নরম রোদে অপূর্ব প্রশান্ত হয়ে গেছে কালাবদর। কফিলদ্দির নৌকার গায়ে কুলকুল করে সস্নেহ আঘাত দিয়ে যাচ্ছে। লক্ষ লক্ষ কালনাগিনি যেন মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গেছে, শুনতে পেয়েছে কোনো সাপ-খেলানো বাঁশির সুর।
ক্ষত
পাবলিক লাইব্রেরি থেকে আনা, পাতা মুড়িবেন না ছাপ মারা এবং পাতায় পাতায় মোড়া জীর্ণ বাংলা উপন্যাসখানা পড়বার চেষ্টা করছিল সিতাংশু। রাত এগারোটার কাছাকাছি, অসহ্য গরম। জানালা দিয়ে বাতাস আসছিল না তা নয়, কিন্তু তাতে আগুনের ছোঁয়া। দিনে দুর্দান্ত গরম থাকলেও সন্ধ্যার পরেই নাকি সাঁওতাল পরগনার সুশীতল বাতাস বইতে থাকে, এমনই একটা জনশ্রুতি তার শোনা ছিল। কিন্তু প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে, রাত তিনটের আগে সেই বিখ্যাত শীতল হাওয়াটি প্রবাহিত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।
বইটি প্রেমের উপন্যাস এবং শুরু হয়েছে পাইনবনের ভিতরে একটি আঁকাবাঁকা পথের উপর। কুয়াশা কেটে গিয়ে পাইনের ঊর্ধ্বমুখী কণ্টকপত্রে সোনালি রোদ পড়েছে, দু-ধারে বরাশ ফুল ফুটেছে রাশি রাশি, আর ওভারকোটের পকেটে হাত দিয়ে একটি মেয়ে আশ্চর্য গভীর চোখ মেলে দূরের নীল পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে আছে। ঠিক সেই সময়…।
ঠিক সেই সময়েই বিরক্ত হয়ে সিতাংশু পর পর কয়েকটা পাতা উলটে গেল। এই দুর্ধর্ষ গরম, ইলেকট্রিকবিহীন এই বাড়ি, নিঃসঙ্গ এই জীবন, এর ভিতরে শীতল পাহাড়ের কবোষ্ণ রোমান্স তার কল্পকামনা অনেকটা মেটাতে পারত; কিন্তু সিতাংশুর প্রতিক্রিয়া অন্যরকম হল। কেন এমন বাজে বই লেখা হয়, কেই-বা সেটা ছাপে; এবং যদিই-বা সেটা ছাপা হয়, তাহলে পাতাগুলো দিয়ে মুড়ির ঠোঙা তৈরি না-করে পাঠককে যন্ত্রণা দেবার জন্যে লাইব্রেরিতে রাখা হয় কেন? এই ধরনের গোটা কয়েক আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা তার মনের ভিতর ঘুরপাক খেয়ে গেল।
কিন্তু লাইব্রেরির বইয়ের আরও একটা আকর্ষণ আছে, সে হল অনাহূত টীকাকারদের মন্তব্য। বাঁধাইয়ের দু-ধারের সাদা পাতায়, বইয়ের মার্জিনে রসিক পাঠকদের নানারকম স্বতোৎসারিত উচ্ছাস। যেমন— বাঃ, বেশ বেশ। একেই বলে খাঁটি প্রেম, একসেলেন্ট কিংবা মণিকার এইরূপে চিন্তা করা অন্যায়। হিন্দু নারী হইয়া সে পরপুরুষের… ইত্যাদি ইত্যাদি। তা ছাড়া কাঁচা হাতের কিছু কিছু অশ্লীল মন্তব্যও থাকে। আর বই যদি পাঠকের ভালো না-লাগে, তাহলে লেখকের উদ্দেশে যেসব মন্তব্য বর্ষণ করা হয়, ভদ্রলোক সেগুলো জানতে পারেন না বলেই আত্মহত্যা করেন না।
