আর দেরি করা যায় না। জলের বালতি নিয়ে এক বার তারের বেড়া টপকে চলে গেলে আইনত সিতাংশুর আর কিছুই বলবার নেই। সুতরাং যা করতে হয় এক্ষুনি।
মশারির স্ট্যাটা শক্ত করে ধরে পিছন দিয়ে ঘুরে সিতাংশু দারার দিকে এগোতে চেষ্টা করল। চোর তখন নিবিষ্টচিত্তে জল তুলছে। জলের ছলাৎ ছলাৎ আওয়াজ সিতাংশুর জ্বালাধরা রোমকূপগুলোকে পুড়িয়ে দিতে লাগল। তারপর যখন আর এগোনো চলে না, যখন প্রায় দশ-বারো গজের মধ্যে এসে পড়েছে, যখন আর এক-পা বাড়ালেই চোর তাকে দেখতে পাবে, তখন হাতের ডাণ্ডাটা সে ছুড়ে মারল সবেগে।
নির্ভুল লক্ষ্যভেদ! একটা মৃদু আর্তনাদ করে চোর মাটিতে ঘুরে পড়ল।
কিন্তু সিতাংশুর হাত-পা জমে গিয়েছে তৎক্ষণাৎ। গরম, বিরক্তি আর ক্রোধে অতখানি অন্ধ না-হলে আরও আগেই সে বুঝতে পারত। একটি মেয়ে।
কী সর্বনাশ! রোম্যান্টিক উপন্যাসের পাতা থেকে একেবারে নারীহত্যায়!
কে বলে পশ্চিমের গরমে ঘাম হয় না? মুহূর্তে ঘেমে উঠল সিতাংশু, ভিজে গেল গেঞ্জি, জিভটা চলে যেতে চাইল গলার ভিতর, মাথাটা একেবারে ফাঁপা হয়ে গেল। এইবার?
মেয়েটা নড়ে উঠল। উঠে বসতে চেষ্টা করছে। যাক—একেবারে খুন হয়নি তাহলে, বেঁচে আছে এখনও! সন্তর্পণে কাছে এগোল সিতাংশু।
এক টুকরো চাঁদ উঁকি দিয়েছে আকাশে। পিপুল গাছের পাতার ভিতর দিয়ে স্নান খানিকটা আলো এসে পড়েছে মেয়েটির মুখে। চিনতে পেরেছে সিতাংশু। পিছনের বাড়িতে পোস্ট অফিসের যে নতুন ভদ্রলোকটি এসেছেন তাঁরই কেউ হবে। ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ হয়নি, কিন্তু মেয়েটিকে কয়েক দিনই চোখে পড়েছে।
সিতাংশু সামনে আসতে টলতে টলতে উঠে দাঁড়াল। চাঁদের আলোতেও দেখা গেল, তার কপাল বেয়ে রক্ত পড়ছে। আর সেইসঙ্গে শোনা গেল ফোঁপানো কান্নার স্বর, এক বালতি জল নিতে এসেছিলুম আপনার ইদারা থেকে, সেজন্যে এমন করে আমায় মারলেন?
আগেই মরমে মরে গিয়েছিল সিতাংশু, এবার মিশে গেল মাটিতে।
আমায় ক্ষমা করবেন। মানে, আমি ভেবেছিলুম…
কী ভেবেছিলেন? কান্নার ভিতর থেকে এবার ঝাঁঝ বেরিয়ে এল। কোনো পুরুষমানুষ? যে-ই হোক-না, এক ফোঁটা জলের জন্যে তাকে আপনি খুন করতে চাইবেন? আপনি না ভদ্রলোক?
