঘা কয়েক ওই ভদ্রলোককেই বসিয়ে দেওয়া উচিত ছিল। সবই জানতেন, অথচ কেমন ন্যাকামি করে গেলেন। আর মেয়েটা—সেই বুলু! অবশ্য রক্তপাত না-হলেই খুশি হত সিতাংশু; কিন্তু ডাণ্ডার ঘা তার যে একেবারেই পাওনা ছিল না, এই মুহূর্তে সে তা ভাবতে পারল না।
অফিস থেকে বেরিয়ে, রাস্তায় চা খেয়ে বাড়ি ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। আবার সেই ঘর, সেই গরম, লণ্ঠনের আলোয় নিজের কদাকার ছায়া আর সেই বাংলা উপন্যাসটা। লণ্ঠনটা জ্বালাতে জ্বালাতে সিতাংশুর মনে হল— তারপর আরও অনেক রাতে ইঁদারার থেকে আবার কেউ হয়তো জল চুরি করতে আসবে, যদিও আজ বালতি ভরে বালিই উঠবে কেবল। কিন্তু কে আসবে? বুলু? না, বুলু আর আসবে না।
যদি বুলুই আসে? একটা অসম্ভব কল্পনায় রোমাঞ্চিত হয়ে উঠল সিতাংশু। তা হলে আজ কী করবে সিতাংশু? দূর থেকে দেখা, পিপুল পাতায় জ্যোৎস্নায় আধখানা দেখা আর একটি ছোটো টর্চের আলো এক ঝলক দেখা বুলুর মুখের সামনে আজ লণ্ঠনটা তুলে ধরবে সে।
দেখবে কাল রাতে কতখানি ক্ষত সে মেয়েটির কপালে এঁকে দিতে পেরেছে—কতটা লিখে দিতে পেরেছে নিজের স্বাক্ষর।
আসতে পারি?
বুলু নয়, তার কাকা। সেই অনেক রাতের প্রত্যাশিত সময়টির অনেক আগেই এসে পড়েছেন তিনি।
সিতাংশু চমকে মাথা তুলে বললে, আসুন।
বুলুকে লণ্ঠনের আলোয় দেখতে চেয়েছিল সিতাংশু, দেখল তার কাকাকে। বছর পঁয়তাল্লিশেক বয়স হবে। শক্ত ভারী গোছের বেঁটে মানুষ। কপাল থেকে মাথার আধখানা পর্যন্ত মসৃণ টাক। সিতাংশুর জারুল কাঠের চেয়ারটায় সশব্দে আসন নিলেন।
আলাপ করতে এলুম। আমার নাম বিরাজমোহন মল্লিক। আপনি?
সিতাংশু সেনগুপ্ত।
দেশ?
সিতাংশুকে বলতে হল।
তাই বলুন! আমাদের ইস্টবেঙ্গলের লোক। চেহারা দেখে আমারও তাই মনে হয়েছিল।
পূর্ববঙ্গত্ব এমনভাবে তার শরীরে লেখা আছে, এ খবরটা এতদিন সিতাংশুর জানা ছিল না। মৃদু রেখায় হাসল সে।
তা একা আছেন এখানে? ফ্যামিলি কোথায়?
মা-বাবা কলকাতায় থাকেন।
ওয়াইফ?
বাঙালির স্ত্রীকে বাংলা ভাষায় ওয়াইফ বললে ভারি কুশ্রী শোনায় সিতাংশুর কানে। তবু এবারেও সে অল্প একটু হাসল। বললে, তাঁকে এখনও জোটাতে পারিনি।
বলেন কী, ব্যাচেলর! বিরাজবাবু বিস্মিত হলেন, তিরিশ তো পেরিয়ে গেছেন বোধ হয়।
হ্যাঁ, বছর দুই হল।
তবু এখনও বিয়ে করেননি! বুড়ো বয়সে যে ছেলের রোজগার খেয়ে যেতে পারবেন না!
সেই দুশ্চিন্তায় সিতাংশুর রাতে ঘুম হচ্ছিল না। তবু এবারে ভদ্রতার হাসি হাসতে হল।
বাবা-মাই বা কী বলে চুপ করে আছেন। বিরাজবাবু স্বগতোক্তি করলেন, বিমর্ষভাবে চুপ করে রইলেন কয়েক সেকেণ্ড। তারপর এলেন অন্য প্রসঙ্গে।
কিন্তু এই জলের কষ্ট তো আর সহ্য হয় না মশাই। মরুভূমিতে এলুম নাকি?
সেইরকমই তো মনে হচ্ছে।
মিউনিসিপ্যালিটিতে কড়া করে একখানা দরখাস্ত দিলে কেমন হয়?
আসছে বছর গ্রীষ্মকালে সে-দরখাস্ত নিয়ে ওঁরা আলোচনা করবেন।
যা বলেছেন! সক্ষোভে বিরাজবাবু মাথা নাড়লেন, স্বাধীনতার পরেও এরা যে-তিমিরে সেই তিমিরেই রয়ে গেল। এদেশের উন্নতি হতে মশাই আরও পাঁচশো বছর।
তারপর আধ ঘণ্টার মতো নির্বাক শ্রোতার ভূমিকায় নিঃশব্দে বসে রইল সিতাংশু। এসব ক্ষেত্রে সাধারণত যা যা বলবার থাকে, বিরাজবাবু কিছুই তার বাদ দিলেন না। গোটা তিনেক সিগারেট খেলেন এবং সামনে অ্যাশট্রে থাকতেও ছাই ঝাড়লেন মেঝের উপর। আর সিতাংশু কালকের মতো নিজের ছায়া দেখতে লাগল লণ্ঠনের আলোয়। কান পেতে শুনতে লাগল বাইরে মাঠের ভিতর দিয়ে হু-হু করে বয়ে যাচ্ছে হাওয়া, আর ইউক্যালিপ্টাসের পাতাগুলো ঝরঝর করে ঝরে পড়ছে তাতে।