অতএব সিতাংশুও কালিদাস ছেড়ে মল্লিনাথ পড়া শুরু করল। একটি নয়, অন্তত পেনসিলে আর কালির লেখা গুটি সাতেক মল্লিনাথের সন্ধান পাওয়া গেল। কাছাকাছি কোনো হ্যাণ্ড রাইটিং এক্সপার্ট থাকলে সঠিক সংখ্যাটা বলতে পারতেন।
কিন্তু তাই-বা ভালো লাগে কতক্ষণ। গরম, কদর্য গরম! হাওয়াটাও বন্ধ হয়ে গিয়েছে। জানালার বাইরে কালো ব্রোকেডের পর্দার মতো টানা অন্ধকার, তার ভিতর দিয়ে দু-তিনটে ইউক্যালিপ্টাসের বাকলহীন শুভ্রতা অতিকায় কঙ্কালের মতো দাঁড়িয়ে। মিউনিসিপ্যালিটির একটা কেরোসিনের আলো জানালার প্রায় মুখোমুখি ছিল, সেটা সন্ধ্যা না লাগতেই নিবে গিয়েছে। ঘরের দেওয়ালে লণ্ঠনের আলোয় নিজের যে-ছায়াটা পড়েছে, সেটাকে পর্যন্ত সিতাংশুর অসহ্য বোধ হতে লাগল। ওটা যেন তার মনের ছায়া—বিকৃত, অর্থহীন, অশোভন, অশালীন। বাইরের অন্ধকারে গিয়ে ওটা দাঁড়ালেই ভালো হত, তার প্রত্যেকটা অঙ্গভঙ্গিকে এমনভাবে ক্যারিকেচার করবার প্রয়োজন ছিল না।
ঘাম ঝরছে না, সারা শরীর যেন জ্বালা করছে। এক বার স্নান করতে পারলে ভালো হত। কিন্তু ঠিক নাটকীয়ভাবে সেই সময় শব্দটা শুনল সিতাংশু। পরিষ্কার শুনতে পেল। ইদারার গায়ে দড়ি ঘষার খসখস আওয়াজ, বাঁশের একটা মৃদু গোঙানি আর ছলাৎ ছলাৎ করে জলের কলধ্বনি।
সঙ্গে সঙ্গে উঠে পড়ল সিতাংশু। লণ্ঠনটা কমিয়ে দিয়ে পা টিপে টিপে দরজার কাছে এসে দাঁড়াল। তারপর কপাটটা ইঞ্চি তিনেক ফাঁক করে তীক্ষ্ণদৃষ্টি মেলে দিলে সামনের দিকে।
বাড়ি যতই ছোটো হোক, তারের বেড়া-ঘেরা কম্পাউণ্ডটা অনেকখানি। সিতাংশুর ঘর থেকে প্রায় চল্লিশ গজ দূরে তার ইঁদারা। এই অন্ধকারে একটি ঝাঁকড়া পিপুল গাছ আরও অন্ধকার ছড়িয়েছে তার উপর। তবু স্পষ্ট দেখলে সিতাংশু, কে একজন ইদারা থেকে জল তুলছে। বালতি উপরে টানার সঙ্গে সঙ্গে তার নুয়ে-পড়া শরীরটা সোজা হয়ে উঠছে আস্তে আস্তে।
হিংস্র ক্রোধে দাঁতে দাঁত চাপল সিতাংশু। এই ব্যাপার! এই জন্যেই অতখানি টলটলে জল দু-দিনের ভিতরেই বালিতে ভরে উঠছে। সন্দেহ একটু ছিলই, এইবার বোঝা গেল সব। জল চুরি হচ্ছে।
একটা বিশ্রী উপন্যাস। কুৎসিত গরম। নিঃসঙ্গ নির্বাসিতের মতো জীবন। ইলেকট্রিকের আলোহীন ঘরে নিজের ছায়ার ভ্যাংচানি। তার ওপর চুরি? সিতাংশুর মাথায় আগুন জ্বলল।
দরজা বন্ধ করে সে ঘরে ফিরে এল। কী করা যায়? তাড়া করলে তারের বেড়া ডিঙিয়ে পালাবে, ধরা যাবে না। অসম্ভব আশায় চারদিকে এক বার সে তাকিয়ে দেখল—কোনো মিরাকলে একটা বন্দুক যদি এই মুহূর্তে হাতের কাছে পাওয়া যায়, তাহলে আর ভাবনার কিছু থাকে না। কিন্তু বন্দুকের বদলে পাওয়া গেল একটা মশারির স্ট্যাণ্ড।