গলার স্বরে বোঝা যাচ্ছে ব্যাপারটা খুব গুরুতর হয়নি। ভরসা পেয়ে রাগ হল সিতাংশুর। এক ফোঁটা জলই বটে! এদিককার সমস্ত হাঁদারাই প্রায় শুকিয়ে মরুভূমি, সিকি মাইল রাস্তা পেরিয়ে মিউনিসিপ্যালিটির একটা টিউবওয়েল ভরসা। তার হাঁদারায় যে দু-চার বালতি জল আছে, তা-ও এভাবে লুট হতে থাকলে মাথায় খুন চাপা অন্যায় নয়।
কিন্তু সেকথা বলল না সিতাংশু।
এসে চাইলেই পারতেন।
চাইলেই যেন দিতেন আপনি।
স্পষ্ট পরিষ্কার কথা। না, দিত না সিতাংশু। এই দুঃসময়ে অতখানি উদারতা তার নেই— কোনো মহিলা সম্পর্কেও না। বিব্রত হয়ে সিতাংশু বললে, থাক ও-সব কথা। আপনার কপালটা কেটে গিয়েছে মনে হচ্ছে। দাঁড়ান, আয়োডিন এনে দিচ্ছি।
খুব হয়েছে, আর উপকার করতে হবে না। কপাল ফাটিয়ে দিয়ে জলের দাম তো আদায় করলেন। কী করব এখন? জলটা নিয়ে যাব না আবার ঢেলে দেব ইদারায়?
সিতাংশু অপ্রস্তুত হল। আশ্চর্যও হল সেইসঙ্গে। একটুও আত্মসম্মান নেই মেয়েটার, এত কান্ডের পরেও ভুলতে পারেনি জলের কথাটা।
ছি ছি, কী যে বলেন! চলুন আমিই পৌঁছে দিয়ে আসছি জলটা।
কোথা থেকে এসে পড়ল টর্চের আলো। চমকে তাকাল দুজনেই।
পোস্ট অফিসের সেই ভদ্রলোক। পিছনের বাড়ির নতুন ভাড়াটে।
কী হয়েছে বুলু? টর্চের আলোয় বুলুর কপালের রক্ত একরাশ সিঁদুরের মতো ঝকঝক করে উঠল। কী করেছিস আবার?
সিতাংশু পাথর হয়ে গেল। আর বুলুই জবাব দিলে।
অন্ধকারে হাঁদারার ওপর পড়ে গিয়েছিলুম কাকা। ইনি ছুটে এসে…
তারের বেড়া টপকে ভিতরে এলেন ভদ্রলোক।
তোকে হাজার বার বারণ করলুম এত রাতে জলের দরকার নেই, তবু হতভাগা মেয়ের কানে গেল না। তোর জন্যে শেষে একটা কেলেঙ্কারিতে পড়ব এ আমি ঠিক জানি। নে চল। বালতি তুলে নিয়ে ভদ্রলোক সিতাংশুর দিকে তাকালেন, কিছু মনে করবেন না মশাই, এই মেয়েটার জ্বালায় আমার একদন্ড স্বস্তি নেই। কপালে যে আমার কত দুঃখ আছে সে কেবল আমিই জানি। আপনার ঘুম নষ্ট হল, অপরাধ নেবেন না।
সিতাংশু কী বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু সুযোগ পেল না। বিহ্বলতার ঘোর কাটিয়ে উঠতে-না উঠতেই কাকা-ভাইঝি তারের বেড়া পার হয়ে চলে গিয়েছেন। ফিকে চাঁদের আলোয় দুটো অবাস্তব ছায়ামূর্তি।
কয়েক সেকেণ্ড চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে নীচু হয়ে মশারির স্ট্যাটা তুলে নিল সিতাংশু। এটা কি চোখে পড়েনি ভদ্রলোকের? না-পড়া অসম্ভব। অসহ্য গরম নিঃসঙ্গ ঘরটার দিকে যেতে যেতে সিতাংশু নিজেকে জিজ্ঞাসা করতে চাইল, কে ভালো অভিনয় করেছে? বুলু না তার কাকা?
সারাটা রাত আর ভালো করে ঘুম এল না, কাটল অস্বস্তিভরা তন্দ্রার ভিতর। চোখ কচলাতে কচলাতে সিতাংশু যখন বারান্দায় এসে দাঁড়াল, তখন তীক্ষ্ণ উজ্জ্বল রোদে চারদিক ভরে উঠেছিল। রাস্তার ওপারে ইউক্যালিপ্টাসের সারি পেরিয়ে কাঁকর-মেশানেনা ঢেউ-খেলানো মাঠ, তার ভিতরে একটা খাপছাড়া সাদা বাড়ি রোদে জ্বলন্ত হয়ে উঠেছে। দূরের রুক্ষ পাহাড়টা পড়ে আছে অপরিচ্ছন্ন বন্য মহিষের মতো, তার পত্রহীন গাছপালা আর বড়ো বড়ো ন্যাড়া পাথর স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে এখান থেকেও।
